২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই

0
136
untitled-8_279837নিউজ ডেস্ক:দেরিতে হলেও একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য সংসদে সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। সংসদের প্রস্তাবে দিবসটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে ১৯৭১ সালের ৯ মাস ধরে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণহত্যা এবং ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণার জন্য কাজ করে আসছেন যারা, তারা মনে করছেন, গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় খুব সহজ হবে না। কেননা, এরই মধ্যে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব অনুমোদন করে দিয়েছে। তাই দিবসটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্যও ১৯৭১ সালের ৯ মাস বাংলাদেশে পাকিস্তানিরা যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে একাত্তরের যুদ্ধটি পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ নয়, নয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধও; যুদ্ধটা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার।

গত ১১ মার্চ সংসদে পাস পাওয়ার পর ২০ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকেও ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণার বিষয়টি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। পরদিন ২১ মার্চ জারি হওয়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে দিবসটিকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালনের অনুমোদন দেওয়া হয়। অবশ্য ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়, ‘সংসদের অভিমত এই যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যাকে স্মরণ করে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করা হোক এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হোক।’

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির গণহত্যা দিবস হিসেবে ২৫ মার্চের জাতীয় স্বীকৃতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, দিবসটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার ব্যাপারে সংশয় রয়েছে। তাই সবার আগে আমাদের উচিত হবে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ৯ মাস যে প্রতিদিনই গণহত্যা চলেছে, তার স্বীকৃতি আদায় করা। তিনি বলেন, ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯৩ সাল থেকে কালরাত পালনের কর্মসূচি শুরু করে নির্মূল কমিটি। তখন অনেক প্রতিকূল সময় গিয়েছে। ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার প্রথমবার দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারিভাবে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণার দাবি জানানো হয়। পরে ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারিভাবে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস ঘোষণা এবং এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের জন্য প্রচারাভিযান জোরদার করি আমরা। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও এ নিয়ে কথা বলেছি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণহত্যার শিকার মানুষদের স্মরণ, গণহত্যার অবসান ও গণহত্যাকারীদের বিচার দাবির জন্য জাতিসংঘের একটি ঘোষিত দিন থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলার পাশাপাশি সর্বত্রই ২৫ মার্চের পক্ষে আমাদের যুক্তি তুলে ধরেছি।’ শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এরই মধ্যে ট্রেন ফেল করে ফেলেছি আমরা। ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর ফলে আমাদের দাবিগুলোর একাংশ অর্থাৎ ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা হিসেবে ঘোষণার দাবিটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। তাই আমাদের প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ধরে ঘটানো গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টায় জোর দেওয়া।

১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইডে গণহত্যার যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ আছে, তার শেষটি ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অন্য সব ধরনের অপরাধই সংঘটিত হয়েছে। কোনো গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা, তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিসাধন, জীবনমানের প্রতি আঘাত ও শারীরিক ক্ষতিসাধন, জন্মদান বাধাগ্রস্ত করা এবং শিশুদের অন্য গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া_ কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইড অনুযায়ী এই পাঁচটি উপাদানের কোনো একটি থাকলেই সে ঘটনা গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত হবে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ বলেন, একটি ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আর সব ধরনের অপরাধই সংঘটিত হয়েছে। তবু আমরা এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে গণহত্যার স্বীকৃতিই আদায় করতে পারিনি। বাংলাদেশের গণহত্যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনীহাকে যেমন দায়ী করেন, তেমনি আমাদের ব্যর্থতাও রয়েছে বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, নিজেদের স্বার্থ না থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গণহত্যা বা এর বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখায় না। বাংলাদেশের মতো আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা গেছে। বাংলাদেশের গণহত্যা ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৬৫ সালে এবং পূর্ব তিমুরে ১৯৭৫ সালে সংঘটিত গণহত্যার মতোই ভয়াবহ। কিন্তু আমরা দেশে-বিদেশে কোথাও বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে খুব বেশি চর্চা গড়ে তুলতে পারিনি। বাংলাদেশের গণহত্যা পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে স্থান পেলেও বাংলাদেশে একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনোসাইড স্টাডিজ বিষয়ক একটি সেন্টার রয়েছে। আমাদের চর্চাটা বাড়াতে হবে, তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে একাত্তরে সিভিলিয়ানদের ওপর একটা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক দেলোয়ার হোসেনও বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়ে পাকিস্তান এবং তাদের এ দেশীয় দোসরদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করতে হলে আরও বেশি একাডেমিক গবেষণা দরকার বলে মত দেন। তিনি জানান, কানাডা ও আর্জেন্টিনাসহ বিশ্বের আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত নির্মম গণহত্যার বিষয় নিয়ে পড়ানো ও গবেষণা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি ও ডিপল ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ম্যাকোরি, ইউনিভার্সিটি অব হংকং ও পোল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লজে গণহত্যার বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ প্রোগ্রামে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইন্দোনেশিয়াসহ মোট ১৪টি গণহত্যার বিষয়ে উল্লেখ আছে। এর মধ্যে ‘আদার’ বা অন্য গণহত্যার তালিকায় বাংলাদেশের নাম আছে। বলা হয়েছে, এ গণহত্যার বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে। বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণহত্যা বিষয়টি পড়ানো না হলেও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সেন্টার ফর স্টাডি অন জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস বলে একটি বিষয় রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারোয়ার আলী জানান, সেন্টার ফর স্টাডি অন জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিসের পরিচালনা পর্ষদে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডাম জোনস, কম্বোডিয়ার হেলেন জারভিস ও আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল ফিয়েরস্টেইনের মতো গণহত্যা বিষয়ে খ্যাতিমান গবেষকরা যুক্ত রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের খ্যাতিমান গণহত্যা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার আন্