১৪৬ কিমি. বেগে মোরার হানা “লণ্ডভণ্ড কক্সবাজার”

0
98

1_128745_48425_1496176504তিন জেলায় শিশুসহ ৮ জনের মৃত্যু * ৪০ হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত * আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ঘরে ফিরছে মানুষ

উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় মোরা। এই ঝড় চট্টগ্রামসহ উপকূলের অন্য জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে না পারলেও ধ্বংসের ছাপ রেখে গেছে কক্সবাজারে। মোরার তাণ্ডবে এ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। চার ঘণ্টাব্যাপী তাণ্ডবলীলায় কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩০ হাজারের বেশি কাঁচা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। উপড়ে গেছে অগণিত গাছ।

বিদ্যুতের অধিকাংশ খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় পুরো জেলায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় নেমে এসেছে। বাস্তার ওপর গাছ উপড়ে পড়ে জেলা শহরের সঙ্গে অনেক এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

এদিকে এ জেলায় ৫ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মোরা। কক্সবাজার ছাড়া উপকূলের আরও কয়েকটি জেলায় এ ঝড় আঘাত হেনেছে। চট্টগ্রামে অন্তত ১০ হাজার কাঁচাবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঝড়ে ভোলায় মারা গেছে এক শিশু। আর রাঙ্গামাটিতে মারা গেছে ২ জন। বরগুনার আমতলীতে ২৫টির মতো গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উপকূলসংলগ্ন জেলা প্রশাসনগুলোর দাবি আগাম সতর্কতা এবং আগেই লোকজনকে সরিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়ার কারণে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে।

মঙ্গলবার ভোর ৬টার দিকে সুপার সাইক্লোন মোরা উপকূল তথা কক্সবাজারে আঘাত হানে। পরে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া নিয়ে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার উপকূল ছুঁয়ে চট্টগ্রাম-হাতিয়া-সন্দ্বীপের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় সাগরে ভাটা ছিল। এ কারণে অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পায় উপকূলের মানুষ। আঘাত হানার সময়টিতে জোয়ার থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো। ঝড়টি ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে স্থল নিন্মচাপে পরিণত হয়েছে। এ কারণে দেশের বেশিরভাগ এলাকায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ঢাকা আবহাওয়া অফিস জানায়, প্রচণ্ড বেগে উপকূল অতিক্রম করার সময় ঝড়টির সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার। মোরা দুর্বল হয়ে পড়ায় বিপদ সংকেত ৩ নম্বরে নামিয়ে আনা হয়েছে। ঝড়টি উপকূল অতিক্রম করার পর দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে নৌযান চলাচল শুরু হয়েছে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানোর জন্য ১ হাজার ৪শ’ টন চাল বরাদ্দ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ছাড় দেয়া হয়েছে। নৌবাহিনী মঙ্গলবারই তাৎক্ষণিকভাবে সেন্ট মার্টিন ও কুতুবদিয়া এলাকায় জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শুরু করে। অপরদিকে ঝড়ের কারণে বন্ধ থাকা চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামার কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে। দুপুরের পর পরিস্থিতি উন্নতি হলে আশ্রয় কেন্দ্রসমূহ থেকে লোকজন ঘরে ফিরতে শুরু করে।

কক্সবাজার থেকে লোকমান চৌধুরী ও সায়ীদ আলমগীর জানান, ঘূর্ণিঝড় মোরার চার ঘণ্টার তাণ্ডবলীলায় কক্সবাজারের প্রত্যন্ত অঞ্চল লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতায় আতঙ্কিত হয়ে এবং ঘরের চালায় গাছ পড়ে এ জেলায় মারা গেছেন নারীসহ ৫ জন। তারা হলেন : কক্সবাজার পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের ৬নং জেডিঘাট এলাকায় বদিউল আলমের স্ত্রী মরিয়ম বেগম (৫৫), চকরিয়ার বড়ভেওলা এলাকার মৃত নূর আলম সিকদারের স্ত্রী সায়েরা খাতুন (৬৫), একই উপজেলার ডুলাহাজারার পূর্ব জুমখালী এলাকার আবদুল জব্বারের ছেলে রহমত উল্লাহ (৫০), পেকুয়া উপজেলার উপকূলীয় উজানটিয়া ইউনিয়নের নতুন ঘোনা পেকুয়ারচর এলাকার আজিজুর রহমানের ছেলে আবদুল হাকিম সওদাগর (৫৫) ও সদরের ইসলামাবাদ ইউনিয়নের গজালিয়া গ্রামের শাহাজাহানের মেয়ে শাহিনা আকতার (১০)। ঝড়ে কক্সবাজারে শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। তাদের জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া ‘মোরা’র আঘাতে কক্সবাজারে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। অসংখ্য গাছপালা উপড়ে গেছে। ব্যাপক হারে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় পুরো কক্সবাজারে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বাড়িঘর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্ট মার্টিনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর এখনও উত্তাল রয়েছে। তবে দুপুরের পর জেলার আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এ কারণে কক্সবাজারের ৫৩৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া তিন লক্ষাধিক মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করেছে।

মঙ্গলবার ভোররাত ৪টা ২০ মিনিট থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর হালকা বাতাস বইতে শুরু করে। এরপর সকাল ৭টা থেকে শুরু হয় ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র তাণ্ডব। টানা চার ঘণ্টা চলে এ তাণ্ডব। প্রচণ্ড বেগে ঝড়ো হাওয়ায় কক্সবাজার সদরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে আঘাত হানতে শুরু করে। চার ঘণ্টার ঝড়ো হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড করে ফেলে নান্দনিক সৌন্দর্যের পুরো পর্যটননগরী। কাঁচা, সেমি-পাকা ঘর দোকানপাট দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে। টিনের ঘর চেপ্টা, বেড়ার ঘর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। শক্তিশালী এ ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে বাদ যায়নি পর্যটন শহরের তারকা মানের হোটেল-মোটেলও। বাতাসের তীব্রতায় প্রায় মাল্টিস্টরিড বিল্ডিংয়ের জানালার কাচ ভেঙে পড়েছে। কাচের সবকিছু মুহূর্তেই উড়িয়ে নিয়ে যায় ‘মোরা’।

কক্সবাজার পৌরসভার সমিতিপাড়া গ্রামের এক নম্বর সড়কের একটি কাঁচা ঘরে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন আবদুল হক। সোমবার রাত ১০টার দিকে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে সাইক্লোন সেন্টারে চলে গিয়েছিলেন তিনি। ভোর ৬টার দিকে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে আবার ফিরে আসেন নিজ ঘরে। তখনই শুরু হয় তীব্র ঝড়ো হাওয়া। নারকেল গাছ উপড়ে পড়ে সেই ঘরের ওপর। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছে আবদুল হকের পরিবার। প্রতিবেশী আবদুর রাজ্জাক বলেন, যেভাবে শব্দ হয়েছে, গাছ ভেঙে পড়েছে, আমি মনে করেছিলাম তিনজনই মারা গেছে। আমি দৌড়ে এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখি তিনজনই বেঁচে আছে। আবদুল হকের ঘরের পাশাপাশি ১০টি ঘর গাছ পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবদুল হকের পরিবারের মতো, মঙ্গলবারের ঘূর্ণিঝড় মোরা কক্সবাজারে আঘাত হানার পর অনেকেই এমন বিপদ থেকে বেঁচে গেছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ ভিটেমাটি রক্ষায় যাননি সাইক্লোন সেন্টারে, আর কেউ গিয়েও ফিরে যান বাড়িতে।

কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মোরার আঘাতে প্রায় প্রতিটি সড়কের ওপর পড়ে আছে উপড়ানো গাছ আর ডালপালা। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে রাস্তায় পড়ে আছে।

সেন্ট মার্টিনের ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করলেও তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।

টেকনাফ সাবরাং ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান নুর হোসেন জানিয়েছেন, সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ গ্রামে কাঁচা ঘরবাড়ি ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষ আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করে। এদিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকতার কামাল জানিয়েছেন, সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, ফদনার ডেইল ও নাজিরারটেক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি।

কক্সবাজার সদরের পোকখালী ইউপি চেয়ারম্যান রফিক আহমদ জানান, মোরা অতিক্রমকালীন সাগরে ভাটা থাকায় জলোচ্ছ্বাস হয়নি। জোয়ার থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে জেলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেই বিবরণ এখনও হাতে আসেনি। তবে টেকনাফ উপজেলার সেন্ট মার্টিন, সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপ, মহেশখালীর ধলঘাটা, মাতারবাড়ী ও পেকুয়ার উজানটিয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার কাঁচা