হ্যাটট্রিক হচ্ছে বোল্টের?

0
233

325808db0ee8b4648b0380fa2f0e2fdc-bolt-heatরিও অলিম্পিক কি এক সপ্তাহ আগে শুরু হয়েছে নাকি আসলে শুরু হলো কাল?
অদ্ভুত এ প্রশ্নটার কারণ অনুমান করে ফেলেছেন নিশ্চয়ই। অলিম্পিক তো কবেই শুরু হয়ে গেছে, তবে মহানায়ক যে এদিনই প্রথম দেখা দিলেন! ট্র্যাকে নামলেন উসাইন বোল্ট। বোল্ট না নামলে অলিম্পিক শুরু হয় নাকি!

গত দুটি অলিম্পিকের একই গল্প। প্রথম সপ্তাহে সব আলো ঘিরে থেকেছে মাইকেল ফেল্প্সকে। দ্বিতীয় সপ্তাহটা শুধুই উসাইন বোল্টের। এই অলিম্পিকের প্রথম সপ্তাহও অনুসরণ করেছে সেই চিত্রনাট্যই। অলিম্পিকে নিজের শেষ ব্যক্তিগত ইভেন্টটিতে রুপা জেতার পরও ফেল্প্সই পুলের অবিসংবাদিত নায়ক। মিডলে রিলে বাকি থাকতেই ৪টি সোনা ও ১টি রুপা। বেইজিং ও লন্ডনের মতো করে না হলেও রিওতেও নিজের ছাপ ঠিকই রেখে গেলেন ফেল্প্স। তবে এবার তাঁর মঞ্চ ছেড়ে দেওয়ার পালা।

‘ফেল্প্সের শেষ, বোল্টের শুরু’ পর্বটার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু আজ। কাল দুপুরে প্রথম ট্র্যাকে দেখা দিয়েছেন সত্যি, তবে সেটি তো ছিল হিট। পদকের জন্য আজ প্রথম দৌড়। ‘পদক’ লেখা হয়েছে জানলে বোল্ট নির্ঘাত রাগ করবেন! যা একটা কিছু পদক হলেই তাঁর চলে নাকি, বোল্টের কাছে পদকের একটাই রং—সোনালি! রিওতে আসার পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঘোষণাই করে দিয়েছেন, ‘আমি তিনটাই জিতব। বড় আসরে অন্য কিছুতে আমার পোষায় না।’

তিনটা মানে ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ১০০ মিটার রিলে। গত দুটি অলিম্পিকেই তা জিতেছেন। ‘ডাবল ট্রিপল’-এর যে কীর্তি আর কারও নেই। নেই ১০০ মিটারে টানা তিনটি সোনাও। এবার সেই হ্যাটট্রিকের লক্ষ্য বোল্টের। লক্ষ্য ‘ট্রিপল ট্রিপল।’ অমরত্ব নিশ্চিত করার পথে মাত্র তিনটি সিঁড়ি, যার প্রথমটি আজ। মাত্র ১০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অলিম্পিকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ১০০ মিটার স্প্রিন্ট। রিওর সময় রাত ১০টা ২৫ মিনিটে (বাংলাদেশে সোমবার সকাল ৭টা ২৫) স্থির হয়ে যাবে পুরো বিশ্ব। নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকবে উসাইন বোল্টের দিকে।

আট বছর আগে এমন এক ১০০ মিটারেই তারকা হিসেবে তাঁর আবির্ভাব। বেইজিং অলিম্পিকে ৩০ মিটার বাকি থাকতেই উদ্যাপন শুরু করে দেওয়ার পরও বিশ্ব রেকর্ড গড়ে শুরু হলো যে জয়যাত্রা, হঠাৎই দু-একবার ছন্দপতন ছাড়া তা টগবগে ঘোড়ার মতোই ছুটে চলেছে। রিওতেও যে তাই ছুটবে, এ নিয়ে বোল্টের মনে কোনো সংশয়ই নেই। মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে এখানে খুব মিল জ্যামাইকান ‘বজ্রবিদ্যুৎ’-এর। আলী যেমন লড়াইয়ের আগেই জয়ীর নাম (অবশ্য নিজে) ঘোষণা দিতেন, বোল্ট তাই দেন। এখানে এসেও দিয়েছেন, ‘১০০ মিটার আমিই জিতব। তবে সময়ের ব্যাপারে আমি কখনো ভবিষ্যদ্বাণী করি না, কারণ কী হবে এটা কে বলতে পারে।’

পরের কথাটা অন্য একটা অর্থ হতে পারে, নিজের ক্ষমতার সীমাটা নিজেরই জানা নেই বোল্টের। বেইজিং অলিম্পিকের পরের বছরই বার্লিনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ভেঙে দিয়েছিলেন নিজের বিশ্ব রেকর্ডই। নয় বছর ধরে ১০০ মিটারের রেকর্ডটা স্থির হয়ে আছে সেই ৯.৫৮ সেকেন্ডেই। যেটির ভেঙে দেওয়ার সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিলেন বোল্ট নিজেই। লন্ডনে সোনা জিতেছিলেন ৯.৬৩ সেকেন্ডে। তাতে বিশ্ব রেকর্ড না হলেও অলিম্পিক রেকর্ড হয়েছিল। রিওতে অলিম্পিকে নিজের শেষ ১০০ মিটারে এমন বাড়তি একটা অলংকার তো যোগ করতে চাইবেনই বোল্ট।

বোল্টের আধিপত্য ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারেন, এমন কেউ কি আছেন? লন্ডন অলিম্পিকের আগে হঠাৎই তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন ইয়োহান ব্লেক। জ্যামাইকান ট্রায়ালে হারিয়ে দিয়েছিলেন বোল্টকে। লন্ডনে তা না পারলেও রিওতে বোল্টের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ার কথা ছিল ব্লেকেরই। কিন্তু মাঝের চার বছরে ব্লেক হয়ে থাকলেন এক প্রহেলিকা। ট্র্যাকেই ছিলেন না অনেক দিন। এই অলিম্পিকে অবশ্য আছেন। কাল নিজের হিট জিতলেন ১০.১১ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে।
হিট জিতলেন জাস্টিন গ্যাটলিনও। ১০.০১ সেকেন্ডে শেষ করলেন গত কিছুদিন বোল্টের সবচেয়ে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী।

যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গ্যাটলিন তুলনা করেন বাস্কেটবলের কোবি ব্রায়ান্ট-লেব্রন জেমস ও ফুটবলের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো-লিওনেল মেসির দ্বৈরথের সঙ্গে। যেটিকে একটু বাড়াবাড়ি বলেই মনে হয়। বাকি যে দুটি জোড়ার কথা বলেছেন গ্যাটলিন, সেখানে বিজয়ী বদল হয়। কিন্তু এখানে তো সব সময়ই বিজয়ী একজনই। অলিম্পিক বা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে বোল্টকে কখনো হারাতে পারেননি গ্যাটলিন। যদিও ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বছরের দ্রুততম ৭টি সময়ের ৬টিই তাঁর। বেইজিং আর লন্ডন অলিম্পিক দুটি সমার্থক হয়ে গেছে বোল্টের সঙ্গে। তবে অলিম্পিকে আবির্ভাব কিন্তু ২০০৪ এথেন্সে। সেই অলিম্পিকে যে বোল্ট ছিলেন, এটাই অনেকের মনে থাকে না। জাস্টিন গ্যাটলিনকে অবশ্য ভোলার উপায় নেই। এথেন্সে ১০০ মিটারের সোনা জিতেছিলেন গ্যাটলিনই। পরে ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে যেটি খোয়াতে হয় তাঁকে। নিষেধাজ্ঞা শেষ করে গ্যাটলিন ফিরতে ফিরতে ট্র্যাকে বোল্ট-রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

শুধু ট্র্যাকেই নয়, দর্শকদের মনেও। হিটে বোল্টের দৌড় দেখতেই অলিম্পিক স্টেডিয়াম প্রায় ভরে গেল। ঢুকলেন তুমুল করতালিতে সিক্ত হয়ে। একটু পর স্টার্টিং লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেই মাথার ওপর দুহাত তুলে তালি দিতে বললেন সবাইকে। দৌড় শেষ করার পর আবারও। যতটুকু জোরে দৌড়ালে হিট জেতা যায়, ঠিক ততটুকুই দিলেন। শেষ দিকে হেলেদুলে দৌড়েও সময় নিলেন ১০.০৭ সেকেন্ড।

আজ ফাইনালে টাইমিংটা নিশ্চয়ই এমন থাকবে না। তবে হেলেদুলে শেষ করার ওই দৃশ্য কিন্তু ফিরে আসতেই পারে!