হায় পরিবেশ দিবস! হায় বুড়িগঙ্গা!

0
276

115cbb5c9e56836083e0566839c26db0-Untitled-5বছর বছর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। এসব দিবস পালনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার; পরিবেশের গুরুত্বের বিষয়টি স্মরণে রাখা, সবার সামনে তা তুলে ধরা এবং সচেতনতা বাড়ানো এবং যেসব ক্ষেত্রে পরিবেশের বারোটা বেজে গেছে, সেগুলো নজরে আনা ও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো। ৫ জুন নিয়মমাফিক বাংলাদেশে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হলো। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন বলছে, পাঁচ বছর আগে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বুড়িগঙ্গায় যে মাত্রায় দূষণ ছিল, এখন সেই মাত্রা অনেক বেশি। বুড়িগঙ্গার দূষণ নিয়ে এত আলোচনা ও নানা উদ্যোগের পরও যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে খারাপের দিকে যায়, তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘পরিবেশ’-এর বিবেচনাটি কতটা শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা অনুমান করা যায়।

ঢাকার সঙ্গে যে নদীটির নাম জড়িয়ে আছে, তা বুড়িগঙ্গা। এই শহর ও নদীটির অধঃপতন যেন পাল্লা দিয়ে চলছে। বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অনুপযুক্ত কয়েকটি শহরের মধ্যে আছে ঢাকা, আর বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকার নদী বুড়িগঙ্গা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশসংক্রান্ত সাইট সোয়াপবক্সি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত যে ১০টি নদীর তালিকা করেছে, তার মধ্যে বুড়িগঙ্গার নাম ৮ নম্বরে (২৩ মে ২০১৬)।

এর কারণ হিসেবে সেখানে বলা হয়েছে, দূষণ সৃষ্টিকারী হেন জিনিস নেই, যা বুড়িগঙ্গার পানিতে গিয়ে মিশছে না। টেক্সটাইলস কারখানা থেকে শুরু করে সব ধরনের কলকারখানার বর্জ্য, গৃহস্থলির বর্জ্য, পচা ফলমূল থেকে শুরু করে শাকসবজি, হাসপাতালের বর্জ্য, সুয়ারেজের বর্জ্য, মরা প্রাণী, প্লাস্টিকের বর্জ্য ও পেট্রোলিয়াম—কোনো কিছুই বাদ নেই। প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় ৪ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য এসে পড়ে। নদীতে সুয়ারেজের যে বর্জ্য ফেলা হয়, তার ৮০ শতাংশই কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়া বুড়িগঙ্গায় মেশে।

বুড়িগঙ্গা কেন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর একটি, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার। আমরা যদি বুড়িগঙ্গাকে ভাগাড় বানাই, তবে তা-ই তো হওয়ার কথা। পাঁচ বছর আগের তুলনায় বুড়িগঙ্গায় দূষণের মাত্রা যেহেতু বেড়েছে, ফলে বুঝতে হবে যে এই সময়ে দূষণ দূর করার যেসব উদ্যোগ ও কথাবার্তা আমরা শুনেছি, তা কাজে দেয়নি। বরং বুড়িগঙ্গায় বর্জ্য ফেলার পরিমাণ দিনে দিনে বেড়েছে। ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, নদী রক্ষা করা ও দূষণমুক্ত করা সেসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দায়িত্ব, তাদের বিরুদ্ধেই নদীদূষণের অভিযোগ রয়েছে। ওয়াসা বা সিটি করপোরেশনের ময়লা যদি নদীতে গিয়ে পড়ে, তবে নদী রক্ষা পাবে কীভাবে? ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোর নদীতে যেসব কলকারখানার বর্জ্য মেলে, সেগুলোতে আইন অনুযায়ী পরিশোধনযন্ত্র বা ইটিপি থাকার কথা। কিছু কারাখানায় তা বসানো হলেও সব সময়ে তা চালু থাকে না। এসব দেখার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগের। সেই কাজটি যথাযথভাবে পলিত হলে বুড়িগঙ্গার দশা দিনে দিনে খারাপ হতো না।

আমাদের মনে আছে, ঢাকা দক্ষিণের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকনের প্রধান নির্বাচনী স্লোগান ছিল ‘পরিকল্পিত উন্নয়ন, সুযোগের সমতা, নিরাপদ ও দূষণমুক্ত আধুনিক ঢাকা’। এ জন্য তিনি যে পাঁচটি খাতকে তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছিলেন, তার ২ নম্বরেই ছিল ‘দূষণমুক্ত নাব্য ও নিরাপদ বুড়িগঙ্গা’। দায়িত্ব পালনের এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এখন তাঁর কাছ থেকে শোনা গেল, বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে তার সিটি করপোরেশন এবং এতে নদী দখল ও দূষণ দুটোই কমবে। ভরসা রাখতে চাই তাঁর কথায়, কিন্তু গত পাঁচ বছরে যখন বুড়িগঙ্গার অবস্থা দিনে দিনে খারাপের দিকেই গেল, তখন আশাবাদী হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সিটি করপোরেশনের ময়লা যে বুড়িগঙ্গা দূষণ করছে, তার বিহিতটুকু আমরা সবার আগে আশা করি। ডিএসসিসির বর্জ্যের কনটেইনার, শ্যামবাজারের বাজারের শাকসবজির বর্জ্য বা ফলের আড়তের পচা ফলমূল থেকে যদি তিনি বুড়িগঙ্গাকে রেহাই দিতে পারেন, তবে অন্তত তাকে শুভসূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ‘বড় প্রকল্প’ বাস্তবায়নের আগে অন্তত এটুকু করে দেখান। আমরা ভরসা পাব।