হায়দরাবাদ টেস্ট “প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ”

0
232
untitled-2_269710স্পোর্টস ডেস্ক: বসন্ত কি এসে গেছে? নিজামের শহরে কোকিল দেখা না যাক, দু’দিন বাদে ভ্যালেন্টাইনস ডের তোড়জোড়ের কিন্তু কমতি নেই। ফুলের দোকানিরা অর্ডার নিচ্ছেন এখানে অনলাইনে! তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়াল পড়ে জানা গেল, গতকাল ছিল নাকি ‘প্রমিজ ডে’! তা সেই প্রতিশ্রুতি দিবসেই মুশফিক আর মিরাজ তাদের কথা রাখলেন। তামিমের অমন রানআউট, উমেশ যাদবের মুহুর্মুহু রিভার্স সুইং, সাকিবের ‘আমি পরোয়া করি না’ জাতীয় আউটের ধরন- ১০৯ রানে যখন ৪ উইকেট তখন গোটা মাঠে কালবৈশাখীর পূর্বাভাস!
সেখান থেকেই দাঁতে দাঁত চেপে ক্রিজে পড়ে থেকে যেন বসন্তেরই আগমনী নিয়ে এলেন দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। নববসন্তের এই যাত্রায় সঙ্গী করলেন মেহেদী মিরাজকে। অধিনায়কের লড়াকু ইনিংসের পাশে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন মিরাজ। দু’জনের ৩২.৫ ওভার পর্যন্ত ৮৭ রানের এ অসমাপ্ত জুটিই এখন আশার তরী বেঁধেছে। ৬ উইকেটে ৩২২, ৩৬৫ রানের দেনা এখনও কাঁধে। তার পরও গতকাল শেষ সেশনে যে ধৈর্য আর সহনশীলতায় তারা ভারতীয় বোলারদের মোকাবেলা করেছেন, তাতে কোহলির চুইংগাম চিবানোর গতিও যেন কমে গেছে। গতকাল বাংলাদেশের সেরা প্রাপ্তি দিনশেষে মুশফিক-মিরাজের যুগলবন্দি। একজন অধিনায়কোচিত দৃঢ়তায় ব্যাটিং করেছেন। অন্যজন খুঁজে পেয়েছেন বোলিংয়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া নিজের ‘ব্যাটসম্যান’ পরিচিতি।

আজ যদি দিনের প্রথম সেশন মুশফিক তার যোদ্ধাদের নিয়ে এই মঞ্চে লড়াই করে যেতে পারেন, তাহলে দারুণ একটা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে টেস্টের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত। ফলোঅন এড়াতে এখনও দরকার ১৬৬ রান, এই রান টপকাতে পারলে তো ভারতকে আবার নামতেই হবে। হয়তো মুশফিকরা আরও একশ’ করলেও কোহলিরা আবার ব্যাটিংয়ে নামবেন। কেননা গতকাল পর্যন্ত ১০৪ ওভার বোলিং করে তাদের বোলাররাও বিশ্রাম খুঁজছেন। ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্যই এখন ফলোঅন এড়ানো। যেভাবে মুশফিক ভাই ব্যাটিং করে যাচ্ছেন, তাতে সেটা সম্ভব।’ ম্যাচের পর সাংবাদিকদের  সামনে এসে বলছিলেন সাকিব।

দিন শেষে নিয়ম করে এদিনও পিচের কাছে গিয়ে ঘুরে এসেছিলেন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। হয়তো দেখতে গিয়েছিলেন, এই পিচে কী এমন জুজু ছিল যে, সকালে তিন উইকেট পড়ে গেল। অবশ্য তামিমের রানআউটের জন্য তো আর পিচ দায়ী নয়, মুমিনুলের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির খেসারত। স্কয়ার লেগে মুমিনুল বল পাঠিয়ে প্রথম রানটি দ্রুতই নিয়েছিলেন, তাতে ইঙ্গিত ছিল দ্বিতীয় রান নেওয়ার। কিন্তু মাঝপথে এসে দু’জনই গাড়ি ব্রেক করার মতো থেমে যান, ২৪ রানেই শেষ হয়ে যায় তামিমের সব সম্ভাবনা। এর পরই একদিক থেকে ভুবনেশ্বর কুমারের সুইং, অন্যদিক থেকে উমেশ যাদবের রিভার্স সুইং।

টানা ৯ ওভার বোলিং করেছিলেন উমেশ, অফ কাটারের মতো অস্ত্রও শানিয়েছিলেন ভারতীয় এই পেসার। সাকিবের মতে, তার ক্যারিয়ারে দেখা কোনো বোলারের সেরা স্পেল ছিল এটি। উমেশের এই রিভার্স সুইংয়েই এলবিডবি্লউর ফাঁদে পড়ে যান মুমিনুল। মাহমুদুল্লাহ এসে থিতু হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বটে; কিন্তু তিনিও ইশান্ত শর্মার ইনসুইংয়ের কাছে পরাস্ত। এরপর সাকিব এসেও সেই ঝড়ের মুখে পড়েন। সিদ্ধান্ত নেন মেরে খেলার। উমেশকেই কভার আর পয়েন্ট দিয়ে এরপর চারটি বাউন্ডারি হাঁকিয়েছিলেন। ঝুঁকি ছিল তার কিছু শটে, লাঞ্চের পর সাকিব আর মুশফিকের জুটি থেকেই দল প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ১০৭ রানের জুটি পেয়ে যায়। ২৭.৩ ওভার পর্যন্ত তারা শাসন করেন ভারতীয় বোলিং অ্যাটাক। যখন সব কিছুই প্রায় নিয়ন্ত্রণে, বলও পুরনো হয়ে গেছে, ব্যাটে আসছে বেশ ভালো। তখনই মস্তবড় ভুল করে বসেন সাকিব, অবশ্য ‘ভুল’ বললে ভুল বলা হবে, কেননা সাকিব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ইচ্ছা করেই অমন শট খেলেছেন। এটাই তার স্টাইল, এভাবেই সব সময় রান পান। আর এভাবেই নাকি খেলে যাবেন!

যাক সে কথা, সাকিব চলে যাওয়ার পর কিন্তু কঠিন এক চ্যালেঞ্জ চলে আসে মুশফিকের কাঁধে। তার রান তখন ৪৪, ৯৯ বল খেলে ক্রিজের ভাষা পড়ে নিয়েছেন। একজন যোগ্য সঙ্গীর অপেক্ষা শুধু তার। সাবি্বর এসেছিলেন ওই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। কিন্তু তিনিও তার স্টাইল থেকে বেরোতে পারেননি কিংবা চাননি। রবীন্দ্র জাদেজাকে ক্রস খেলতে গিয়ে এলবিডবি্লউ হয়ে যান। মুশফিকের কাছে এসেছিলেন সাবি্বর জানতে যে ‘ডিআরএস’ নেব কি-না। মুশফিক মাথা নিচু করে বুঝিয়ে দেন, এসব নিয়ে আর লাভ নেই। সাকিবের সঙ্গে রানআউটের ভুল বোঝাবুঝিতে তিন-তিনবার বেঁচে গেছেন তখন মুশফিক। স্লিপ, গালি, পয়েন্ট, স্কয়ার লেগ দিয়ে পুরো ঘিরে ধরেছেন তখন তাকে ভারতীয় বোলাররা। সেখান থেকে মিরাজকে নিয়ে একটু একটু করে ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যান অধিনায়ক। ১৩৩ বলে যখন তার পঞ্চাশ পূরণ হয় তখন গোটা গ্যালারি দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে তার এই সংগ্রামী ইনিংসকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল। হাততালি পড়েছিল মিরাজের ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতকেও। আগের দিনই মিরাজ বলেছিলেন, বোলিংয়ে কিছু হয়নি, দলের জন্য ব্যাট হাতে কিছু করতে চাই। সেটাই করে দেখিয়েছেন তিনি। জাদেজা আর অশ্বিনকে দারুণ কিছু কাট শটে বাউন্ডারিছাড়া করেছেন। দর্শনীয় কভার ড্রাইভ খেলেছেন ইশান্ত শর্মাকে। মূলত অশ্বিনকেই টার্গেট করেছিলেন মিরাজ। তার ২৭ বলে ২১ রান নেন মিরাজ।

পাঁচটি বাউন্ডারি হাঁকিয়েছিলেন পাকা হাতে। এদিন তার ব্যাটিং দেখে প্রেসবক্সেও অনেকেই খোঁজ নিতে থাকেন এই ছেলে অলরাউন্ডার কি-না। মিরাজ যে অনুর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক হয়ে কত কত ম্যাচ শুধু ব্যাটিং করেই জিতিয়েছেন, তা তাদের জানা ছিল না।

দায়িত্ব নিয়ে কীভাবে ব্যাটিং করতে হয় তা মিরাজের ওই বয়সেই শিখে আসা, মাঝে একবার উমেশ যাদবের বলে ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে যায়, দৌড়ে এসে মুশফিক তার কাঁধে হাত রেখে কিছু বলে যান- হয়তো বুঝিয়ে যান, তাদের দু’জনের ওপরই এখন সব দায়িত্ব এই ঐতিহাসিক টেস্টে দেশের মর্যাদা রক্ষার।