স্তনে ফোলা ভাব দেখা গেলেই কী ক্যান্সার হতে পারে?

0
146
স্তনের ফোলার মধ্যে ৬৮ শতাংশই ফাইব্রোএডিনোমাস ধরনের। ছবি : সংগৃহীত।
স্তনের ফোলার মধ্যে ৬৮ শতাংশই ফাইব্রোএডিনোমাস ধরনের। ছবি : সংগৃহীত।

লায়লার সারা পৃথিবীটাই টলমল করে ওঠে যখন সে স্তনে ফোলা দেখতে পায়। সে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, ভাবতে থাকে এটা ক্যান্সার নয়তো? সে ওই ফোলা অংশটিতে ব্যথা অনুভব করে এবং এটি সামান্য নরম মনে হয়। তার তখন মনে পড়লো কোথায় যেন পড়েছিলো স্তনের ফোলায় ব্যথা করলে এটা ক্যান্সার নয়। কিন্তু তাহলে এটা কী হতে পারে?  

পাটনা এর পরশ হাসপাতালের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. আর এন টাগোর পরামর্শ দেন যে, স্তনে  ফোলা দেখা গেলেও শান্ত থাকুন।  তিনি বলেন, ‘স্তনের ফোলার ১০ টি ঘটনার মধ্যে ৮ টিই benign ধরনের যা বিপদজনক নয় এবং ক্যান্সার সৃষ্টি করেনা। এটি সাধারণত তরুণীদের ও নারীর মেনোপোজ পূর্ববর্তী অবস্থায় হয়ে থাকে যা হওয়া খুবই সাধারণ একটি বিষয়’।  

বিনাইন ধরনের ফোলার ক্ষেত্রে পিন্ডটি নরম ও সঞ্চালনশীল হয়। অন্যদিকে ক্যান্সারের ফোলা বা  টিউমারের ক্ষেত্রে এটি শক্ত ও আবদ্ধ অবস্থায় থাকে, নড়াচড়া করেনা। স্তনের ফোলা সৃষ্টি হওয়ার কারণ ও উপসর্গগুলোর বিষয়ে জেনে নিই চলুন।

১। ফাইব্রোসিস্টিক ব্রেস্ট চেঞ্জ

সাধারণত গর্ভধারণের সময়ে নারীর স্তনে হতে দেখা যায় এই ধরনের পরিবর্তন। এ ধরনের পরিবর্তনের লক্ষণ ও কারণ হচ্ছে : 

লক্ষণ – স্তনে বৃত্তের মত ফোলা অংশ দেখা যায় এবং স্তনে ব্যথা করে, তবে মাসিক চক্রের সময় পার্থক্য দেখা যায়।

কারণ –  এর সঠিক কারণ সম্পর্কে এখনো জানা যায়নি। পিরিয়ডের সময়ে ইস্ট্রোজেনের আধিপত্য এবং প্রোজেস্টেরনের ঘাটতির মাধ্যমে এটি নির্ধারণ করা যায়। এর কারণে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় না কিন্তু স্তনে ফোলা বা অন্যকোন অস্বাভাবিকতা দেখা যেতে পারে।  তাই এক্ষেত্রে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজন।

হেল্মুথ বোরহের নামক একজন গবেষক বলেন, ফাইব্রোসিস্টিক ব্রেস্ট ডিজিজ অক্ষতিকর রোগ নয়, এর চিকিৎসা করা প্রয়োজন। ফেলে ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমবে।

২। ব্রেস্ট সিস্ট

স্তনের মধ্যে তরলে পরিপূর্ণ থলিকেই ব্রেস্ট সিস্ট বলে। এটি একটি অথবা উভয় স্তনেই হতে পারে। স্তনের সিস্ট সরল বা জটিল ধরনের হতে পারে। এ ধরনের সিস্ট নরম ও বিনাইন ধরনের হয় এবং  জটিল সিস্ট ম্যালিগন্যান্ট ধরনের হয়ে থাকে এবং বায়োপসি করার প্রয়োজন হয়। স্তনের ফোলার  ২৫ শতাংশই ব্রেস্ট সিস্টে পরিণত হয়। ৩৫ বছরের বেশি বয়সের নারীদের হয়ে থাকে এবং মেনোপোজ হয়েছে এমন নারীদের হতে দেখা যায় বেশি।  

লক্ষণ –

সিম্পল সিস্ট – এধরণের সিস্ট তরলে পরিপূর্ণ থাকে এবং গোলাকার বা ডিম্বাকৃতির হয়ে থাকে। এটি একটি বা অনেকগুলো হতে পারে। মাসিক চক্রের সময় এর আকার ও সংখ্যায় পরিবর্তন হতে দেখা যায়। এদের অনেকবেশি স্পষ্টভাবে দেখা যায় প্রিমিন্সট্রুয়াল ফেজ এ।

কমপ্লিকেটেড সিস্ট – এ ধরনের সিস্ট ও তরলে পরিপূর্ণ থাকে এবং পুঁজও থাকে। এ ধরনের সিস্টে ব্যথা হয়, প্রদাহ হয় এবং এরা দ্রুত বড় হতে থাকে। কখনো কখনো নিপল ডিসচার্জ হতে দেখা যায়।

কমপ্লেক্স সিস্ট – এ ধরনের সিস্ট শক্ত ও মোটা দেয়ালের হয়। সাধারণত এ ধরনের সিস্ট হয়না, যদি হয় তাহলে তা ম্যালিগন্যান্ট ধরনের হতে পারে। তাই বায়োপসি করাতে হয়।

কারণ – ব্রেস্ট সিস্ট হওয়ার কারণ এখোনো জানতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। ইস্ট্রোজেন এর আধিপত্য ও প্রোজেস্টেরনের ঘাটতির কারণেই মাসিক চক্রের সময়ে হয়ে থাকে সিস্ট।

৩। ব্রেস্ট ফাইব্রোএডিনোমা

ফাইব্রোএডিনোমা মসৃণ, নরম পিন্ড যা আঁশ এবং গ্রন্থিময় টিস্যু নিয়ে গঠিত। কিশোরীদের এবং ৩০ বছরের কম বয়সের নারীদের হয়ে থাকে এই ধরনের সিস্ট। স্তনের ফোলার মধ্যে ৬৮ শতাংশই ফাইব্রোএডিনোমাস ধরনের। সাধারণত এ ধরনের ফোলার আকার ১-৩ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে এবং স্তনের উপরের অংশে হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে এই ফোলা ১০ সেন্টিমিটার ও হয়ে থাকে। এর ফলে স্তনে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। ফাইব্রোএডিনোমা ৩ ধরনের হয়ে থাকে – সিম্পল ফাইব্রোএডিনোমা, জায়ান্ট জুভেনাইল ফাইব্রোএডিনোমা এবং মাল্টিসেন্ট্রিকফাইব্রোএডিনোমা।

লক্ষণ –

–      ব্যথাহীন, মসৃণ এবং নড়াচড়া করা যায় এমন রাবারের মত গঠনের হয় এবং এর বর্ডার থাকে।

–      জায়ান্ট ফাইব্রোএডিনোমার ওজন ৫০০ গ্রাম এর মত হয়।

–      এটি আস্তে আস্তে বড় হয় এবং ব্যথা থাকেনা, নিপল বা ত্বকে কোন পরিবর্তন ও হয়না। কিন্তু মাসিক চক্রের সাথে সাথে আকারের পরিবর্তন হয়।

কারণ – স্তনের অন্যান্য ফোলার মতোই ইস্ট্রোজেন এর প্রভাবে হয়ে থাকে ফাইব্রোএডিনোমা।

ঝুঁকির কারণ – মেনোপোজের আগে ইস্ট্রোজেন-প্রোজেস্টেরন ওরাল কন্ট্রাসেপ্টিভ গ্রহণ করলে  এবং বিএমআই ২৫-৩০ এ বৃদ্ধি পেলে ফাইব্রোএডিনোমা হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় জানানো হয়েছে যে, যাদের ফাইব্রোএডিনোমা থাকে তাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি ২.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

৪। ব্রেস্ট ক্যান্সার

স্তনের কোষ থেকে উৎপন্ন হওয়া এক ধরনের ম্যালিগন্যান্ট টিউমার হচ্ছে ব্রেস্ট ক্যান্সার। এই ম্যালিগন্যান্ট কোষ তার প্রতিবেশি কোষকে আক্রমণ করে এবং শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে যায়।

ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে আছেন যারা

–      ৫০ বা তার বেশি বয়স যাদের  

–      পারিবারিক ইতিহাস

–      ব্রেস্ট সিস্ট, বিশেষ করে শক্ত প্রকৃতির

–      হরমোন থেরাপি

–      আয়োনাইজিং রেডিয়েশন

–      স্থূলতা

ব্রেস্ট ক্যান্সারের সাধারণ লক্ষণগুলো হচ্ছে –

স্তনে ফোলা দেখা যায়, স্তনে ব্যথা করে এবং নিপল ডিসচার্জ হয়। একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে এই ৩ টি উপসর্গের সাথে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সম্পর্ক নেই। কখোনো কখনো ব্রেস্টের ফোলা যেটা নড়াচড়া করে তার থেকেও ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। শক্ত হয়ে যাওয়া পিন্ড অনেকবেশি মারাত্মক।

স্তনের ফোলাটি বিনাইন নাকি ম্যালিগন্যান্ট তা শুধুমাত্র স্পর্শ করে বা অনুভব করে ঠিক করা যায়না। তাই যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরনাপন্ন হওয়াটা জরুরী। ফোলার ধরন দেখে চিকিৎসকই নিরাময় প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবেন।

সূত্র  : দ্যা হেলথ সাইট