সৌদি-ইরান সম্পর্ক কোনদিকে?

0
49

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ৪ নভেম্বর দুর্নীতিবিরোধী একটি প্রচারণা শুরু করেছেন, যার আওতায় অনেক মন্ত্রী এবং রাজপরিবারের কিছু সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রিয়াদের সর্বশেষ এ পরিস্থিতি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে চলমান রাখা ও অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির উচ্চ ঝুঁকির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। দৃঢ় প্রত্যয়ী সৌদি যুবরাজ দেশকে ভিন্নমতাবলম্বী মুক্তকরণ এবং বিদেশে বাগাড়ম্বর ছড়ানোর মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য বদ্ধপরিকর।

এমন ভিন্নমুখী পদক্ষেপ অভ্যন্তরীণ গোলযোগ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়ার সম্ভাব্য লক্ষ্যে হলেও তা লেভান্ত থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে দৃঢ় সমর্থ হওয়া ইরানের সাহসী প্রশাসনের সশস্ত্র ছায়াযুদ্ধকে চ্যালেঞ্জ করছে। যেখানে এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রিয়াদ ও তেহরানের মাঝে আসন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতির শামিল, সেখানে আরও কিছু নির্দেশক আছে যা থেকে স্পষ্ট যে, এটাই প্রকৃত ঘটনা না-ও হতে পারে।

৪ নভেম্বর কয়েক ঘণ্টা সময়ের মধ্যে বড় ধরনের দুটি ঘটনা ঘটেছে- ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সা’দ হারিরি রিয়াদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন, তারপরই সৌদি আরবের রাজধানীর দিকে ইয়েমেন থেকে ছোড়া দীর্ঘমাত্রার একটি ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী মাঝপথে ধ্বংস করে দেয়। সৌদি আরব প্রাথমিকভাবে ওই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুথিদের দায়ী করে এবং দেশটির সঙ্গে স্থল, নৌ ও আকাশপথের সব সীমান্ত বন্ধ করে দেয়; কিন্তু এ রাজনৈতিক উপাখ্যান ৬ নভেম্বর পরিবর্তিত হয়ে যায়।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের বলেন, ‘এটি ছিল ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র, যা হুথিদের দখলকৃত ইয়েমেন অঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহ নিক্ষেপ করেছে’। একই দিন সৌদির আরেক মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, লেবাননের মন্ত্রিসভার সঙ্গে রিয়াদের আচরণ হবে ‘হিজবুল্লাহর আগ্রাসনের কারণে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী মন্ত্রিসভা হিসেবে’।

সৌদি আরবের এ বিবৃতিগুলোকে খুব একটা মূল্যায়ন করা উচিত হবে না অন্তত চারটি কারণে।

প্রথমত, তেহরানের কক্ষপথের সবচেয়ে দুর্বল সংযোগগুলো- বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ইরাক ও সিরিয়ার বিপরীতে লেবানন ও ইয়েমেনের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে সৌদি আরব। লেবাননের একটি পরিচিত সমঝোতামূলক পদ্ধতি আছে এবং দেশটিতে অভাবনীয়ভাবে রাজনৈতিক কক্ষপথ গড়ে তোলা হচ্ছে। লেবাননের সৌদি মিত্ররা সতর্কতার সঙ্গে অবগত যে হিজবুল্লাহর মুখোমুখি অবস্থানের সামনে মিত্রদের সহায়তার জন্য সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না রিয়াদ। ইয়েমেনে ৩৩ মাসের যুদ্ধের পর দেশটিতে মানবিক ও বস্তুগত ক্ষতির আর তেমন কিছু বাকি নেই, যা দেশটির মানচিত্র পরিবর্তন ঘটানোর দিকে চালিত করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সৌদির বাগাড়ম্বর দেশটির পররাষ্ট্রনীতির অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সম্পৃক্ত থাকতে নিজেদের ইচ্ছার নিদর্শন হিসেবে গত সপ্তাহে ইরাক ও লেবাননে দু’জন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়েছে সৌদি আরব। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পর এ বছরের ২৫ অক্টোবর দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য এগিয়ে যেতে চূড়ান্তভাবে সুইজারল্যান্ড সরকারকে মত দেয় সৌদি আরব ও ইরান।

দীর্ঘমেয়াদের অনুপস্থিতির পর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানো এবং নতুন বাজার ধরার আশা নিয়ে ইরাকে ফিরেছে রিয়াদ। দেশটির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক মুখোমুখি অবস্থান সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সিরিয়ার বেলায় সৌদি আরব নির্বাসিত বেসামরিক বিরোধীদের সঙ্গে সীমিত প্রভাব ও তুলনামূলক নিচু প্রোফাইলধারীদের মাধ্যমে সংযোগ বজায় রেখেছে।

তৃতীয়ত, আপাতত ইরানিদের স্বার্থের ক্ষেত্রে মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়টি নেই। মে মাসে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির পুনর্নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হওয়া ইরানি প্রশাসন বর্তমানে সিরিয়ায় অর্জিত অবস্থানের সংরক্ষণ ও পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক ফল ঘরে তোলার দিকেই বেশি মনোযোগী।

ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ডের কমান্ডার মোহাম্মদ আলী জাফারি ৩১ অক্টোবর ঘোষণা করেছেন, নিজেদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ২ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত সীমিত করে আনবে তেহরান, যা ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানতে পারে। এ পদক্ষেপের অর্থ হচ্ছে ইউরোপের দেশগুলোকে এটা বোঝানো যে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার বাইরে রয়েছে।

১ নভেম্বর তেহরান সফর করা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানকে প্ররোচিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাগাড়ম্বর না করে সুর নরম করার জন্য। যেখানে রাশিয়া সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে, সেখানে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি হল সিরিয়া যুদ্ধ শেষ হচ্ছে না, এমনকি ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) পরাজিত করার পরও। এ ছাড়া তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া চুক্তি হলে তা হবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের স্বার্থের বিপরীতে চড়ামূল্য।

চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের উভয় কূল রাখার নীতি বাতাসের গতির সঙ্গে মিল রেখে ইরানের বিরুদ্ধে বাগাড়ম্বর ছড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে সৌদি আরবকে। যা হোক, সৌদির ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের ওপর যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘসময় পর্যন্ত সম্ভবত চোখ বন্ধ করে সমর্থন করে যাবে না। মনে হচ্ছে আবারও হোয়াইট হাউস ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ৫ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইট করেছেন, ‘আমার মতে সৌদি আরবের ওপর মাত্র একটি আঘাত করল ইরান।’ ৭ নভেম্বর পররাষ্ট্র বিভাগ বিবৃতি দিয়েছে যে কে ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করেছে তা এখনও ‘পরিপূর্ণ নিশ্চয়তার সঙ্গে’ বলা সম্ভব নয়।

লেবাননের সরকার ও সামরিক বাহিনীর ওপর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করার মাধ্যমে লেবানন ইস্যুতে সৌদি আরবের অবস্থান সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা থেকে নিজেদের দূরে রাখছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগ ও পেন্টাগন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবস্থান ইরানের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সরাসরি বা ছায়া মুখোমুখি অবস্থানের কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পৌঁছায়নি। বিপরীতে, সিরিয়ার প্রশাসন ও এর মিত্ররা বর্তমানে আল-বাউকামাল ক্রসিং ও বাগদাদ-দামেস্ক মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত পর্বে রয়েছে, যেখানে মনে হচ্ছে ইরাক সীমান্তবর্তী সিরীয় প্রদেশ দাইর আজ-জোর যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরকে সহায়তা করছে।

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আসার পর সৌদি নেতৃত্বও সম্ভবত বাগাড়ম্বরের সুর নরম করে ফেলবে। হোয়াইট হাউস যখন রিয়াদকে সাময়িক সময়ের জন্য ছাড় দেবে, আরও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়বে। ইরান প্রত্যাশিতভাবেই নিজের প্রতিক্রিয়াকে চেপে রাখছে এবং একটি অপরিপক্ব মুখোমুখি অবস্থানের জন্য আঞ্চলিক অর্জনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পছন্দ করছে না। এ অবস্থায় যদি যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনে, অপ্রত্যাশিত পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম
জো ম্যাকারন : যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতি-বিশ্লেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here