“সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত ১০” যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সক্রিয় বাংলাদেশিরা

0
52

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: নিজেদের মধ্যে সমঝোতার সংকটে নিউইয়র্ক সিটির কাউন্সিলম্যান ও মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রমিক সিটি মেয়র নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি বাংলাদেশি প্রার্থী। তবে বেশ কয়েকটি সিটির মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের আসন পোক্ত করে নিয়েছেন তারা। ‘

লিবার্টি বেল’ সংরক্ষণকারী সিটি হিসেবে পরিচিত ফিলাডেলফিয়ার ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশি ড. নীনা আহমেদ। সিটি কাউন্সিলগুলোতে বিজয়ী সব বাংলাদেশিই যুক্ত ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে। বাংলাদেশি-আমেরিকানদের ৯৫ শতাংশেরও বেশি এই ডেমোক্র্যাটরা। খবর এনআরবি নিউজের।

গত ৭ নভেম্বরের সর্বশেষ নির্বাচনেও বাংলাদেশিরা নিজেদের অবস্থান অটুট রাখতে পেরেছেন পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের মিলবোর্নবরো এবং আপার ডারবি টাউনশিপে। নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের হেলডন সিটির কাউন্সিলওম্যান তাহসিনা আহমেদ পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। একই অঙ্গরাজ্যের প্লেইন্সবরো টাউনশিপে কাউন্সিলম্যান হিসেবে আগে থেকেই দায়িত্ব পালন করছেন মুক্তিযোদ্ধা ও বিজ্ঞানী ড. নূরুন্নবী। নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের প্যাটারসন সিটি কাউন্সিলের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও দায়িত্ব নেওয়ার জন্য দীর্ঘ এক বছর আইনগত লড়াই চালিয়েছেন শাহীন খালিক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, পরাজিত হওয়ার পর ভোট জালিয়াতির অভিযোগে এই মামলা করেছিলেন আরেক বাংলাদেশি মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি বাস করছেন জাতিসংঘের শহর নিউইয়র্কে। এ সংখ্যা কোনোভাবেই তিন লাখের কম নয়। অথচ এখন পর্যন্ত কংগ্রেসম্যান হওয়া দূরের কথা; এই সিটির কাউন্সিলম্যানও (ওয়ার্ড কমিশনার) নির্বাচিত হতে পারেননি কোনো বাংলাদেশি। গত ৭ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে হেরে যাওয়ার পর রিফর্ম পার্টির প্রার্থী হিসেবে ব্যালটে নাম রয়ে যায় বাংলাদেশি তৈয়বুর রহমান হারুনের। এটি ছিল ২৪, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের ২৪ নম্বর ডিস্ট্রিক্টে। এই নির্বাচনী  এলাকার অধীনে রয়েছে জ্যামাইকা, জ্যামাইকা হিল্‌স, পার্কওয়ে ভিলেজ, ব্রায়ারউড, জ্যামাইকা এস্টেট, হিলক্রেস্ট, ফ্রেশ মেডোজ, ইলেক্টচেস্টার, পমোনক এবং কিউ গার্ডেন্স এলাকা।

এখানকার মোট ভোটারের ২৫ শতাংশের মতো বাংলাদেশি। এশিয়ান ভোটারের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি। হারুন একমাত্র এশিয়ান প্রার্থী হওয়ার পরও নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। গৃহীত ভোটের ৮৮ শতাংশ পেয়েছেন ররি ল্যাঙ্কমেন। অন্যদিকে হারুন পেয়েছেন মাত্র ১১ শতাংশ। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ানদের সমর্থন আদায় দূরের কথা, বাংলাদেশি-আমেরিকানরাও নিরঙ্কুশভাবে তাকে ভোট দেননি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এ জন্য দায়ী কে- এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে সামনে যারা প্রার্থী হবেন তাদের উচিত হবে কমুনিটিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে গণতান্ত্রিকতা ও পারস্পরিক সহনশীলতার চর্চা করা। কারণ এসবের অনুপস্থিতিতেই ভোটব্যাংকের দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার পরও নিউইয়র্ক সিটির বেশ ক’টি এলাকায় নির্বাচিত হয়ে আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের স্থানে যেতে পারছেন না বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ানরা।

মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রমিক সিটির মোট ভোটারেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশিরা। গত কয়েক টার্মে এই সিটির ছয় কাউন্সিলম্যানের চারজনই ছিলেন বাংলাদেশি। অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশিদের নেতৃত্বে আসছিল এই সিটি।

এরই ধারাবাহিকতায় এবারের নির্বাচনে সেখানে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছিলেন বিদায়ী কাউন্সিলম্যান মোহাম্মদ হাসান। দলীয় প্রাইমারিতে চলতি মেয়রকে চ্যালেঞ্জ করেন মোহাম্মদ হাসানসহ আরেক বাংলাদেশি। অর্থাৎ ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকেই দুই বাংলাদেশি পরস্পরের বিরুদ্ধে ভোট চাইতে থাকেন। এতে বিরূপ প্রভাব পড়ে ভোটারদের মধ্যে। প্রাইমারিতে মোহাম্মদ হাসান টিকে গেলেও ভোটারদের, বিশেষত বাংলাদেশি ভোটারদের বিভক্তি অবসানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি তিনি। এই বিভক্তির সুযোগে ৭ নভেম্বরের নির্বাচনে বর্তমান মেয়র ক্যারেন মাজেওয়াস্কি ৬১ শতাংশ ভোট পেয়ে চতুর্থ টার্মের জন্য পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। হ্যামট্রমিকের নিকট প্রতিবেশী ডেট্রয়েট সিটির বাংলাদেশিদের অনেকে এ পরাজয়ের জন্য প্রার্থী হাসানকেই দায়ী করছেন। ‘ইগো’ দূর করে উদ্যোগী হলে তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বাংলাদেশি মেয়র হতে পারতেন বলে জানান কম্যুনিটি লিডাররা। হ্যামট্রমিক সিটির ছয় কাউন্সিলরের মধ্যে এখন মাত্র দু’জন বাংলাদেশি রয়েছেন। তারা হলেন আবু মুসা ও এনাম মিয়া।

পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়া সিটির ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. নীনা আহমেদ। এই সিটিতে বাংলাদেশি ভোটার খুব কম থাকলেও তিনি নিজের কর্মতৎপরতা দিয়ে তার অবস্থান পোক্ত করেছেন। শুধু তাই নয়; হিসপ্যানিকরাও ড. নীনাকে আপন ভাবে অধিকার ও মর্যাদা আদায় প্রশ্নে। এই সিটির পাশের আপারডারবি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় টাউনশিপ। ৬৫ ভাষার মানুষের এ সিটির ভোটার এক লাখের মতো। কাউন্সিলম্যান ১১ জন। এর মধ্যে মাত্র ১ বাংলাদেশি শেখ মোহাম্মদ সিদ্দিক নিজের অবস্থানকে সুসংহত রাখার পাশাপাশি কমুনিটির লোকজনকেও মূলধারায় সম্পৃক্ত করে চলেছেন। তার মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালে। বাংলাদেশ সোসাইটি অব পেনসিলভেনিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেখ সিদ্দিক বৃহত্তর ফিলাডেলফিয়ার প্রবাসীদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিনি বলেন, প্রবাসীরা সংঘবদ্ধ থাকলে এখানে অনেক কিছুই করা সম্ভব।

ফিলাডেলফিয়া ও আপার ডারবির মধ্যে অবস্থিত মিলবোর্ন সিটি। ১২ শতাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই সিটির ৫ কাউন্সিলম্যানের চারজনই বাংলাদেশি। তারা হলেন নুরুল হাসান, ফেরদৌস ইসলাম, মনসুর আলী মিঠু এবং মাহবুবুল আলম তৈয়ব। এখানকার অপর কাউন্সিলম্যান ভারতীয় আমেরিকান জাস্টিন স্কারিয়াহ। তিনি এই সিটি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট। আসছে জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন কাউন্সিলে ভাইস প্রেসিডেন্ট হতে পারেন নুরুল হাসান। প্রেসিডেন্ট পদটির জন্যও এখন এখানে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। নুরুল হাসান বলেন, জানুয়ারিতে নতুন কাউন্সিলের শপথ গ্রহণের পর সবার সমর্থনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হতে পারলে সর্বপ্রথম কাজ হবে সর্বসাধারণের জন্য ট্যাক্স রিবেট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। ট্যাক্স প্রদানকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি নিরাপদ জীবন-যাপনের প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকবে।

তবে অনেকেই মনে করেন, এই সিটির পুরো নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশিদের হাতে। কারণ বৃহত্তর ফিলাডেলফিয়া এলাকায় ১২-১৫ হাজার বাংলাদেশির বাস। জাতীয় ইস্যুতে তাদের মধ্যে ঐক্য থাকায় ফিলাডেলফিয়া সিটি হলের পাশের রাস্তায় বাংলাদেশের পতাকাও শোভা পাচ্ছে। আসছে বিজয় দিবসে সেখানে আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানালেন ডেপুটি মেয়র নীনা আহমেদ।

নিউজার্সির হেলডন সিটি কাউন্সিলওম্যান হিসেবে পুনরায় বিজয়ী হয়েছেন তাহসিনা আহমেদ। নিউজার্সির পার্সপেনিতে জন্মগ্রহণকারী তাহসিনা মনমাউথ ইউনিভার্সিটিতে সমাজকর্মে অধ্যয়নরত অবস্থায়ই কম্যুনিটি সার্ভিসের পথ ধরে তিন বছর আগে সিটি কাউন্সিলে জয়ী হন। এবার পুনর্নির্বাচিত হওয়ায় তার স্বপ্নের দিগন্ত আরও বিস্তৃত হয়েছে। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতেও যুক্ত হতে আগ্রহী তিনি। তাহসিনার বাবা সিলেটের গোলাপগঞ্জের লক্ষ্মীপাশা গ্রামের সন্তান আমিন উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ওর কর্ম-এলাকা ক্রমশ বাড়ছে। ওকে নিয়ে গর্বিত আমরা।’

এই অঙ্গরাজ্যের প্লেইন্সবরো টাউনশিপে গত ৩ টার্ম থেকেই নির্বাচিত হচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা ও বিজ্ঞানী ড. নূরুন্নবী। তিনিও ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতিতে আরও এগিয়ে যেতে আগ্রহী। তাই অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। মিশিগানের হাশিম ক্লার্ক কংগ্রেসম্যান হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশকে বিশেষ এক আসনে নিয়ে যান। কিন্তু তিনি পুনর্নির্বাচিত হতে পারেননি। এর পর জর্জিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া, টেনেসি প্রভৃতি এলাকা থেকে ইউএস কংগ্রেসে কয়েকজন বাংলাদেশি প্রার্থী হলেও এখন পর্যন্ত কেউই জয়ী হতে পারেননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here