সাহসী মানুষের গল্প! ( পর্ব-১ )

0
670

সাহসী হতে হলে ঠিক কী কী করতে হয় একজন মানুষকে? কতটা বেশি ঝুঁকির মুখোমুখি হলে কোন একজন মানুষকে সাহসী বলবেন আপনি? তবে আপনার দৃষ্টিতে সাহসের সংজ্ঞা যেটাই হোক না কেন, এমন কিছু মানুষের সাথে আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব যারা কেবল আপনি বা আমি নই- সবার চোখেই সাহসী! চলুন দেখে আসি অসম্ভব সাহসে ভরা টগবগে জীবন্ত সেই মানুষগুলোকে।

১. উইলি স্টেক

 হঠাৎ একদিন একজন মানুষ কোথা থেকে এসে বলতে শুরু করল সে নাকি অন্নপূর্ণায় উঠেছে। অন্নপূর্ণা মানে অন্নপূর্ণা পাহাড়ে। বরফ শীতল সেই পাহাড়ে সে একা উঠেছে। তাও আবার সাধারণ আর সব পাহাড় চড়ুয়েদের মতন নির্দিষ্ট পথ ধরে নয়। সে পাহাড়টিতে চড়েছে এর দক্ষিন দিক থেকে। যেখান থেকে পাহাড়ে উঠতে গিয়ে এর আগে মারা গেছেন অনেকে। ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে গেছেন। প্রথম প্রথম কেউ বিশ্বাসই করতে চাইলো না লোকটার কথা। পাগল না হলে মিথ্যুক! ভাবল সবাই। তবে সবাইকে চিন্তায় ফেলল লোকটির আগের পাহাড়ে চড়ার কিছু রেকর্ড। এর আগে সেই ২০০৭ সাল থেকে পরপর তিনবার অন্নপূর্ণার এদিক দিয়ে উঠতে চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু কখনো সঙ্গীর অসুস্থতা, কখনো পাহাড়ধ্বস- এমন হাজারটা কারণে প্রতিবারই পিছিয়ে পড়েছে সে। হেরে যেতে বাধ্য হয়েছে। তবে এবার নাকি সে আর পেছায় নি। নিজের এতদিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে জয় করেছে এমন বিপদজনক পাহাড় আর তার রাস্তাকে এক তুড়িতেই।

একটা সময় সবাই বলল- কোন প্রমান আছে তোমার কথার? প্রমান! সত্যিই তো। এইবার টনক নড়ল লোকটার। আসলেই তো তার হাতে কোন প্রমান নেই। কেউ ছিল না এই অভিযাত্রায় তার সঙ্গী হয়ে। আবার বরফধ্বসে হারিয়ে গেছে তার সাধের ক্যামেরাটাও। কিন্তু তাতে কি হয়েছে! বুক ফুলিয়ে বলল লোকটা সগর্বে- তোমাদের বিশ্বাস করার হয়ে করো নাহয় করোনা। লোকটার ভেতরে এতটা দৃঢ়তা দেখে আবশেষে একটা সময় সবাইই বুঝতে পারল ঠিক ঠিকই এই পাগল লোকটা অন্নপূর্ণা পাহাড় থেকে মরতে মরতে ফিরে এসেছে।

আর এই পাগল পাগল লোকটার নাম হল উইলি স্টেক। আপনার কি মনে হয় এভাবেই আপনি হিমালয় পর্বতও পেরোতে পারবেন? প্রশ্ন করা হয়েছিল উইলিকে। উইলির সোজাসাপ্টা জবাব- আন্নপূর্ণার মতন এমন সুযোগ একজন মানুষের জীবনে কেবল একবারই আসে। আমি সত্যিই জানি যে আমি আর এমন ধাঁচের অভিযাত্রা আর করতে চাইনা।

২. ওয়াসফিয়া নাজরীন

ছোট্টবেলায় সেই প্রথম কোন সাদা চামড়ার মানুষ দেখেছিল মেয়েটি। কেবল বাবা-মাই নয়। তাদের সাথে এসেছিল সাদা চামড়া এক ধবদবে ফর্সা মিষ্টি মেয়ে। যার সাথে খুব ভাব হয়ে গিয়েছির তার। মেয়েটার হাতে ছিল একটা হোলা-হুপ। ওটা নিয়ে একটু খেলতেই পাশের বাসার খালা এসে মেয়েটিকে বলে গেল- এগুলো নিয়ে মেয়েরা খেলেনা। দেখতে ভালো লাগেনা। তখনই মেয়েটা খেলা বন্ধ করে দিয়েছিল। খেলনাটা তুলে দিয়েছিল বিদেশী মেয়েটির হাতে। সাদা চামড়ার মেয়েগুলোই বুঝি কেবল খেলতে পারে এই খেলনা দিয়ে! ভেবেছিল মেয়েটি। আর তারপর আরো কত না এলো জীবনে। বাইকে চড়ো না, খেলতে যেওনা- কত ধরনের, কত জনের না। কিন্তু এই নায়ের শক্ত আবরণের ভেতরে থেকে থেকে যেন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল মেয়েটির মন। আস্তে আস্তে নিজেকে বুঝতে শিখল মেয়েটি। এভাবে আর চলতে দেওয়া যায়না। ভাবল সে। পড়াশোনা শেষ করে যোগ দিল কেয়ার এ। পতিতালয়ের নারী ও বাচ্চাদেরকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আরো সব সুবিধা দিতে এগিয়ে এল সে কেয়ার এর মাধ্যমে। আর এ ক্ষেত্রে সাহায্য করল বিদেশী সাহায্য। সবকিছু বেশ ঠিকঠাকই চলছিল। পতিতালয়ের আঁধার ছাড়াও যে বাইরের জগতে বেঁচে থাকার অনেক কটা রাস্তা আছে সেটা শিখে গিয়েছিল ওরা প্রায় সবাই। কিন্তু হুট করেই একটা বড় ধাক্কা লাগলো এই নতুন শেখায়। বিদেশী সাহায্য বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে গেল পতিতালয়ের মানুষগুলোকে নিয়ে করা কাজ। এতদিন ধরে পতিতালয়ের বাইরে এসেছে বলে বেশ আড়চোখে দেখা হচ্ছিল এগিয়ে আসা নারী আর বাচ্চাদেরকে। এবার সুযোগ পেয়ে সেই আড়চোখে আগুন জ্বলে উঠল। পতিতালয়ে ফিরে আসবার পর বঞ্চিত হতে শুরু করল তারা মানুষ হিসেবে আগের পাওয়া কিছু ছিঁটেফোঁটা সুবিধাও। আর এসবই লক্ষ্য করল সেইদিনের সেই মেয়ে ওয়াসফিয়া নাজরীন। মন ভেঙে গেল তার।

সেদিনই ভাবল ওয়াসফিয়া। বাইরের সাহায্য আর কত। ওদের ওপর নির্ভরতা আর কতদিন? বেরিয়ে আসতে হবে এর থেকে। মনে ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ইচ্ছা পূরণ করতে যে অনেক টাকা লাগে! কি করা যায় এখন? নিজের লক্ষ্যকে অনেক ভাবনার পর ওয়াসফিয়া ভাগ করল দুইভাগে। পাহাড়ে চড়ার শখ তার বহুদিনের। আর তার সাথে সবাইকে সাহায্য করার ইচ্ছাও এবার যোগ হল। প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে বাংলাদেশকে তুলে ধরল সেভেন সামিট ফাউন্ডেশনে। পাহাড়ে চড়া শুরু হল মেয়েটির। প্রথমদিকে অতটা নজর না দেওয়া হলেও এভারেস্ট জয়ের পরে বিশ্ব অবাক হয়ে তাকালো মেয়েটার দিকে। আর সবচাইতে অবাক ভাব জমে ছিল বাংলাদেশের চোখে। এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিল বাংলাদেশের এই রত্নটি?

বাংলাদেশের আশি শতাংশ মানুষই পাহাড় দেখেনি। প্রতিটি মহাদেশে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশীদেরকে বিভিন্ন মহাদেশে নিয়ে যাওয়া। এটি তাদেরকে অনেক গর্বিত করবে। বলেন ওয়াসফিয়া।

তবে এর আবার আরেকটা দিকও বেরিয়ে এল। নানা কাজে এবার ধীরে ধীরে বেশ ভালো উপার্জন হতে লাগল ওয়াসফিয়ার। আর সেই থেকে সে শুরু করল তার দ্বিতীয় লক্ষ্যটি অর্জনের চেষ্টা। পতিতালয়ের মানুষগুলোকে নরক থেকে সুন্দর একটা জীবনে আসতে গড়ে উঠল ওসেল ফাউন্ডেশন।

কবে থেকে এই পাহাড়ে চড়ার শুরু হল জানতে চাওয়া হলে ওয়াসফিয়া জানান ২০০৮ সালে অলিম্পিক গেমসের বিরোধিতা করবার সময় বেশ কয়েকবার তাকে তিব্বত ও নেপালে ভ্রমন করতে হয়। আর সেখান থেকেই তার পাহাড়ে চড়ার শুরু।

নিজের ফাউন্ডেশন তেরীর মাধ্যমে নিজের ওপরে নেওয়া ঝুঁকি সম্পর্কে ওয়াসফিয়া বলেন- আমার বেশ বড় কিছু ব্যাংক লোন আছে। আমি জানিনা ঠিক কী করে এগুলোকে শোধ করব। যদি বাস্তবতাকে সামনে আনা হয় তাহলে এগুলো সম্পর্কে আমার বেশ চিন্তিত হবার কথা ছিল। কিন্তু আমার মস্তিষ্ক তা নয়।

নিজের ছোটবেলার কথা মনে করে তিনি বলেন- আমি চাইনা আর কোন মেয়ে এমন অবস্থার ভেতর দিয়ে যাক। আর এখান থেকেই আমার পুরোটা শক্তি আসে।