সাদ’র অনউপস্থিতেই ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু

0
6

ঢাকা: তাবলীগ জামাতের বিশ্ব আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভির বিশ্বইজতেমায় যোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা এবং শঙ্কার মধ্যদিয়ে বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারি) প্রস্তুতি মুলক বয়ান শুরু হলেও আজ শুক্রবার (১২ জানুয়ারি) বাদ ফজর তাঁর অনউপস্থিতেই গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ তীরে শুরু হয়েছে ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমা বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। জর্ডানের তাবলীগ জামাতের মুরব্বি ওমর হোতিবের আ’মবয়ানের মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে এবারের ইজতেমার কার্যক্রম। মাওলানা আবদুল মতিন তার বয়ান অনুবাদ করে দিচ্ছেন।

এদিকে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মুসল্লি বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে সমবেত হয়েছেন। বাংলাদেশের মাওলানা মোশারফ হোসেন এবার বয়ান করেন। বাদ মাগরিব শুরু হবে মূল বয়ান।

এবারও দুই দফায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বইজতেমা। প্রথম দফা ১২জানুয়ারি থেকে ১৪জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় দফা ১৯ জানুয়ারি থেকে ২১জানুয়ারি চলবে। দুই দফারই শেষদিন অনুষ্ঠিত হবে তাবলীগ জামাতের প্রধান আকর্ষন আখেরী মোনাজাত। তবে এবার আখেরি মোনাজাতকে পরিচালনা করবেন তা এখনও নির্ধারিত হয়নি। গত কয়েক বছর ধরে ভারতের মাওলানা সাদ বিশ্বইজতেমায় বয়ান ছাড়াও আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু এবার তাকে নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ব ইজতেমায় বয়ান ও মোনাজাত পরিচালনা কে করবেন এনিয়ে অনেকটা অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে।

তাবলীগ জামাতের মুরুব্বী ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বুধবার দুপুরে মাওলানা সাদ বিশ্বইজতেমায় যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে বিমানযোগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করেন। কিন্তু তাবলীগ জামাতের হেফাজতপন্থী অংশ তাকে বিশ্বইজতেমায় যোগদানে বাধা দিতে বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান নেয় এবং সাদ বিরোধী শ্লোগান দেয়। পরে পুলিশ সাদের নিরাত্তাহীনতার জন্য তাকে বিমান বন্দর থেকে স্কটদিয়ে ঢাকার কাকারাইল মসজিদে নিয়ে যায়। এসময় সাদ বিরোধীদের একাংশ কাকরাইলের উদ্দেশ্যে এবং অপর অংশ বিশ্ব ইজতেমার ময়দানের দিকে রওনা হন। কাকরাইল মসজিদে যাতে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে না পারে সেজন্য পুলিশ ওই মসজিদের প্রধান ফটকসহ আশ-পাশের এলাকায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। বিমান বন্দর থেকে মাওলানা সাদের টঙ্গীর বিশ্বইজতেমায় যাওয়ার কথা ছিল। এ নিয়ে তিনি খুব শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

ইতোমধ্যে বিশ্বইজতেমার প্রস্তুতির সকল কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। দেশী-বিদেশী মুসুল্লীরা বুধবার ভোর থেকেই কনকনে শীত ও ঘনকুয়াশা উপেক্ষা করে ইজতেমা ময়দানে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত মুসুল্লীদের ওই আগমন অব্যাহত থাকবে।

ইজতেমা মাঠের মুরুব্বী প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন বলেন, টঙ্গীতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বইজতেমায় দুই পর্বে ৩২ জেলার মুসুল্লীরা অংশ নেবেন। প্রথম ধাপে ১৬ জেলা এবং দ্বিতীয় দফায় ১৬ জেলার মুসুল্লীরা বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ঢাকা জেলার মুসুল্লীরা দুই দফায়ই অংশ নেবেন। বাকি ৩২ জেলার মুসুল্লীরা (এবছর) নিজ নিজ জেলায় আঞ্চলিক ইজতেমায় অংশ নেবেন।

প্রথম দফায় ১৬ জেলার মুসুল্লীরা ৩২ খিত্তায়: বিশ্ব ইজতেমার মাঠে প্রতিজেলার মুসল্লিদের অবস্থানের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারিত থাকে। এ স্থানকে খিত্তা বলে।

প্রথম দফায় অংশগ্রহণকারী জেলাগুলোর মধ্যে হল- ঢাকা (১-৮নং, ১৬নং, ১৮নং, ২০নং ও ২১নং খিত্তা), নারায়ণগঞ্জ (১২নং ও ১৯নং খিত্তা), মাদারীপুর (১৫নং খিত্তা), গাইবান্ধা (১৩নং খিত্তা), শেরপুর (১১নং খিত্তা), লক্ষীপুর (২২-২৩নং খিত্তা), ভোলা (২৫-২৬নং খিত্তা), ঝালকাঠি (২৪নং খিত্তা), পটুয়াখালী (২৮নং খিত্তা) , নড়াইল (১৭নং খিত্তা), মাগুরা (২৭নং খিত্তা), পঞ্চগড় (৯নং খিত্তা), নীলফামারী (১০নং খিত্তা) ও নাটোর (১৪নং খিত্তা)।

গাজীপুরে মুসুল্লীদের গাড়ি পার্কিং: গাজীপুর জেলা তথ্য অফিসার এসএম রাহাত ও ট্রাফিক বিভাগের এএসপি মো. সালেহ উদ্দিন আহমদ জানান, ইজতেমা চলাকালীন সময় জয়দেবপুর চান্দনা-চৌরাস্তা হয়ে আগত মুসুল্লীদের বহনকারী যানবাহনের জন্য টঙ্গীস্থ কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিলস কম্পাউন্ড, মেঘনা টেক্সটাইল মিলের সামনের রাস্তার উভয় পাশে,সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি মাঠ প্রাঙ্গন, সফিউদ্দিন সরকার একাডেমির মাঠের উত্তরে টিআইসি মাঠ, জয়দেবপুর থানাধীন ভাওয়াল বদরে আলম সরকারী কলেজ মাঠ, চান্দনা-চৌরাস্তা হাইস্কুল মাঠ, জয়দেবপুর চান্দনা-চৌরাস্তা ট্রাক স্ট্যান্ড এবং নরসিংদী-কালীগঞ্জ হয়ে আগত মুসুল্লী বহণকারী যানবাহন টঙ্গীস্থ কে-টু নেভী), সিগারেট ফ্যাক্টরী সংলগ্ন খোলা জায়গায় গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ইজতেমাকালে গাজীপুরে যানচলাচল নির্দেশনা: ইজতেমায় আগত মুসুল্লীদের যানবাহন পার্কিংয়ের জন্য ১১জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা হতে উত্তবঙ্গ হতে আসা টঙ্গী-ঢাকাগামী যানবাহন চান্দনা-চৌরাস্তা হয়ে কোনাবাড়ি, চন্দ্রা-ত্রিমোড়, বাইমাইল, নবীনগর, আমিনবাজার হয়ে চলাচল করবে। এছাড়া ১১-১৩জানুয়ারি ও ১৮-২০জানুয়ারি পর্যন্ত বাস্তুহারা থেকে টঙ্গী ব্রীজ পর্যন্ত মহাসড়ক, স্টেশন রোড ওভারব্রীজ হতে টঙ্গী রেলগেট ও মন্নু ট্রেক্সটাইল মিল হতে কামারপাড়া ব্রীজ পর্যন্ত সড়কে মোটরযান ব্যাতিত রিকশা, ভ্যান ইত্যাদি চলাচল বন্ধ থাকবে।

আখেরী মোনাজাতের দিন: ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা-চৌরাস্তা হতে টঙ্গী ব্রীজ পর্যন্ত কালীগঞ্জ-টঙ্গী সড়কের মাজুখান ব্রীজ হতে স্টেশন রোড ওভারব্রীজ পর্যন্ত এবং কামারপাড়া ব্রীজ হতে মন্নু টেক্সটাইল মিলগেট পর্যন্ত সড়কপথ বন্ধ থাকবে। এরআগে ১৩জানুয়ারি এবং ২০ জানুয়ারি রাত ১০টা হতে টঙ্গীর নিমতলী রেলক্রসিং, কামারপাড়া ব্রীজ ও ভোগড়া বাইপাস দিয়ে ইজতেমাস্থলের দিকে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে ভোগড়া বাইপাস মোড় থেকে মুসুল্লীদের নিয়ে ইজতেমাস্থলের দিকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত শ্যাটল বাস চলাচল করবে। তবে বিকল্প হিসেবে ভোগড়া বাইপাস দিয়ে কোনাবাড়ি ও চন্দ্রা হয়ে এবং বিপরীত দিকে ৩০০ফুটের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল করবে।

নৌযান চলাচল নির্দেশনা: এছাড়া ৯জানুয়ারি থেকে ২১জানুয়ারি পর্যন্ত কামারপাড়া সেতু থেকে টঙ্গী সেতু পর্যন্ত তুরাগ নদীতে সকল প্রকার নৌযান চলাচল ও নোঙ্গর বন্ধ থাকবে। প্রয়োজনে নৌযানসমূহ টঙ্গী সেতুর পূর্ব পাশে এবং কামারপাড়া ব্রীজের উত্তর পাশে নোঙ্গর করতে পারবে। নারায়নগঞ্জ ছাড়াও সদরঘাট থেকে ৬টি ওয়াটার বাস টঙ্গী পর্যন্ত মুসুল্লী বহন করবে।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. হারুন অর রশীদ জানান, মুসুল্লীদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘœতা বিধানের জন্য টঙ্গী বিশ্বইজতেমা এলাকায় প্রায় সাত হাজার পুলিশ নিযুক্ত করা হয়েছে। তারা আট ভাগে ভাগ হয়ে পাঁচস্তরে মুসুল্লীদের নিরাপত্তা রক্ষার কাজ করবে। মুসুল্লীদের প্রবেশ পথে সন্দেহভাজনদের মেটাল ডিটেক্টর, ১৫টি ওয়াচ টাওয়ার ও ৪১টি সিসি ক্যামেরা থেকে পুরো ইজতেমাস্থল পর্যবেক্ষণ করা হবে। সাদা পোশাকে প্রতি খিত্তায় ৬জন করে পুলিশ দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া রোহিঙ্গাদেরও নজরদারি করা হবে। বিশ্বইজতেমা এলাকায় হকার ও ভিক্ষুক মুক্ত রাখা হবে। এজন্য গত রোববার থেকে ইজতেমার শেষ না হওয়া পর্যন্ত গাজীপুরের পুলিশ সদস্যদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। যানচলাচল স্বাভাবিক রাখতে ইজতেমা ময়দানগামী সড়কগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের ১৮শ সদস্য দায়িত্বপালন করবেন। এছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য আলাদাভাবে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, ও ফায়ার সার্ভিসের কন্টোল রুম স্থাপন করা হবে।

ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মো. গাউস আল মুনির জানান, ইজতেমা চলাকালে বিশেষ ট্রেন চালু হবে এবং প্রতিটি ট্রেন টঙ্গী রেলওয়ে জংশনে দুই মিনিট করে যাত্রা বিরতি করবে।

বিদ্যুত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ইজতেমা এলাকায় পাঁচটি ফিডারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বিদ্যুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল জানান, এবছর ১৫টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ইজতেমায় আগত মুসুল্লীদের অজু-গোসলের জন্য প্রতিদিন প্রায় চার কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হবে। এছাড়া মুসুল্লীদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক টয়লেট ও গোসলখানা স্থাপন করা হয়েছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র এমএ মান্নান জানান, ২৬টি ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশক নিধনের ঔষধ স্প্রে করা হবে। ২১টি গার্বেজ ট্রাকের মাধ্যমে ইজতেমা ময়দান থেকে বর্জ অপসারণ, ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা ও ময়দান এলাকায় প্রয়োজনী ব্লিচিং পাউডার সরবরাহ করা হবে। এখানে বিদেশী ক্যাম্পে রান্নার জন্য ১৩৬টি গ্যাসের চুলা স্থাপন করা হবে।

গাজীপুর সিভিল সার্জন মঞ্জুরুল হক জানান, টঙ্গী হাসপাতালে বার্ণ ইউনিট, অর্থোপেডিক্স ও ট্রমা, চর্ম-যৌন সার্জারী, অ্যাজমা, কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞসহ ছাড়াও তাদের তিনটি অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্পে শতাধিক চিকিৎসক, স্বাস্থকর্মী ও অফিসসহায়ক ২৪ঘন্টা ডিউটি করবে। মুসুল্লীদের সেবা দিতে ১৪টি অ্যাম্বলেন্স মোতায়েন থাকবে। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠণ ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য ৪৫টি চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র স্থাপন করছে। ১১জানুয়ারি থেকে ২১জানুয়ারি পর্যন্ত থেকে চিকিৎসকসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর জানান, ইজতেমা এলাকাসহ আশেপাশের এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, অশ্লীল পোস্টার অপসারন এবং হোটেল রেস্তোরায় বিশুদ্ধ খাবার নিশ্চিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মুসুল্লীদের যাতায়তের জন্য তুরাগে ৭টি ভাসমান ব্রীজ নির্মান করা হয়েছে। তুরাগে নৌটহল ছাড়াও ডুবুরীদল মোতায়েন থাকবে।

বিশ্বইজতেমার মুরুব্বী মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, বিশ্বইজতেমার প্রস্তুতির সকল প্রস্তুতি প্রায় সুসম্পন্ন হয়েছে। বিশ্বইজতেমার প্রথম দফা আগামি ১২জানুয়ারি থেকে ১৪জানুয়ারি পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফা ১৯ থেকে ২১জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদফার শেষ দিনে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৬৭সাল থেকে টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্বইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মাঠে মুসুল্লীদের স্থান সঙ্কুলা না হওয়ায় ২০১১সাল থেকে টঙ্গীতে দুই পর্বে বিশ্বইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম বছর যারা (যে ৩২ জেলার মুসুল্লী) টঙ্গীর বিশ্বইজতেমায় অংশ নেবেন তারা পরবর্তী বছর সেখানে যাবেন না। ওই বছর এসব জেলার মুসুল্লীরা নিজ নিজ জেলায় আঞ্চলিক ইজতেমায় শরিক হবেন। ২০১৫সাল থেকে প্রতিবছর টঙ্গীর বিশ্বইজতেমা পাশাপাশি জেলা জেলায় আঞ্চলিক ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

– সূত্র: পরিবর্তন ডট কম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here