সহজে নির্ণয় করা যায় জরায়ু মুখের ক্যানসার

0
7

আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা এজেন্সি সাম্প্রতিক এক জরিপে বলেছে বাংলাদেশে বছরে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি নারী জরায়ু মুখের ক্যানসারে মারা যাচ্ছে।

প্রতি বছর নতুন করে ১২ হাজারের মতো নারীর শরীরে এই ক্যানসার সনাক্ত হচ্ছে। অথচ অন্য ধরনের ক্যানসারের তুলনায় জরায়ু মুখের ক্যানসার খুব সহজে নির্ণয় করা যায়।

এমনকি হওয়ার আগেই ধরা যায়। তাছাড়া দেশের সকল সরকারি হাসপাতাল, এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও এটি নির্ণয়ের প্রাথমিক ধাপটি বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

এই ক্যানসার সম্পর্কে আরেকটি ভাল বিষয় হলো এটিই একমাত্র ক্যানসার যার টিকা রয়েছে। যা দেয়ার উপযুক্ত সময় হলো মেয়েদের যৌন জীবন শুরুর আগে।

তবুও বাংলাদেশে জরায়ু মুখের ক্যানসারের হার এত বেশি কেন? ঢাকায় জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইন্সটিটিউটের হাসপাতালে যেখানে সারা দেশ থেকে আসা রোগী ও তাদের আত্মীয়দের উপস্থিতি থাকে অনেক বেশি।

গাইনি অনকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ আফরোজা খানম বলছেন, জরায়ু মুখের ক্যানসার নিয়ে হাসপাতালে যেসব নারীরা আসেন তাদের বেশির ভাগেরই অনেক দেরি হয়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, জরায়ু মুখের ক্যানসারের মূল সমস্যা হলো এটি শেষ পর্যায়ে গেলেই শুধুমাত্র ব্যথা দেখা দেয়। এর লক্ষণগুলোকে অনেকেই মাসিকের সমস্যা বলে ভুল করে থাকেন।

তিনি বলেন, এতে প্রথম দিকে ব্যথা একদমই থাকে না। যখন রোগটা অনেক দূর ছড়িয়ে গিয়ে হাড়ের মধ্যে চলে যায়। এই পর্যায়ে গিয়ে ব্যথা হয়। প্রাথমিক ভাবে কোন ব্যথা থাকে না দেখেই কিন্তু আমাদের দেশের নারীরা আসে না। দেখা যায় দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব যাচ্ছে কিন্তু লজ্জায় সে কাউকে বলছে না। স্বামীর সাথে মেলামেশায় রক্ত যাচ্ছে সেটিও সে বলছে না। যখন আসে তখন অনেকে দেরি হয়ে যায়।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডাঃ জেবুন্নেসা বেগম জরায়ু মুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং সম্পর্কে প্রচারে সহায়তা করেন।

তিনি বলেন জরায়ু মুখের ক্যানসার হওয়ার আগেই নির্ণয়ে অনেক সময় পাওয়া যায়। তিনি এ সম্পর্কে বিস্তারিত বললেন, যে দুই প্রকার প্যাপিলোমা ভাইরাস দিয়ে এই ক্যানসার হয়, সহবাসের মাধ্যমেই সেটি আরো তাড়াতাড়ি ছড়ায়। ভাইরাসটি প্রবেশের সাথে সাথেই ক্যানসার হয় না। জরায়ু-মুখের ক্যানসারে ১৫ থেকে ২০ বছরও সময় লাগে জীবাণু প্রবেশের পর।

জরায়ু মুখ শব্দটি শুনলে অনেকেই এ নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। আর এর সাথে যৌন বিষয়টির সম্পর্ক থাকায় অনেকে একেবারেই কথা বলতে চান না।

জরায়ু মুখের ক্যানসার নির্ণয়ের পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপটি করতে মাত্র এক মিনিট লাগে বলেন ডাঃ জেবুন্নেসা বেগম। তিনি বলছেন, এর স্ক্রিনিংটা খুবই সহজ। কোন যন্ত্রপাতি লাগে না। ভিনেগার বা সিরকা ডাইলুট করে তুলায় লাগিয়ে জরায়ুর মুখে লাগিয়ে এক মিনিট রেখে দিলে জায়গাটি যদি সাদা হয়ে যায় তখন মনে করতে হবে এটি ক্যানসারের পূর্বাভাস।

তখন আমরা সেটি কোন পর্যায়ে আছে তা জানতে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে বাকি পরীক্ষা করতে পাঠাই। এমনও হয় খুব প্রাথমিক হলে সেখানেই রোগীর জরায়ুতে ইলেকট্রিক সেক দিয়ে দেয়া হয়। সেটাতেও কয়েক মিনিট লাগে।

বাংলাদেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি জেলা সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, এমনকি নির্বাচিত কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে জরায়ু মুখের ক্যানসার নির্ণয়ের প্রাথমিক ধাপটি বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

অর্থাৎ বিবাহিত ও যৌন সম্পর্ক হয় এমন নারীরা সিরকা দিয়ে পরীক্ষার সহজ এই ধাপটি করিয়ে নিলেই জেনে যাবেন তার এই ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা।

বয়স ৩০ হওয়ার পর থেকে প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পর পর একবার এই পরীক্ষাটি করিয়ে নিতে বলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু এত সহজ ও বিনামূল্যে সেবা থাকা সত্ত্বেও জরায়ু মুখের ক্যানসার বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে দ্বিতীয় প্রধান ক্যানসার। এতে বছরে মারা যাচ্ছে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি। নতুন করে ১২ হাজারের মতো নারীর শরীরে এই ক্যানসার সনাক্ত হচ্ছে।

ডাঃ আফরোজা খানম বলছেন, জরায়ু মুখের ক্যানসার সনাক্তকরণের বিনামূল্যের সেবাটি সম্পর্কে অনেক নারীরাই জানেন না। আবার অনেকেই বলেন আমার ক্যানসার হয় নাই আমি কেন যাবো। স্ক্রিনিং এর উপকারটি সম্পর্কে তাদের জানাটা খুব জরুরি।

বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডাঃ এম এ হাই বলেন, বাংলাদেশে মেয়েদের খুব অল্প বয়সে বিয়ে আর ঘন ঘন সন্তান জন্মদানকেই বলা হচ্ছে এর প্রধান কারণ।

তিনি আরো বলেন,অল্প বয়সে যৌন সঙ্গম আর খুব কম বয়সে বাচ্চা নেয়ায় জরায়ু মুখের উপর অনেক চাপ পড়ে। যেহেতু তারা অপুষ্টিতে ভোগে তাই তাদের সেরে উঠতে সময় লাগে। তাতে দেখা যাচ্ছে জরায়ু মুখের পুনর্গঠন ভাল মতো হয়না। এভাবে বারবার বাচ্চা হতে গিয়ে যদি বারবার ক্ষতি হয় তাহলে সেখানে একটা অস্বাভাবিক সেল তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কারণেও পরিবারে মেয়েদের দেখাশোনা করা হয় না। এমন কী আর বাংলাদেশে নারীদের একটি স্বভাব হলো সবাই খাওয়ার পরে কিছু থাকলে খায় না থাকলে খায়না।

ডাঃ হাই বলেন, বাংলাদেশে যৌনাঙ্গের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে শিক্ষার মারাত্মক অভাব। আমি আমার এক স্টাডিতে দেখেছি যে বাংলাদেশে গ্রামে ৭৫ শতাংশ নারীর জরায়ু-মুখে ইনফেকশন আছে। এর কারণ হচ্ছে সেক্সুয়াল অর্গানের পরিচ্ছন্নতার অভাব। তিনি বলেন, বাড়ির পুরুষ সদস্যদের এ ব্যাপারে তাদের সাথে কথা বলতে হবে।

এছাড়া যেসব নারীর বহু পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক, তারা রয়েছেন বেশি ঝুঁকিতে। অথবা যেসব পুরুষের অনেক যৌন সঙ্গী রয়েছে তারাও নারী সঙ্গীদের বেশি ঝুঁকিতে ফেলছেন।

সূত্র বিবিসি বাংলা