সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা-শ্রদ্ধায় সিক্ত কবি শহীদ কাদরী, বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন

0
282

08312016_11_LATE_SHAHEED_QUADRIঢাকা: একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি শহীদ কাদরী সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হলেন।কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনসহ নানা পেশার মানুষের ঢল নামে। সবাই ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত করেন সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এ আধুনিক কবিকে। সেখানে তার স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। খোলা হয় শোক বই।কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নাগরিক শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। পরে সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বাদ জোহর নামাজে জানাজা শেষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।আজ সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি বিমানে করে নিউইয়র্ক থেকে কবির মরদেহ ঢাকা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। গত রোববার তিনি নিউইয়র্কে ইন্তেকাল করেন।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত খরচে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কবির মরদেহ ও তার পরিবারের সদস্যদের দেশে আনা হয়।

08312016_12_LATE_SHAHEED_QUADRI

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন, বীর বিক্রম ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় শাকিল বলেন, কবির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ ব্যথিত হয়েছেন। মৃত্যুর আগে কবির দেশে আসার আকাঙ্খার কথা তার পরিবারের কাছ থেকে জানতে পেরে প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে কবিকে দেশে আনার ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, তিনি এ দেশের জনগণের নেতা। এমনকি বিশ্বনেতাদের মধ্যেও তিনি ব্যতিক্রম ও মানবিক। যখন কবির আকাঙ্খার কথা জানতে পারলেন, তখন কোন রকম কুণ্ঠাবোধ না করেই নিজ খরচে কবি ও তার পরিবারকে দেশে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুততার সাথে কবির মরদেহ দেশে আনাসহ দাফন পর্যন্ত সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন বলেও তিনি জানান।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালনকারী এ কবিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মিজানুর রহমান, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক হারুণ হাবীব, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ও সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি ড. মুহাম্মদ সামাদ, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, প্রমুখ কবিকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

বিভিন্ন দল ও সংগঠনের মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ঋষিজ, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, দেশ টিভি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, দৈনিক সমকাল পরিবার, ঢাকা পদাতিক, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, তথ্য অধিদপ্তর, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ, কণ্ঠশীলন, সত্যেন সেন শিল্পী সংস্থা, ¯্রােত আবৃত্তি সংসদ, ঢাকা থিয়েটার, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, স্বভূমি, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন, আওয়ামী সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ যুবমৈত্রী, আনন্দম, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, নজরুল ইনস্টিটিউট শ্রদ্ধা জানায়।

এ সময় কবি পতœী নীরা কাদরী স্মৃতিচারণ করে বলেন, অসুস্থতার কারণে তিনি শেষের দিতে বেশ দুর্বল হয়ে পরেছিলেন। ঘন ঘন ডায়ালাইসিস আর নিতে পারছিলেন না। তবে মৃত্যুর আগে তার লেখার বেশ ভাব এসেছিল বলেই মনে হতো, কিন্তু লিখতে পারতেন না। ডিকটেশন দিতে চাইতো, কিন্তু আমরা তা বুঝতাম না।তিনি বলেন, ডায়ালাইসিসের পরে তিনি এতটাই দুর্বল হয়ে পরতেন যে, নিজ হাতে কিছু খেতে পারতেন না। আমি মুখে তুলে খাইয়ে দিলে খুব খুশি হতেন। অল্প-বিস্তর যা-ই লিখতেন, তা লুকিয়ে রাখতেন, আমাদের সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। তবে কালি-কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত ভাইকে বারবার ফোন দিতে বলতেন।

আবুল হাসনাত জানান, কবি শহীদ কাদরী, কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। তার কবিতায় যেমন রোমান্টিকতা আছে, কেমনি আছে বেদনা। একদিকে প্রতিবাদ, অন্যদিকে স্বপ্ন ও আশা সবই উঠে এসেছে তার কবিতায়।রামেন্দু মজুমদার বলেন, ১৯৭৮ সালে বুকভরা অভিমান নিয়ে কবি কেন দেশ ত্যাগ করেছেন, তা জানি না। তবে ’৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুতে হত্যা তিনি মেনে নিতে পারেননি। এ নিয়ে কবি ‘হন্তারক’ শিরোনামে একটি কবিতাও লিখেছিলেন।

সুলতানা কামাল বলেন, তিনি বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবিদের একজন ছিলেন। তার কবিতায় দেশ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের কথা উঠে এসেছে। মফিদুল হক বলেন, শহীদ কাদরী আজীবন কবিতায় সমর্পিত ছিলেন। তিনি বাংলা কবিতায় নতুন মাত্রার জন্ম দেন। বাংলা কবিতার ইতিহাস লেখা হলে সেখানে তাকে স্থান দিতে হবে। তার লেখা ঝকঝকে, আধুনিক ও সমকালীন বলেই পাঠকপ্রিয়তার কমতি নেই।

শহীদ মিনারের এ শ্রদ্ধানুষ্ঠানে আবৃত্তিকার আহকামউল্লাহ কবির ‘তোমায় অভিনন্দন প্রিয়তমা’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন এবং জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের শিল্পীরা ‘ও আমারে দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা…’ গানটি পরিবেশন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।আধুনিক এ কবির নাগরিক স্মরণসভা আগামী ৭ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে। যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করবে বাংলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদ।এর আগে সকালে বিমানবন্দর থেকে কবির মরদেহ প্রথমে বারিধারার ডিওএইচএসে বড় ভাই শাহেদ কাদরীর বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি শেষবারের মতো ছোট ভাইয়ের মুখ দেখেন। এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বেলা ১১টা ১৭ মিনিটে কবির মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

কবির প্রিয় জায়গা বাংলা একাডেমিতে তার মরদেহ নেয়ার কথা থাকলেও সময় স্বল্পতার কারণে তা বাদ দেয়া হয়। বেলা পৌনে একটার দিকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে কবির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে বা জোহর জানাজা হয়। এরপর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে কবিকে অন্তিম শয়ানে শায়িত করা হয়।শহীদ কাদরী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। সম্পতি তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। অবশেষে গত রোববার নিউইর্য়কের একটি হাসপাতালে ৭৪ বয়সে তিনি মারা যান।১৯৭৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমী এবং ২০১১ সালে একুশে পদক অর্জন করেন। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম এ প্রধান কবি বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলোও ছিলেন।উত্তরাধিকার, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, কোথাও কোন ক্রন্দন নেই, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ কবির চারটি কাব্যগ্রন্থ।