সন্ত্রাসবাদ: সীমানা পেরিয়ে

0
318
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

সন্ত্রাসবাদ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রিটেনে এমপি জো কক্সের হত্যাকাণ্ড ও আমেরিকার অর‌ল্যান্ডোতে সমকামী ক্লাবে আক্রমণ এবং ৫০ জন লোক হত্যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো যে সন্ত্রাসবাদকে এতোদিন যারা প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন তারাও নিরাপদ নয়। ধীরে ধীরে তাদেরকেও সন্ত্রাসবাদ গ্রাস করছে। ব্রিটেনে জো কক্সের পরও শতাধিক এমপি অভিযোগ করেছেন তাদেরকে হত্যার অব্যাহত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। জো কক্সকে হত্যা করেছে এক খ্রিস্টান উগ্রবাদী আর সমকামী ক্লাব আক্রমণ করেছে এক ইসলামিক উগ্রবাদী। জঙ্গি সব ধর্মেই আছে এবং বিশ্বের সর্বত্র তাদের অবস্থান।

ভোটের ফলাফল যা দেখছি, গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের থাকা হচ্ছে না। এটা  নিশ্চিত হলে ব্রিটেনে সন্ত্রাসবাদ আরও বেড়ে যেতে পারে। কারণ উগ্রবাদী, সন্ত্রাসীরা চাচ্ছে না যে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকুক। ব্রিটেনে যে সন্ত্রাসীরা জো কক্সকে হত্যা করেছে তারা উগ্র-জাতীয়তাবাদী এবং বর্ণবাদী। সন্ত্রাসীরা বলছে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকলে ব্রিটেন তার স্বকীয় জাতীয়তার বৈশিষ্ট্য হারাবে। এমপি কক্স ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে প্রচার করছিল এজন্য হত্যাকারী মেয়ার তাকে ছুরি মেরে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। উগ্রিবাদীদের পাল্লাই ভারী হচ্ছে সর্বত্র। ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় প্রধান- এক জোট হয়েও থামাতে পারলো না এই উগ্রতা। ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রাখতে সম্মিলিতভাবে ব্যর্থ হলেন তারা।

ব্রিটেনে লেবার দলীয় এমপি টিউলিপ সিদ্দিকীকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাকে যে ভাষায় হুমকি দিয়েছে তার ভাষার গঠনশৈলী দেখে মনে হচ্ছে যে তার হুমকিদাতারা মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীর লোক। তারা বলেছে তোর নানাকেও মেরেছি তোকেও মারবো তোর খালাকেও মারবো। টিউলিপের নানা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তার খালা হলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত শেখ হাসিনাকে শেষ করতে এক পায়ের ওপর খাড়া। বঙ্গবন্ধুর হত্যা ষড়যন্ত্রে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। সুতরাং মনে হয় বিএনপি-জামায়াতের যারা লন্ডনে অবস্থান করছে তারাই টিউলিপ সিদ্দিকীকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। আওয়ামী লীগের তরফ থেকেও অভিযোগ তেমনই। তাদের সঙ্গে ব্রিটেনের সন্ত্রাসবাদীদের ঐক্য হওয়াও বিচিত্র নয়। বড় কাজের উদ্যোগ যারা নেন তাদের প্রতিপক্ষও তেমন জোরালো হয়।
বঙ্গবন্ধু একটা দেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাকেই হত্যা করা হয়েছে। আব্রাহাম লিংকন না হলে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র দুই টুকরা হয়ে যেত। গৃহযুদ্ধের অবসানের পর তাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়ছে। মহতি উদ্যোক্তাদের পেছনে হীন ষড়যন্ত্রকারী সব সময় থাকে। কখনও কখনও তারা সফলও হয়।

বাংলাদেশকে নিয়ে অনেকে উদ্বিগ্ন। কারণ তারা চিন্তা করছে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ সন্ত্রাসের অভায়ারাণ্য হয়ে উঠছে। ভারতও কাঁটা তারের বেড়ার সঙ্গে লেজার প্রাচীর গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে- যেন আইএস এর কোনও লোক ভারতে ঢুকতে না পারে। ভাবখানা যেন বাংলাদেশেই রয়েছে আইএস এর ঘাঁটি, সমস্ত উগ্রবাদীরা। আমেরিকার সঙ্গে তো বাংলাদেশের কোনও সীমানা নেই সেখানে মতিন মার্কা লোক গেল কোথা থেকে! আসলে এ উপ-মহাদেশকে সন্ত্রাস মুক্ত রাখতে চাইলে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সমঝোতা প্রয়োজন। শেখ হাসিনার সরকার নিরবিচ্ছিন্ন সহায়তা প্রদান করেছে বলে ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সন্ত্রাস থেকে সিংহভাগ মুক্ত হয়ে এখন নিঃশ্বাস ফেলছে। মিয়ানমার আর ভারত যদি সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় প্রশ্রয় প্রদান না করে তবে এ কথা শত ভাগ নিশ্চিত যে, বাংলাদেশ কখনও সন্ত্রাসীদের অভারণ্যে হতে পারবে না। জিয়াউর রহমান, আর বেগম জিয়ার আশ্রয় প্রশ্রয়ে বাংলাদেশ মিয়ানমার এবং ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি হয়েছিল। তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে জামায়াত আর শিবির গড়ে উঠেছে। জামায়াত-শিবিরের কারণে আজ বাংলাদেশে সিংগভাগ সন্ত্রাস হচ্ছে। আফগানিস্তানে বাংলাদেশ থেকে বহু মাদ্রাসার ছাত্র এবং আলেম গিয়েছিল কিন্তু জামায়াত শিবিরের কোনও লোক আফগান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। কওমি মাদ্রাসার আলেমরা এবং ছাত্ররা এখন আর সেই আফগানি জজবায় নেই। টুকটাক যারা আছে তারা জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি এখন জামায়াত-শিবির এবং তাদের সৃষ্ট নানা শাখা।

এখন শেখ হাসিনার সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করেছেন। যুদ্ধাপরাধে জামায়াতের লোকই বেশি জড়িত। তাদের বহু নেতার ফাঁসি হয়েছে আরও বহু নেতার ফাঁসি হবে। জামায়াত-শিবিরের লোকেরা প্রতিশোধ গ্রহণে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হওয়া স্বাভাবিক। টার্গেট কিলিং হচ্ছে এ কারণে। শিবিরও এখন দ্বিধা বিভক্ত। এক গ্রুপ বলছে আমরা পুরানো নেতাদের দায়ভার বহন করতে যাবো কেন? যদিওবা তারা নাকি সংখ্যালঘু। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হোক লঘু হোক -এ উপলব্ধিটাকে শুভ বলা যায়। কিন্তু তাদের গঠনেই যে গদল রয়েছে তা দূর করা কঠিন বটে।

মওলানা মওদুদী সোভিয়েত রাশিয়ার বলশোভিক বিপ্লবের সময়ের লোক। তখন তার ভরা যৌবন। মওলানা মওদুদীও বিশ্বের একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এবং ইসলামী বিপ্লব করার জন্য দৃঢ়ভাবে প্রত্যয়ী। সুতরাং তাকে বলশোভিক বিপ্লব কোনও না কোনও দিকে প্রভাবিত করবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। বলশোভিকেরা শত্রু নিশ্চিহ্ন করার ব্যাপারে ছিল নির্মম। মওলানা মওদুদীর শিক্ষায় সে রকম এক বার্তা তার অনুসারীদের প্রতি রয়েছে। তাই জামায়াত-শিবির নির্মম, নিষ্ঠুর। রগ কেটে পঙ্গু করে দেওয়া, হত্যা করে লাশ ময়লার ট্যাংকিতে গুজে রাখা- এ রকম নির্মম ও জঘন্য কাজগুলো তারা দীর্ঘ সময়ব্যাপী করেছে। এ নির্মমতার কারণে তাদের রাজনীতি কখনও সাধারণ  মানুষের কাছে আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। অথচ তারা বলশোভিকদের মতো কোনও বিপ্লবও করতে পারেনি।

ইসলামিক আন্দোলনের কর্মীদের প্রতি একটা কথা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, যে ইসলামিক আন্দোলনে পাই পাই সুন্নতে রাসুলুল্লাহ (স.) এর অনুসরণ থাকবে না, সে আন্দোলন কখনও সফলভার মুখ দেখবে না। মক্কা বিজয়ের পরে একজন বিশিষ্ট সাহাবা কিছু উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন আজ প্রতিশোধ গ্রহণের দিন। তাৎক্ষণিকভাবে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছিলেন, কখনও নয়, কখনও নয়, আজ ভালবাসার দিন, আজ সম্প্রীতির দিন। ঘৃণাকে, নির্মমতাকে রাসুলুল্লাহ্ (স.) কখনও পছন্দ করেননি।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৫০ জন লোক টার্গেট কিলিং-এর স্বীকার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে তারা হয়তো হিন্দু, না হয় বৌদ্ধ, না হয় খ্রিস্টান। সম্ভবতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য কিলারদেরকে এ পথে হাঁটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভারতে বিজেপি ক্ষমতায়। হিন্দুদের সাধু সন্তদের হত্যা করা হলে হয়তো সংঘ পরিবার বিরূপ হতে পারে এমতো ধারণা নিয়েও তারা সাধু সন্ত হত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

অবশ্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন এখানে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনও অবকাশ নেই। বাংলাদেশের সরকার যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে তাতে ভারত সন্তুষ্ট। আমরা বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ খ্রিস্টান পরিষদকে অনুরোধ করবো তারা যেন এমন সংকটকালে কোনও বিতর্কিত ভূমিকা গ্রহণ না করেন, বিতর্কিত কথা বার্তা বলে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে হতে না দেন। এখন দায়িত্বশীলদের দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়ার সময়।

উত্তরায় বেশ কিছু অস্ত্র সন্ত্রাসীরা ফেলে গেছে যা উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্রগুলোর হিসাব নিকাশ দেখে মনে হচ্ছে আরও প্রচুর অস্ত্র কোথাও আছে। উত্তরা এলাকায় ঘর ঘর তল্লাশি চালানো উচিৎ ছিল এ অস্ত্রগুলোর সন্ধান পাওয়ার পর পরই। বাংলাদেশ সমতল ভূমি এখানে ব্যাপকভাবে সন্ত্রাস ছড়ানো খুবই কঠিন। বেগম জিয়া লন্ডনে স্বীকার করেছেন,‘দীর্ঘ চারমাস মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও কঠিন প্রতিরোধ করেছি’ তুবও সফল হননি। মুক্তিযুদ্ধে ছিল সাত কোটি মানুষের সম্পৃক্ততা। সে অনুযায়ী শতাংশে সমর্থন সন্ত্রাসবাদীরা তো আর পাবে না। জাতীয় জীবনে কঠিন সময় আসা বিচিত্র নয়। ঐক্যবদ্ধভাবে তা মোকাবেলা করা কঠিনও নয়। বিশ্বের কোথাও কখনও সন্ত্রাস বিজয়ী হয়নি। বাংলাদেশেও হবে না।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here