সংলাপে ইসিকে সুশীল সমাজ, সেনা মোতায়েন ও আস্থা অর্জনের পরামর্শ

0
110

ec_53814_1501530978নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া, ‘না’ ভোটের বিধান রাখা ও ভোটের আগেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের প্রস্তাব * সহায়ক সরকারের প্রস্তাব * আমন্ত্রিত ৫৯ জনের মধ্যে উপস্থিত ৩৩ * কাজী রকিব কমিশন ও দশম সংসদ নির্বাচনের সমালোচনা * বিতর্কিত আমলা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব না দেয়া * নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের পরামর্শ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং ইলেকশন কমিশনকে (ইসি) সবার আস্থা অর্জনের পরামর্শ দিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। পাশাপাশি নির্বাচনে ‘না’ ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা, দলীয় আনুগত্য ও পক্ষপাতমূলক কর্মকর্তাদের নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ না দেয়ার কথা বলেন। বক্তাদের অনেকেই নির্বাচনকালীন সরকারের ধরনসহ বিভিন্ন মত তুলে ধরেন। তাদের কেউ কেউ নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়ার প্রস্তাব করেন। আবার কেউ কেউ নির্বাচনের সময় জনপ্রশাসন, অর্থ, স্থানীয় সরকার ও তথ্যসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব দেন।
সোমবার ইসি আয়োজিত প্রথম দিনের সংলাপে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এসব কথা বলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ধারাবাহিক সংলাপের অংশ হিসেবে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত হয় এ সংলাপ। এতে সুশীল সমাজের ৫৯ জন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে প্রত্যাশামতো কথা বলতে পারবেন না এ আশঙ্কায় কয়েকজন সংলাপে অংশ নেননি। তারা চিঠি দিয়ে ইসিকে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছেন। এরপরও প্রথম দিন ৩৮ জন উপস্থিত ছিলেন। তবে ইসির রেজিস্টারে স্বাক্ষর করেছেন ৩৩ জন। ইসির সূত্রে জানা গেছে, কয়েকজন শারীরিকভাবে অসুস্থ ও বিদেশে অবস্থান করায় সংলাপে অংশ নিতে পারেননি। আমন্ত্রিত অতিথিদের বাইরে দু’জন সংলাপে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের অনুষ্ঠান থেকে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এম নুরুল হুদার সভাপতিত্বে সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এ সংলাপ চলে।

সংলাপে উঠে আসা সুপারিশের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের আঙ্গিকে যা গ্রহণযোগ্য হবে তাই নেয়া হবে। এর বাইরে কিছুই গ্রহণ করতে পারব না। সংলাপ শেষে আলোচনার সারসংক্ষেপ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন সিইসি।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জনসংখ্যা অনুপাতে জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন। এছাড়া বিদেশে অবস্থানরত এক কোটি ভোটারকে নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ করে দেয়া, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি না করা, অনিয়ম হলে প্রয়োজনে নির্বাচন বাতিল করার বিধান যুক্ত করাসহ আরও কিছু বিষয়ে তারা সুপারিশ করেন। সংলাপে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশনের নতজানু নীতি, ওই সময়ে নির্বাচনে অনিয়ম আমলে না নেয়া এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের সমালোচনাও করেন কেউ কেউ।

সংলাপ শেষে ?সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সাংবদিকদের বলেন, ইসির আস্থা অর্জন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে সংলাপের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় বার্তা দেয়া হয়েছে। ইসি যতক্ষণ স্বাধীন ও কার্যকর না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের আশা খুব কম। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলের বন্ধু নয়। দেশের মানুষকে তাদের আস্থায় আনতে হবে। ইসির স্বাধীন ভূমিকা দৃশ্যমান করতে হবে। ইসির হাতে যে আইনি ক্ষমতা রয়েছে তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সংলাপে আলোচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে তিনি বলেন- না ভোটের প্রবর্তন, নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করার সুযোগ রাখতে হবে, নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার বন্ধ এবং নির্বাচনে অর্থায়ন পরিবীক্ষণ করতে হবে। কিছু আইন সংশোধন এবং কিছু নতুন আইন করার কথা বলা হয়েছে। না ভোটের ব্যাপারে ব্যাপক ঐকমত্য হয়েছে।

সম্প্রতি সিইসির দেয়া বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হয় ওই সংলাপে। এ বিষয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কমিশন বলেছিল তফসিল ঘোষণার আগে তাদের কিছুই করার নেই- আমরা এ বক্তব্যকে গ্রহণ করিনি। নির্বাচনে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তাদের এখনই অনেক কিছু করার আছে। এ ব্যাপারে অনেক সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এসেছে। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, যে ধরনের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নির্বাচন হোক না কেন, নির্বাচনকালীন সরকার কার্যত তত্ত্বাবধায়ক ভূমিকা ব্যতিরেকে আর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে না। তারা দৈনন্দিন দায়িত্বের বাইরে কোনো কিছু করার সুযোগ পাবে না। নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ রাখার জন্য নির্বাচন কমিশনের হাতে যে ক্ষমতা রয়েছে তা প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে। যারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা মনোভাবাপন্ন সেসব আমলা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার বিষয়ে জোরালো মত দেয়া হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সংলাপে নির্বাচনকালীন সরকার বা সহায়ক সরকার নিয়ে বেশির ভাগ বক্তা আলোচনা তুলেছেন। এ বিষয়ে সংলাপ শেষে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সংলাপে আমি জোরালোভাবে বলেছি নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়াটা খুবই জরুরি। অন্যথায় ৩০০টি ক্ষমতাবলয় পুরো নির্বাচনকে প্রভাবিত করার সুযোগ পাবে। সংসদ ভেঙে দিলে লেভেল প্লেইং ফিল্ড কিছুটা হলেও নিশ্চিত হবে। আর ওই সময় মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব বজায় রাখাটা খুবই প্রয়োজন। তিনি বলেন, ইসি এককভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারবে না। ওই সময় সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি বলেছি, এটা কমিশনের বিষয় নয়, রাজনৈতিক দল আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে এটা ঠিক করে নেবে। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ হওয়া জরুরি। তিনি ইসিকে সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন। তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। নির্বাচনে অনেক অভিযোগ আসে। অতীতে দেখেছি এগুলো হয়তো আমলে নেয়া হয় না। এটাতে সক্ষমতা প্রমাণ হয় না। এ জন্য সক্ষমতা দেখানো জরুরি। অভিযোগ আমলে নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে অনেক অনিয়ম রোধ হতো। নির্বাচনকে ঘিরে ভোটার, প্রার্থী, প্রস্তাবক-সমর্থক, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা ভয়ে থাকে। ভয়মুক্ত নির্বাচন করতে সেনা মোতায়েনের বিষয়টা গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচনে সেনা মোতায়েন দৃশ্যমান করার বিষয়ে সাবেক এ উপদেষ্টা জোর দেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, যেসব আইনে দুর্বলতা আছে সেগুলো সংস্কার করা দরকার। ইসির উচিত সরকারকে বলা তারা কী করতে চায়। এ ছাড়া ইসি বলে যে তফসিল ঘোষণার আগে কিছু করার নেই। এ কথাটি ঠিক নয়। এ বিষয় নিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য তাদের কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। যারা অভিবাসী তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কমিশনকে উদ্যোগ নিতে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নির্বাচন কমিশনের কেবল আন্তরিকতাই যথেষ্ট নয়, তাদের সক্ষমতা ও সৎ সাহস থাকতে হবে। নির্বাচনে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে।

পানামা পেপারসে যাদের নাম এসেছে তারা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়