সংলাপের প্রস্তাব বিশ্লেষণে বিশ্লেষকদের অভিমত, গুরুদায়িত্ব ইসির মাথায়

0
10

ঢাকা: আগামীতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক ও সবার জন্য গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য এখতিয়ারভুক্ত যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তার সবই নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নিতে হবে। এ জন্য সরকারের কাছ থেকে যেসব সহযোগিতা নেয়া প্রয়োজন তা সময়মতো চাইতে হবে।

সরকার বা নির্বাচনকালীন সরকার সহযোগিতা করতে গড়িমসি করলে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে জনআস্থা অর্জনের পরীক্ষায় ইসিকে উত্তীর্ণ হতে হবে। এটিই বড় চ্যালেঞ্জ।

সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্প্রতি শেষ হওয়া সংলাপ এবং এ সংলাপ থেকে বেরিয়ে আসা প্রস্তাবগুলো ইসির পথচলার জন্য বড় পাথেয় হবে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির সংলাপকে এভাবেই মূল্যায়ন করেছেন কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি।

তারা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার ক্ষেত্রে যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সংলাপে উঠে এসেছে এবং যেসব প্রস্তাবের পক্ষে রাজনৈতিক দলের পাল্লা ভারি তা অনুসরণ করা ইসির জন্য এক প্রকার দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব বিষয় ইসির এখতিয়ারের মধ্যে রয়েছে যেমন- নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব করেছে বেশিরভাগ দল।

সংলাপে অংশ নেয়া ৪০টি দলের মধ্যে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল সক্রিয়ভাবে সেনা নামানোর প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে কোনো কোনো দল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে আবার কেউ কেউ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা নামানোর কথা বলেছে।

অপরদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরাসরি সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে অবস্থান না নিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনে দ্বিমত করেছে।

আরও ৫টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করার বিপক্ষে মত দিয়েছে। এর বাইরে ৫টি দল এ বিষয়টি ইসির সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। তবে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল সেনা মোতায়েনের পক্ষে থাকায় ইসিকে তার এখতিয়ারের মধ্যে থেকে সব কূল রক্ষা করে এগোতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটি ভবিষ্যতে দেখার বিষয়।

এ ছাড়া নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির স্বার্থে সংসদ ভেঙে ভোট গ্রহণের দাবি করেছে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ ১৮টি দল। অপরদিকে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছে ৯টি দল।

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শুরু থেকে বলে আসছে সবই হবে সংবিধান অনুযায়ী। তারা এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাব দেয়নি।

সংলাপে ইলেকট্রুনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) বা ডিজিটাল ভোটিং মেশিনের (ডিভিএম) মাধ্যমে ভোট গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে আওয়ামী লীগসহ ১২টি রাজনৈতিক দল। ইভিএমে ভোট গ্রহণের বিপক্ষে প্রস্তাব করেছে বিএনপিসহ ১০টি দল।

সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার থাকার প্রস্তাব করেছে জাতীয় পার্টিসহ ১২টি রাজনৈতিক দল। ওই সরকারে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপির প্রতিনিধিত্ব রাখার পক্ষেও মত দিয়েছে কয়েকটি দল।

অপরদিকে বিএনপিসহ ১১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, ইভিএম প্রবর্তনের বিষয়টি ইসির ওপর নির্ভরশীল। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধান দলগুলোর আস্থা অর্জনই ইসির জন্য কঠিন পরীক্ষা। অন্যান্য প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ বের করতে প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসি ফের সংলাপে বসতে পারে বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন করাই ইসির গ্রহণযোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনের একমাত্র মানদণ্ড। সংলাপের পর এবার বল ইসির কোর্টে। এমন পরিস্থিতিতে ইসির বলার অবকাশ নেই, এ প্রস্তাব আইনে নেই, ওই প্রস্তাব আমাদের এখতিয়ারে নেই, আমাদের করার কিছুই নেই। যেসব প্রস্তাব ইসির এখতিয়ারে রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে ইসিকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সংসদ ভাঙা বা নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থাসহ যেসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন ইসির এখতিয়ারে নেই, সেগুলো বাস্তবায়ন যদি ইসি অপরিহার্য মনে করে তাহলে সরকারের কাছে পাঠাবে। সরকার যদি ওই প্রস্তাব গ্রহণ না করে এবং সেই পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব না হয় তাহলে ওই নির্বাচন করবে কিনা সে বিষয়ে ইসিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, উচ্চ আদালতের এক রায়ে ইসিকে ইনহ্যারেন্ট (অগাধ) ক্ষমতা দেয়া আছে। ইসি সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া প্রস্তাব সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, সংলাপে যেসব প্রস্তাব আসছে, সেগুলোর মধ্যে যেসব ইসির এখতিয়ার তা আমরা বিবেচনা করব। আর যেগুলো আমাদের এখতিয়ারে নেই তা পুস্তক আকারে প্রকাশ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে আগামী ২৪ অক্টোবর নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপের পর প্রস্তাবগুলো নিয়ে কমিশনাররা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করবেন। এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

এদিকে আইনে ইসির অনেক ক্ষমতা থাকার পরও অনেক ক্ষেত্রে সরকার ইসিকে সহযোগিতা করেনি বলে জানান সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা।

তিনি বলেন, সংলাপে অনেক প্রস্তাব এসেছে। সব ইসির এখতিয়ারাধীন নয়। অনেক কিছু সরকারের ওপর নির্ভরশীল। আরপিওতে বলা আছে, ইসি যা চাইবে তা সরকার দিতে বাধ্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- অতীতে দেখেছি বিভিন্ন সময় ইসি চাওয়ার পরও সরকার সহযোগিতা করেনি। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের জন্য বলা হলেও পাওয়া যায়নি। পরে অতিরিক্ত র‌্যাব মোতায়েন করা হয়। তবে আমার দায়িত্ব পালনকালে বিশ্বাস ছিল, সরকার সব সহযোগিতা করবে।

এখনকার সরকার ইসিকে কতটুকু সহযোগিতা করবে জানি না। তবে যে কোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে বিএনপিসহ সব দলের অংশ নেয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী, ভোটারসহ সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন আয়োজনে ইসিকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, দুই কারণে নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করার প্রয়োজন হয়। প্রথমত, সেনাবাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা বেশি। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই দিনে সারা দেশে কমবেশি ৪০ হাজার কেন্দ্র ও দুই লাখ ভোটকক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এত সংখ্যক কেন্দ্র ও ভোটকক্ষের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপ্রতুলতার কারণে সেনা মোতায়েন করতে হয়। আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন কোন প্রক্রিয়ায় কীভাবে হবে সে বিষয়টি নির্ধারণ করার এখতিয়ার ইসির রয়েছে। নির্বাচন কমিশন চাইলে আরপিওতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় ‘সশস্ত্র বাহিনী’ শব্দ যুক্ত করে তা পাস করার জন্য সরকারের কাছে পাঠাতে পারে। সরকারকে বলতে পারে, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা ইসির দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে সরকারের সহযোগিতা চাইতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) অনুযায়ী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করার ক্ষেত্রে কিছু পূর্বশর্ত সামনে চলে আসবে। তখন হঠাৎ করেই সেনা নামানো যাবে না। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে সেনা নামাতে হবে। এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ ছাড়া ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার অনুযায়ী সেনা নামানো হলে তা ইসির নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। সেটি থাকবে ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণে। তবে আরপিওতে সশস্ত্র বাহিনী যুক্ত করা হলে এসব সমস্যা থাকবে না।

নির্বাচনের সময় সংসদ ভাঙার প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল সংসদ ভেঙে ভোট গ্রহণের দাবি জানালেও এটি ইসির এখতিয়ারে নেই। তবে কমিশন সব দলের প্রস্তাব একত্রিত করে এবং প্রয়োজনে এর সঙ্গে ইসির মতামত যুক্ত করে সরকারের কাছে পাঠাতে পারে। নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকারের সহযোগিতা চাইতে পারে।

প্রসঙ্গত সংলাপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের পক্ষে মত দিয়েছে। দলটি বলেছে, কোন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা যাবে, তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯-১৩১ ধারায় বলা আছে। ১২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বেআইনি সমাবেশ অন্য কোনো উপায়ে ছত্রভঙ্গ করা না গেলে এবং জননিরাপত্তার জন্য তা ছত্রভঙ্গ করা প্রয়োজন বলে বিবেচিত হলে সর্বোচ্চ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সামরিক শক্তি দিয়ে তা ছত্রভঙ্গ করতে পারবেন।

সংলাপে উঠে আসা প্রস্তাবগুলো ইসির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলেরও দায় রয়েছে বলে মনে করেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন। তিনি বলেন, সংলাপে নির্বাচনকালীন সরকার, সংসদ ভেঙে দেয়াসহ বেশকিছু প্রস্তাব এসেছে, যেগুলো জাতীয় বিষয়, রাজনৈতিক ইস্যু। নির্বাচনের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে এর সমাধান করতে হবে। তবে নির্বাচন কমিশন সংলাপের প্রস্তাবগুলো বিবেচনার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করতে পারে।

তিনি বলেন, আরপিওতে না থাকলেও সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইসি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করতে পারে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here