ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়, সুপ্রিমকোর্ট সম্পর্কে সংসদে বিরূপ মন্তব্য করা ঠিক নয়

0
78

আদালত ও সংসদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত * তিন বিভাগের সমঝোতা থাকলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে না * সুশাসনের জন্য ক্ষমতা পৃথকীকরণ একটি আদর্শ ধারণা

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন, আদালত কিংবা বিচারকদের উচিত নয় সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করা। আদালত ও সংসদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ঐক্য থাকা উচিত। একইভাবে সুপ্রিমকোর্টের কোনো মতামত সম্পর্কে সংসদের কোনো মন্তব্য করা ঠিক নয়। সংবিধানের ৭৮(২) অনুচ্ছেদ এবং সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৭০ ও ২৭১ ধারা অনুসারে এটা তারা করতে পারেন না। তিনি লিখেছেন, এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার চূড়ান্ত পৃথকীকরণ সম্ভব নয়। এ কারণে সংসদ ও বিচার বিভাগের উচিত মিলেমিশে কাজ করা।

১ আগস্ট মঙ্গলবার প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে তিনি লিখেছেন- আইনের শাসনের অপরিহার্য দিক হচ্ছে, স্বাধীন বিচার বিভাগের আওতায় কোনো বিচারপতি সরকারের কোনো বিভাগের থাবার নিচে থাকতে পারেন না। তাকে নিরপেক্ষ থাকার বর্মে সজ্জিত থাকতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং কেউ যাতে তা ‘অপহরণ’ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করাও সুপ্রিমকোর্টের দায়িত্ব। দেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধানই সুপ্রিমকোর্টের কাঁধে এ দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

কয়েকটি দেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি লিখেছেন, যেখানে সংসদের হাতে অভিশংসন ক্ষমতা দেয়া হয় সেখানে এটা নিশ্চিত করা হয় যে, সেই কমিটির ওপর সবার আস্থা রয়েছে, তারা নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত হয় না। তবে গত ৪২ বছরে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেভাবে সংসদ চলছে তাতে এরকম নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অসম্ভব। সংসদের হাতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা দেয়ার প্রসঙ্গে রায়ে তিনি বলেন, নতুন এ ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের বিরাগভাজন হয়ে কোনো বিচারপতি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তাকে সংসদ অভিশংসন করবে।

রায়ে তিনি লিখেছেন, সংবিধানের ৭, ২২, ৯৪(৪), ১০২ এবং ১১২ অনুচ্ছেদ একত্রে পড়লেই বোঝা যায়, সুপ্রিমকোর্ট স্বাধীন, পৃথক এবং সংবিধানের অভিভাবক এবং রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ। এটা নেহাতই একটি আদালত নয়। ষোড়শ সংশোধনীতে সংসদকে বিচারপতিদের অভিশংসনের যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল তা বহাল থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে।

বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রায়ে লিখেছেন, বাংলাদেশের সংবিধান আইনি সার্বভৌম ক্ষমতা তিনটি বিভাগের ওপর ন্যস্ত করেছে। আইন বিভাগ তথা সংসদ আইন প্রণয়ন করবে, নির্বাহী বিভাগ আইন বাস্তবায়ন করবে এবং সংবিধানের বেঁধে দেয়া সীমানার মধ্যে থেকে বিচার বিভাগ আইনের ব্যাখ্যা দেবে। তবে সংবিধানের কোথাও ক্ষমতার পরিপূর্ণ পৃথকীকরণ সম্পর্কে বলা হয়নি। এগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমের ঘটনা ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে তিনটি বিভাগের মধ্যে সমঝোতা সূত্র অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তাহলে অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে না।

তিনি লিখেছেন, ভারতের সংবিধানে ক্ষমতার পৃথকীকরণ সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। সরকারের অন্য দুটি বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ যথেষ্টই স্বাধীন। সংবিধানের ব্যাখ্যার অধিকারও বিচার বিভাগের। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে, যাকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা। সংবিধানের সুরক্ষা, সংরক্ষণ এবং এর পক্ষাবলম্বনের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য ভারতে তিনটি বিভাগের মধ্যেই চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস রয়েছে। এতে কেউ সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করতে পারে না।

তিনি লিখেছেন, তিনটি বিভাগেরই একে অন্যের ক্ষমতার লাগাম টানার সক্ষমতা থাকতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের জন্য নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে পার্থক্য থাকতে হবে। আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা সংসদের, নির্বাহী ক্ষমতা মন্ত্রিসভার হাতে আর বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব থাকবে সুপ্রিমকোর্টের হাতে।

বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী লিখেছেন, ক্ষমতার পৃথকীকরণ মানে বিচারিক জগতে বিচার বিভাগ স্বাধীন ও ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিচারিক কাজের সর্বময় ক্ষমতা বিচার বিভাগের। নির্বাহী ও আইন বিভাগ বিচার বিভাগের কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

এটা সত্য যে, কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই ক্ষমতার চূড়ান্ত পৃথকীকরণ অথবা এর একদম অনুপস্থিতি থাকতে পারে না। সরকারের ক্ষমতা এবং দায়িত্ব যথেষ্ট জটিল এবং কেন্দ্রীভূত। ফলে সরকারের বিভাগগুলোর মধ্যে সহজাত প্রতিযোগিতা ও সংঘাত রয়েছে। সংসদ ও বিচার বিভাগের উচিত তাদের মধ্যে যাতে কোনো সংঘাত না বাধে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা। রায়ে তিনি মত দিয়েছেন, বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে সুশাসনের জন্য ক্ষমতার পৃথকীকরণের ধারণা একটি আদর্শ। রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ তিনটি পৃথক কাজ করে এবং এর মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। তবে আমাদের সংবিধানে ক্ষমতার পৃথকীকরণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

তিনি লিখেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার কাজকে কয়েকটি বিভাগে ভাগ করে দেয়া হয়। এতে প্রত্যেকেরই পৃথক দায়িত্ব ও স্বাধীনতা থাকে, যাতে একটি বিভাগের ক্ষমতার সঙ্গে আরেকটি বিভাগের সংঘাত না হয়। সাধারণত তিনটি বিভাগ থাকে- আইন, নির্বাহী ও বিচার। ক্ষমতার পৃথকীকরণ এ কারণে করা হয় যাতে একটি বিভাগ আরেকটি বিভাগের মূল কাজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। এর উদ্দেশ্য ক্ষমতা যাতে কেন্দ্রীভূত না হয়, ভারসাম্য থাকে এবং কোনো একটি বিভাগ যাতে সর্বময় হতে না পারে। যে সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার পৃথকীকরণ থাকে সেখানে প্রত্যেকটি বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য দরকার। চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস বা ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে এটা নিশ্চিত করা হয়। এ ব্যবস্থায় নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় একটি বিভাগ আরেকটি বিভাগের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

রায়ে তিনি লিখেছেন, নিউজিল্যান্ডের সংবিধান সাংবিধানিক সুরক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতার পৃথকীকরণ করেছে। নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত প্রায়ই আইন বিভাগের ওপর নির্ভরশীল। আইন বিভাগের (সংসদের) সদস্যরা নির্বাচিত হন আনুপাতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে। ফলে একক কোনো দল সাধারণত সরকার গঠন করতে পারে না, জোট সরকার হয়। বিচার বিভাগ সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত। আইনের কোনো ব্যাখ্যা যদি সরকারের মনঃপূত না হয় তবে সেটা পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেয় নির্বাহী বিভাগ। তবে নির্বাহী বিভাগ সরাসরি কোনো বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে সেটা পর্যালোচনা কিংবা পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে বা অনুরোধ করতে পারেন না। আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে বিচার বিভাগ বা তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়ার এখতিয়ার নির্বাহী বিভাগের নেই। নির্বাহী বিভাগকেও নির্দেশ দিতে পারে না বিচার বিভাগ।

তিনি লিখেছেন, হজরত ওমর (রা.) রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করার মত দিয়েছিলেন। তিনি হজরত আবু দারদাকে (রা.) মদিনার, হজরত আবু মুসা আল আশরিকে কুফার এবং হজরত সুরেকে বসরার বিচারক নিয়োগ দিয়েছিলেন। তারা যেন পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে স্বাধীনভাবে বিচার করেন সেই ফরমান জারি করেন হজরত ওমর (রা.)। ফরমানে বলা হয়, বিচারের ক্ষেত্রে আইনের চোখে সবাই সমান।

বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন লিখেছেন, আশা করা হয় যে তিনটি বিভাগের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দিলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবহার রোধ করা সম্ভব। তবে ক্ষমতার একেবারে নি-িদ্র বিভাজন সম্ভব নয়, কাক্সিক্ষতও নয়। যুক্তরাষ্ট্রেও কঠোরভাবে ক্ষমতার পৃথকীকরণ অনুসরণ করা হয় না। ভারসাম্যমূলক ক্ষমতায় একজন ব্যক্তি কিংবা সংস্থাকে বেশি ক্ষমতা দেয়া হলেও সেখানে অন্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। তিনি লিখেছেন, আমাদের সংবিধানে নির্বাহী ও আইন বিভাগের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করা আছে। তবে বিচার বিভাগের ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে বলা নেই। কিন্তু আমাদের সংবিধান তৈরির আগেই বিচারিক ক্ষমতা বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here