শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন

0
128

may_46131_1493614566নিউজ ডেস্ক: আজ মহান মে দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দিবসটি পালিত হচ্ছে। আজ সরকারি ছুটির দিন। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। এতে কয়েকজন শ্রমিককে জীবন দিতে হয়। এরপর থেকে দিনটি ‘মে দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। এছাড়া বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন।

এদিকে সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষ প্রথমে বিচ্ছিন্নভাবে এবং পরে সংঘবদ্ধ সংগ্রাম করে এসেছে। সংগ্রামের মাধ্যমে এক সময় পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও শ্রমিকদের কাজের কোনো ধরাবাঁধা কর্মঘণ্টা ছিল না। উনিশ শতকের গোড়ায় কল-কারখানায় সপ্তাহের ৬ দিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো শ্রমিকদের। বিনিময়ে মিলত সামান্য কিছু মজুরি। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ছিল না। এর বিরুদ্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লড়াই শুরু হলেও তা বিরাট আকার ধারণ করে আমেরিকায়।

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন লাখ শ্রমিক রাজপথে নেমে মিছিলে শামিল হন। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট ডাকা হয়। ১৮৮৬ সালের ৪ মে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ ফেলে শিকাগো শহরের কেন্দ্রস্থল হে মার্কেটে সমবেত হন। লাগাতার ধর্মঘট, শ্রমিক জমায়েত, মিছিল দেখে আতঙ্কিত শাসক শ্রেণী শ্রমিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে ১১ শ্রমিক নিহত হন, আহত হন অনেকে। পরে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ৬ শ্রমিক নেতাকে ফাঁসি দেয়া হয়।

১৮৯০ সাল থেকে মে দিবসকে শ্রমিক শ্রেণীর ‘আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ‘মে দিবস’ দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণীকে কেবল তাদের অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়ার মধ্যেই নয়, শোষণ-পীড়ন থেকে মুক্তির অভিন্ন লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উন্নততর চেতনায় সমৃদ্ধ করে। আর আজ রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র আন্তর্জাতিক মে দিবস পালিত হচ্ছে। শহর, বন্দর, শিল্পাঞ্চল, ছোট-বড় কারখানার গেটে, শ্রমিক সংগঠনগুলোর দফতরে লাল পতাকা উত্তোলন করা হবে, শ্রদ্ধা জানানো হবে সেসব শহীদদের।

এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, ‘মহান মে দিবসের সঙ্গে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার, স্বার্থ ও কল্যাণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাই এগিয়ে আসবেন, মহান মে দিবসে এ প্রত্যাশা করি।’

বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান ‘মে দিবস’ পালনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আবদুল হামিদ বলেন, ‘দিবসটি উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেছেন, জাতির পিতার আদর্শ অনুসরণ করে তার সরকার দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এসব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সুফল শ্রমজীবী সমাজ পেতে শুরু করেছে। আমরা শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে লাগসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।’

প্রধানমন্ত্রী আশা করেন, মহান মে দিবসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শ্রমিক এবং মালিক পরস্পর সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে কলকারখানার উৎপাদন বৃদ্ধিতে আরও নিবেদিত হবেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে সক্ষম হবে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাণীতে বলেছেন, এ মহান দিনে তার প্রত্যাশা- শ্রমিকের যেন সবল দুটি হাত, সতর্ক দুটি চোখ সংযত দুটি ঠোঁট, সুন্দর একটি মন থাকে। এছাড়া তাদের অন্ন, বস্ত্র বাসস্থান ও চিকিৎসা নিশ্চয়তা খাকতে হবে। স্মৃতির ফলকে খচিত, তাপিত রক্তের আখরে রচিত সারা বিশ্বের সব শ্রমিকের হৃদয়ের নিভৃতে লালিত মে দিবসের আদর্শ ও উদ্দেশ্য যেন বাস্তবায়িত হয়- এ আমার কামনা। মে দিবসের সত্তায় নতুন করে জন্ম নেবে আগামী দিনের মানুষের শক্তি ও স্বাধীনতা।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার বাণীতে দেশ-বিদেশে কর্মরত সব বাংলাদেশী শ্রমিক-কর্মচারী এবং বিশ্বের শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মহান মে দিবস ঐতিহাসিক ভাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। শ্রমজীবী মানুষের রক্তঝরা ঘামেই বিশ্ব সভ্যতার বিকাশ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। শ্রমিকের ঐতিহাসিক অবদানের ফলেই বিশ্ব অর্থনীতি চাঙা হয়েছে।

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ এক বিবৃতিতে মহান মে দিবস উপলক্ষে বলেন, অবিলম্বে বন্ধ কারখানা চালু করতে হবে। গার্মেন্টসহ সব ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সময় ৮ ঘণ্টা, ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার টাকা এবং সব সেক্টরে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী শ্রম আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করতে হবে।

বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা তাদের এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ আজ এক ক্রান্তিকাল সময় পার করছেন। শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, নিরাপদ কর্মস্থলের নিশ্চয়তা, কর্ম পরিবেশের উন্নয়নের দাবি, স্থায়ী কর্মী নিয়গের পরিবর্তে আউটসোর্সিং ব্যবস্থা চালু এখনকার সময়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

মে দিবসের কর্মসূচি : মে দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, শ্রমিক সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করবে। এরমধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক জোটের উদ্যোগে সকাল ১০টায় র‌্যালি বের করবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে। জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের জাসদ কার্যালয়ের সামনে সকাল ১০টায় শ্রমিক সমাবেশ করবে। বিকল্প ধারা বাংলাদেশ বেলা ২টায় কুড়িল বিশ্বরোডে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা, বাংলাদেশ বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার্স ফেডারেশন সকাল সাড়ে ১০টায় তোপখানা রোডে সমাবেশ ও মিছিল করবে। জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে সকাল সাড়ে ১০টায় শ্রমিক সমাবেশ, বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন সকাল ১০টায় তোপখানা রোডের কেন্দ্রীয় কার্যালয় র‌্যালি বের করবে। বাংলাদেশ ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট মার্কেটিং শ্রমিক ইউনিয়ন সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করবে।

এছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন, গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের উদ্যোগে বিকাল সাড়ে ৩টায় সাভার-হেমায়েতপুর-শ্যামপুর সড়কে শ্রমিক গণসমাবেশ, বাজাফে-৩৮ সকাল সাড়ে নয়টায় নুর হোসেন চত্বরে র‌্যালি, নতুন ধারা বাংলাদেশ এনডিপি সকাল নয়টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে র‌্যালি করবে। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের উদ্যোগে সকাল আটটায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করবে। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা, জাতীয় গণতান্ত্রিক ঘনমঞ্চ, জাতীয় গণফ্রন্ট সকাল সাড়ে নয়টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সমাবেশ করবে।

গণতন্ত্রী পার্টি সকাল সাড়ে ৯টায় মুক্তাঙ্গনে র‌্যালি-পথসভা, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন বেলা ১১টায় ইউনিয়ন কার্যালয়ে আলোচনা সভা, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সকাল ৯টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি সকাল ১০টায় মুক্তি ভবনের সামনে সমাবেশ, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক মুক্তি আন্দোলন বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে র‌্যালি ও সমাবেশের আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন সকাল ৯টায় নুর হোসেন স্কোয়ারে, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ সকাল ১০টায় বলাকা চত্বরে, বাংলাদেশ সংযুক্ত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সকাল ১০টায় নিজস্ব কার্যালয় র‌্যালি করবে এবং বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ বিকাল ৪টায় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

</