শোকাবহ এই আগস্টে

0
26

ঢাকা: সেদিন সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠেই আমি রেডিওর নব ঘুরাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা কর্কশ কণ্ঠস্বর কানে এলো। সেই কর্কশ কণ্ঠের লোকটির নামও শুনলাম। মেজর ডালিম।

সেই ডালিম বারবার জানিয়ে দিচ্ছে রক্তহিম করা সেই খবর- ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে’।

সকাল ৮টার মধ্যেই জানা গেল, সামরিক বাহিনী দেশের সর্বময় ক্ষমতা দখল করেছে, কিন্তু নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিটি সামরিক বাহিনীর কেউ নয়।

তার নাম খোন্দকার মোশতাক আহমদ। আগের দিন পর্যন্ত তাকে আমরা জানতাম বাংলাদেশ সরকারের ‘বাণিজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী’ বলে, আজ সবাই শুনি সেই ‘খোন্দকার’ই বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট।

এরকম খবর শুনে সেদিন আকস্মিকতার ধাক্কায় সারা দেশের মানুষ একেবারে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার খবরটি প্রায় কেউই বিশ্বাস করতে পারছিল না। অনেকেরই ধারণা হয়েছিল যে, কোনো একটি বিদ্রোহীগোষ্ঠী বাংলাদেশের বেতার কেন্দ্রটি দখল করে নিয়েছে মাত্র, বেতার থেকে যা বলা হয়েছে, তা একেবারেই অবিশ্বাস্য।

যারা এরকম ভাবছিল না তারাও বলছিল যে, একটা ক্যু হয়ে গেছে বটে, কিন্তু বিষয়টি একেবারে আনচ্যালেঞ্জড থাকবে না। বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা কি বসে থাকবে? রক্ষী বাহিনী আছে না?

কেউ কেউ এরকমও বলাবলি করছিল যে, বেদখল হয়ে যাওয়া রেডিও স্টেশনটি শিগগিরই রক্ষী বাহিনীর হাতে এসে যাবে, তখনই সব বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে।

সন্ধ্যার আগেই সব ‘পরিষ্কার’ হয়ে গেল। কারও মনেই বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকল না। সকাল বেলায় যারা এক ধরনের আকস্মিকতার ধাক্কা খেয়েছিলেন, সন্ধ্যায় খেলেন অন্য ধরনের ধাক্কা।

সকালে যারা আশা করেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধুর সব অনুসারী ও রক্ষী বাহিনীর উদ্যোগে দেশজুড়ে প্রচণ্ড প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সৃষ্টি হবে, সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার চারজন বাদে সব সদস্যেরই মোশতাকের মন্ত্রীরূপে শপথ গ্রহণের রেকর্ডকৃত অনুষ্ঠান শুনে তারা পুরোপুরি আশাহত হলেন। শুধু আশাহত নয়, ক্ষুব্ধও।

সেদিনই আমরা বুঝে ফেলেছিলাম যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নাটকের এই নতুন অঙ্কে পরাভূত পাকিস্তানের ভূতই আবার মঞ্চ দখল করে রাখবে। পনেরোই আগস্টের রাতেই বিবিসি থেকে শোনা গেল, বাংলাদেশকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ বলে ঘোষণা করা হতে পারে।

সে রাতেই নতুন বাংলাদেশ সরকারকে পাকিস্তান স্বীকৃতি জানায় এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশের এই সরকারকে স্বীকৃতিদানের জন্য ‘ইসলামিক কনফারেন্স’ ও তৃতীয় বিশ্বের চল্লিশটি দেশের সরকারকে অনুরোধ জানান।

যে সৌদি আরব স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সাড়ে তিন বছরেও স্বীকৃতি জানায়নি, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরদিনই সেই সৌদি আরবের সানন্দ স্বীকৃতি এসে যায়। এ সময় থেকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই বাংলাদেশের খোলসের ভেতর পাকিস্তানের শাঁস পুরে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, ঘটতে থাকে বাংলাদেশের পাকিস্তানায়ন।

সেই পাকিস্তানায়ন থেকে মুক্ত হওয়ার সক্রিয় উদ্যোগ কি আমরা গ্রহণ করেছি? তেমন উদ্যোগ না নিয়ে কি আমরা বঙ্গবন্ধুর মহান উত্তরাধিকারের ধারক হতে পারব? আমরা কি প্রতিনিয়ত আত্মপ্রতারণা করেই চলছি না?

শোকাবহ এই আগস্টে এসব প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের হতেই হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here