শেখ কামাল হোক প্রজন্মের প্রেরণার শিক্ষক

0
199

মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবিদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনের প্রতিটি পরতে এবং বাংলাদেশ প্রাপ্তিতে তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের যে অসামান্য অবদান এবং ত্যাগ রয়েছে, তা আমরা ভুলে যাচ্ছি একটু একটু করে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই মাপের নেতা এবং জাদুকর, যার দেখানো পথে লাখো লাখো বাঙালী যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল।শুধু তাই নয় জাতির পিতার বড় দুই ছেলে, শেখ কামাল ও শেখ জামালও সেই যুদ্ধের অগ্রসেনানী ছিলেন। তাদের বিরত্বের কথা এবং তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা খুব কমই আলোচনা দেখতে পাই। ইতিহাস বিকৃতিকারীরা সুকৌশলে যুব সমাজের যারা আইকন হতে পারতেন, তাদের কথা আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে যুগের পর যুগ ধরে, নানা অপকৌশল খাটিয়ে।আমাদের তরুণরা বিদেশি তরুণদের বীরত্বের কথা জানে কিন্তু নিজের দেশের রত্নদের বীরত্বের কথা জানা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধুর পরিবার নিয়ে মিথ্যাচারের যে বেসাতি প্রচলিত আছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি যে, তাঁর পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, এবং তারা ভারতে পালিয়ে ছিলেন ইত্যাদি।

আজ ৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের জন্মদিন। এই দিনটিকে অগ্রগণ্য করে জেনে নেওয়া যাক বাংলার ঝরে যাওয়া এক অসামান্য নক্ষত্র শেখ কামালের কিছু জীবনগাঁথা। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ সহ সার্বিক ক্ষেত্রে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখে গিয়েছেন, তার কিছু ঐতিহাসিক সংক্ষিপ্ত ধারাবর্ণনা।

শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বড় বোন শেখ হাসিনার পরেই বাবা মার কোল আলোকিত করে এসেছিলেন তিনি এই ধরার বুকে! পড়াশোনায় দারুন মনোযোগী ও মেধাবী শেখ কামাল শাহীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছিলেন। এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ণরত অবস্থায়ই মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আত্মগোপণ করতে সক্ষম হলেও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বাকি সদস্যরা গ্রেফতার হয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে।

পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন গণপরিষদ নেতা ইলিয়াস চৌধুরী এবং তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা শহিদুল ইসলামের সাথে মে মাসের প্রথম দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি থানা হয়ে মুকসুদপুর দিয়ে যশোর সীমান্ত পার হয়ে ভারতে গমন করেন। ভারতের বেলুনিয়া থেকে সেনাবাহিনীর প্রথম যে ব্যাচটি কমিশন্ড লাভ করেছিল, তার একজন সফল অগ্রসেনানী হিসেবে শেখ কামাল কৃতকার্য হয়েছিলেন। সেই অর্থে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রথম ব্যাচের পাসকৃত ক্যাডেটদের মধ্যে অন্যতম একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেনাসদস্য ছাড়াও তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধানসেনা অধিনায়ক এজিএম ওসমানীর এডিসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেছিলেন এবং পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নে ফিরে এসেছিলেন এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে  সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

বহুমুখী প্রতিভার সমন্বয় ঘটা একজন ব্যক্তিত্ব বলতে যা বুঝানো হয়, শেখ কামাল ছিলেন সেধরনের একজন মানুষ, যিনি তার উজ্জল ও প্রদীপ্ত মেধার আলোয় উদ্ভাসিত ছিলেন। যুদ্ধফেরত একজন শেখ কামাল যে শুধু পড়াশুনায় তুখড় ছিলেন তা নয়; একই সাথে তিনি অসাধারণ সেতার বাজিয়ে ছিলেন। ছায়ানট বিদ্যায়তনে সেতারের তামিল নিয়েছিলেন সফলতার সাথে। সবকিছু ছাড়িয়ে তিনি সর্বোচ্চ মনযোগী ছিলেন খেলাধুলায়। তার সমসাময়িককালে তার মতো এত বড় এবং উচ্চতার ক্রিয়াসংগঠক বাংলাদেশের ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি জন্ম নেয়নি। ঐতিহ্যবাহী আবাহনী ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বাংলাদেশের ফুটবলের যে মানোন্নয়ন তিনি করে গিয়েছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ায় সম্মানজনক জায়গা দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে। সেই অর্থে স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবল এবং আবহানী ক্লাবকে আলাদা করে ভাবার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই। ক্রীড়ামোদী শেখ কামাল আজো বেঁচে আছেন আবাহনী ক্রীড়া চক্রের প্রতিটা ধুলিকণার সাথে এবং সেই সাথে বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রীড়াপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে। শুধুমাত্র ফুটবলেই তার কর্মযজ্ঞ সীমাবদ্ধ ছিল না। একাধারে ক্রিকেট, হকি, ভলিবল সহ প্রায় সব খেলায়ই তার দারুন ঝোঁক আর আগ্রহ ছিল।

স্কুলজীবন থেকেই নিয়মিত ক্রিকেট খেলায় অংশ নিয়ে যথেষ্ঠ সুনাম কুড়িয়েছিলেন তিনি। প্রথম বিভাগে জাতীয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টে খেলেছেন আজাদ বয়েজ ক্লাবের পক্ষ হয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি তিনি নিয়মিত খেলাধুলায় আত্মনিয়োগ করেছেন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বাস্কেটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে যে অসামান্য নৈপুণ্য তিনি দেখিয়েছিলেন,  সেই তথ্য হয়তো সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অনেক ছাত্রই আজ জানে না।

খেলাধুলার পাশাপাশি তিনি সংস্কৃতি চর্চায়ও ছিলেন পুরোধা। তার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’ ছিল তখনকার সময়ে বাঙালি সমাজের অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও সুস্থ্য সংস্কৃতিচর্চার সুতিকাগার। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে স্পন্দন তিনি রেখে গিয়েছিলেন, তা হতে পারত আধুনিক তরুণ সমাজের প্রেরণার উৎস। মঞ্চ নাটকেও তিনি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন। ‘নাট্যচক্র’ নামে নাট্যগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ছিলেন তিনি। নাট্যচক্রের হয়ে দেশে-বিদেশে মঞ্চ নাটকে তিনি নিজের উদ্ভাসিত প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে গিয়েছিলেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হয়েও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপণ করেছেন। একজন তুখোড় ছাত্রনেতা ও ক্ষমতাধর রাজনীতির খুব কাছের মানুষ হয়েও তিনি কোনোদিন প্রধানমন্ত্রী বাবার প্রভাব খাটাননি। রাজনৈতিক শিষ্টাচার চর্চায় তিনি থেকেছেন আরো দশটা সাধারণ কর্মীর মতোই।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় তখন, ছাত্রলীগ তার অন্যতম গৌরবময় সময় অতিবাহিত করছে যা ছিল সবচেয়ে দাপুটে সংগঠন তখন বাংলাদেশের। তৎকালীন সময়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা চাইতেন শেখ কামাল ছাত্রলীগের সর্বাগ্রে থাকুক এবং নেতৃত্ব দিক। কিন্তু তাতে রাজী হননি তিনি। তিনি পছন্দ করতেন নিজে পেছনে থেকে সবাইকে সামনে এগিয়ে দিতে। তার উৎসাহ ও পরামর্শে তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের যে উৎসাহ ছিল, তা স্মরণকালের স্বর্ণাক্ষরেই লেখা থাকবে। কর্মীদের মনোবল বাড়াতে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে শুধু নামমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটির পদে থেকেছেন; তবে দলের শীর্ষপদ নিতে সব সময়ই নারাজি ছিলেন। তিনি জাতীয় ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত থেকে তার রাজনীতির সঙ্গবদ্ধতা চালিয়ে গিয়েছিলেন।

শেখ কামাল ছিলেন একজন আড্ডাপ্রিয় মানুষ। ক্যাম্পাসের সব আড্ডার মধ্যমণি হিসেবে তিনি ছিলেন সবার প্রিয় একজন মানুষ।

খ্যাতিমান তারকা ডলি জহুর তার এক স্মৃতিচারণে শেখ কামালের তার নাট্যচক্রের নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করেন এবং তার মতো বিনয়ী এবং বহুমুখী প্রতিভার একজন মানুষকে নিয়ে যে নানান রকম মিথ্যাচার করা হয়েছে সেই বিষয়ে আক্ষেপ করেন!

বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের আজ ৬৮ তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। ২৬ বছর বয়সেই তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গন যেভাবে সংগঠিত করেছিলেন সেটা শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয় পৃথিবীতেই খুব বিরল। তবে পরিতাপের বিষয় যে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেকেরই বাংলাদেশ গঠনের পেছনে যে ঘাম, পরিশ্রম, ভালোবাসা, ত্যাগ রয়েছে সেটা আমরা খুব কম মানুষই জানি। আগস্ট যায়, আগস্ট আসে কিন্তু গুগল সার্চ ইঞ্জিনে শুধুমাত্র শেখ কামালকে নিয়ে অপপ্রচার আর মিথ্যাচারই থেকে যায়। তরুণ প্রজন্মের জন্য যে মানুষটি আইকন হতে পারতো, হতে পারতো আলোকবর্তিকা তার সবটাই আজ স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের মিথ্যাচারে নিভু নিভু। এখন সময় এসেছে এইসব মিথ্যাচারের সমুচিত জবাব দেওয়ার এবং তার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের বীরত্বগাথা প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার। আজ এই দিনে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি শেখ কামাল আপনাকে। ভালো থাকুন ওপারে; আমাদের ক্ষমা করবেন আমরা আপনার রক্তের দাগের মাধ্যমে যে কলঙ্ক লেপন হয়েছে বাংলায় তা পুরোপুরি মুছতে পারিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাথে চিরতরে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার আলোকে। তার জীবদ্দশায় যে কীর্তি তিনি রেখে গিয়েছিলেন, সঠিক ইতিহাসের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের সামনে তা উন্মোচিত হলে শেখ কামাল আজো হয়ে উঠবেন তরুণ সমাজের ‘প্রতীকী নেতা’, যাকে অণুসরন করে উন্নয়নের অগ্রগতিতে এগিয়ে যাবে তরুণ সমাজ। বাংলাদেশ সরকার তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এই ক্ষণজন্মা নেতার জীবন উন্মোচিত করা হোক প্রজণ্মের প্রেরণার শিক্ষক হিসেবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তরে বেঁচে থাকুন শেখ কামাল আমাদের নেতা হিসেবে!

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here