শিশির ভাদুড়ির চেয়েও বড় অভিনেতা

0
106

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি খোলা চিঠি লিখেছেন জয়ন্ত ঘোষাল। সেটি সমকালের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

শ্রদ্ধেয় শ্রী নরেন্দ্র মোদি মহাশয়,
আপনি কি শিশির ভাদুড়ির নাম শুনেছেন? বাংলা নাটকের ইতিহাসে তিনি এক কিংবদন্তি। টেলিভিশনের পর্দায় আপনার সাক্ষাৎকার দেখতে দেখতে মনে হলো, আপনি কিন্তু অভিনয় ক্ষমতায় শিশিরবা বুকেও পরাস্ত করে দিয়েছেন। কী অনায়াসে, প্রায় বৈদান্তিক উদাসীনতায়, আপনি একমুখী স্বগতোক্তি আউড়ে যাচ্ছেন। আপনি বলছেন, দেশের ভোট নিয়ে আপনার কোনো মাথাব্যথাই নাকি নেই। আপনার মন্ত্র একটাই, বিকাশ, বিকাশ এবং বিকাশ। আসলে ভোটের সময় যে আপনার মন্ত্র একটাই, মেরুকরণ, মেরুকরণ এবং মেরুকরণ।

হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের সুফল নিতে যে আপনি সেই গোধরার সময় থেকে আজ পর্যন্ত সক্রিয়, সেই সরল সত্য নিয়ে অবশ্য কেউ কোনো প্রশ্ন সাক্ষাৎকারে করেনি। ভারতের রাজনীতিতে তাই আপনাকেই নাট্যসম্রাটের সম্মান দেওয়া উচিত। সাক্ষাৎকারটি কি সাক্ষাৎকার? না আপনার ‘মন কি বাত’-এর মতোই আর এক ‘মনোলগ’? এ তো একমুখী কথা বলে যাওয়া। সম্ভবত আপনি বুঝতে পেরেছেন যে আপনার জনপ্রিয়তায় চিড় ধরতে শুরু করেছে।

রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার আবহ। চাকরি নেই, উৎপাদন নেই। আর্থিক বৃদ্ধির হার, মুখ থুবড়ে পড়া অর্থনীতি। বিমুদ্রাকরণ আর জিএসটির কষ্ট তো প্রকারন্তরে নিজেই স্বীকার করছেন। গুজরাট ভোটের ফলাফল দেখে বুঝছেন, আপনার পপুলিস্ট ব্র্যান্ড-ইক্যুইটিকে আবার চাঙ্গা করা হবে। আর তাই আপনি সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য বাজেট অধিবেশনের মুখে বেছে নিলেন দুটি বন্ধু-চ্যানেল। নিজেই টুইট করে নিজের সাক্ষাৎকারের বিজ্ঞাপন করেছেন। এ দেশের কোনো প্রধানমন্ত্রী এ যাবৎ এহেন আত্মপ্রচারের নিদর্শন রাখতে পারেননি।

সাক্ষাৎকারগুলি দেখে বলিউডের একটি ছবির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ২০০১ সালের নায়ক ছবিতে মুখ্যমন্ত্রী অমরেশ পুরী। চ্যানেলের মালিককে ম্যানেজ করে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পরিকল্পনা এঁটেছিলেন। কথা ছিল এক বশংবদ সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নেবে আর মুখ্যমন্ত্রী বিরোধী প্রচারকে একদম ঠান্ডা করে দেবেন। কিন্তু অনিল কাপুর নায়ক। বলিউডে তো সেটাই হয়ে যায় যা আপনি বাস্তবে হতে দেন না। অনিল কাপুর প্রশ্নকর্তা হয়ে লাইভ ইন্টারভিউ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মুখ্যমন্ত্রীকে আরও প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য করেন।

আপনি অবশ্য সেই বিপদে পড়েননি। পড়বেন কী করে? কতিপয় স্তাবক ছাড়া গত চার বছরে ক’জন সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা করেছেন আপনি? জরুরি অবস্থার আগে ইন্দিরা গান্ধী প্রতি দিন দুই থেকে তিন জন সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা করতেন। বিবিধ সাংবাদিকের কাছ থেকে ‘ফিডব্যাক’ নিতেন। সমালোচক-সাংবাদিকদের সঙ্গে আপনি দেখা করবেন, এই ঔদার্য আপনার কাছ থেকে আশাও করছি না। তাছাড়া অধিকাংশ নেতাই আজকাল বশংবদ সাংবাদিক চান। পক্ষে লিখলে ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক, না করলে শ্রেণিশত্রু।

আপনি জানেন কাকে বলে মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট। তাই আপনাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, আপনি এত পরিশ্রম করেন কী করে? আপনার পরিশ্রমে নবীনরাও লজ্জা পাবে। প্রথমে কিছুটা সময় নিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে হাসলেন। তার পর বললেন, ‘আসলে কাজ না করে আমি থাকতেই পারি না। চিকিৎসকরাও আমাকে এত কাজ করতে মানা করছেন। কিন্তু কী করব? মানুষের সেবাতেই নিয়োজিত আমার জীবন।’

শিশির ভাদুড়ি

বহু বছর ধরে আপনাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমি পেয়েছি। আপনি প্রচণ্ড পরিশ্রমী ঠিকই। কিন্তু যখন গোটা দেশ বহু জ্বলন্ত সমস্যার মধ্যে, যখন গত চার বছরে আপনি একটি সাংবাদিক সম্মেলনও করেননি, তখন এহেন সাক্ষাৎকার দেখে মনে হচ্ছিল, এই নির্বাচিত আত্মকথন গণতন্ত্রের অপমান।

প্রতিনিয়ত কতো কথা বলছেন আপনি, কিন্তু সেই কথার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। আপনি বললেন, মন্ত্রীরা কেউ লালবাতি ব্যবহার করবে না। এদিকে মন্ত্রী কেন, ছোট ছোট বিজেপি নেতারাও সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

২০১৪ সালে আপনি বলেছিলেন, দেশকে আপনি এক নতুন পথ দেখাবেন। নেহরু থেকে ইন্দিরা, সেখান থেকে রাজীব-মনমোহন সত্তর বছর ধরে কংগ্রেস দেশটার সর্বনাশ করেছে। আপনি নাকি এক বিকল্প ভারতের নতুন পথ দেখাবেন। বিশ্বাস করেছিলাম অনেকেই। কিন্তু কোথায় সেই নতুন পথের সন্ধান? আপনি সাক্ষাৎকারে নির্লিপ্ত চিত্তে বললেন, আপনার এখন সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয়, যখন দেখেন গরিব মানুষ দারিদ্রমুক্ত হচ্ছে। এসব কথা কি সত্যিই আপনি বিশ্বাস করেন?

দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দ যে কোনো প্রধানমন্ত্রীকেই কিং ক্যানিউট বানিয়ে দেয়, জানি। কিং ক্যানিউটের সেই কবিতায় পাত্র-মিত্র-অমাত্য সবাই বলে, ‘হে রাজা আপনি বললে সমুদ্রের ঢেউ পিছন দিকে যাবে, সূর্য উঠছে, কিন্তু আপনি বললে আর উঠবে না।’ কিন্তু আপনাকে সত্যি কথা বলছি স্যার, মানুষ আসলে ভালো নেই। ঘরে ঘরে বেকারত্বের যন্ত্রণা। আপনি বলছেন, আমিরি হটাও, কিন্তু মানুষ, বিশেষত গ্রামের মানুষ মনে করছেন অম্বানি–আদানির মতো শিল্পপতিদের হয়েই আপনার সরকার কাজ করছে, গরিব মানুষের জন্য নয়।

দিনে ক’জন গরিব-দুঃখী মানুষের সঙ্গে আপনার দেখা হয় স্যার? অভিজাত দিল্লির খান মার্কেট আপনার বাসভবন থেকে ঢিল ছোড়া দুরত্ব। সেই বাজারে জুতো পালিশ করতে আসে এক দলিত ছেলে। দিল্লি-হরিয়ানার সীমান্তে থাকে। রাজস্থানের এক দলিত জিপিসি পরিবারের সদস্য। রাজস্থানের চাষাবাদের মজুরি করেছে, কিন্তু এখন কর্মহীন। বাবা-ছেলে দু’জনে জুতো পালিশ করে। ছেলেটি বলছিল, গত তিন বছরে ওদের গোটা পরিবার কিভাবে চূড়ান্ত আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। আপনি নিজে এসে ওর সঙ্গে কথা বলুন না, বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন হতে পারে। বাজার কাঁদছে। মানুষ কাঁদছে। আর আপনি ডিএভিপি’র বিজ্ঞাপন আর মিডিয়া ম্যানেজারদের ব্রিফিং শুনে বলছেন, সমাজ বদলে যাচ্ছে, গরিব মানুষ আর গরিব নেই।

সাক্ষাৎকারে দেখলাম আপনি বলছেন, ঘুম থেকে ওঠার সময় দীর্ঘদিনের অভ্যাস বাঁ দিকে বাথরুম যাওয়া। তাই নতুন ঘরে শুলে সেখানে যদি ডান দিকে বাথরুম হয় তা হলেও অনেক সময় মানুষ দীর্ঘ দিনের অভ্যাসে বাঁ দিকেই চলে যায় ভুল করে। অর্থাৎ আপনি এত দিনের অভ্যেস বদলে নতুন ভারত আনতে চাইছেন, কিন্তু মানুষের অভ্যেস বদলাতে সময় লাগছে।

কিন্তু কোথায় আপনার নতুন ভারত? আচ্ছা, বিনীতভাবে জানার চেষ্টা করছি, সত্তর বছরে কি কিছুই হয়নি? নেহরু থেকে মনমোহন সিংহ, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের বিকাশ হয়নি এমন তো নয়, আপনি যদি সেখান থেকেই আবার এক নতুন যাত্রা শুরুর কথা বলতেন তাতে ক্ষতি কী ছিল? মানুষের কথা বলছেন কিন্তু গত চার বছর ধরে তো দেখছি সর্বত্র মোদী। মোদী। মোদী।

বিজ্ঞাপনে, সংবাদমাধ্যমে, সর্বত্র আপনিই বিরাজমান। পপুলিস্ট নেতা আপনি। আপনার মোহেই গণদেবতা ২০১৪ সালে আপনাকে সিংহাসনে বসিয়েছে। কিন্তু এখন যে পলস্তারা খসে ঘুণধরা দেওয়াল দেখা যাচ্ছে। সে অবক্ষয়ও হবে আপনার দায়। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ছদ্মবেশে বাজারে গিয়ে বুঝতে চাইতেন, মানুষ কেমন আছে। সত্যিকারের কথোপকথন ছিল সেটা।  একমুখী কথা বলার মেকি নাটকীয়তা নয়।

আপনার সাজনো সাক্ষাৎকার দেখে দেশের বহু মানুষ আজও আবেগাপ্লুত হতেই পারে। কিন্তু ২০১৪ সালে যতো মানুষ যে ভাবে মোহাবিষ্ট হয়েছিল, আজ বোধহয় ঠিক ততো মানুষ আর আবেগাপ্লুত হবে না। অনেকেই যে বুঝতে পারছে, আপনি শিশির ভাদুড়ির চেয়েও অনেক বড় অভিনেতা।