শিল্পের আবেদন চিরন্তন: রাষ্ট্রপতি

0
8

ঢাকা: রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘শিল্পী তার নিজস্ব চেতনা, পারিপার্শ্বিকতা তথা স্থান-কাল পাত্রকে ধারণ করে তা ফুটিয়ে তোলেন তার শিল্পকর্মে। তাই দেশ-কাল-সংস্কৃতি ভেদে শিল্পীর স্বরূপ ও কর্মকাণ্ড ভিন্ন হতে পারে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিল্পের নান্দনিকতা ও আবেদন সীমাহীন ও চিরন্তন। প্রতিটি শিল্পকর্মে শিল্পীর নিজস্ব চিন্তা-চেতনার পাশাপাশি ফুটে উঠে জাতীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। তাই শিল্পকর্ম ও শৈল্পিক ভাবনা ব্যক্তিশিল্পীর হলেও তার সৃষ্টিশীল কর্মের ব্যাপ্তি সর্বত্র এবং তা সর্বজনীন।’

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনে শনিবার ১৮তম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী উদ্বোধনকালে আবদুল হামিদ একথা বলেন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পকলা একাডেমি এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।

বাংলাদেশসহ ৬৮ দেশের চারুশিল্পীরা অংশ নিচ্ছেন মাসব্যাপী এ প্রদর্শনীতে। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এ প্রদর্শনী উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেন। পরে রাষ্ট্রপতি তিনজনকে গ্র্যান্ড পুরস্কার এবং ছয় শিল্পীর হাতে সম্মানসূচক পুরস্কার তুলে দেন। উদ্বোধন শেষে রাষ্ট্রপতি জাতীয় চিত্রশালায় প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন- সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং সম্মানিত অতিথি ছিলেন এবারের প্রদর্শনীর পর্যবেক্ষক ইমেরিটাস অধ্যাপক তেতসুইয়া নোদা। পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করেন বিচারকমণ্ডলীর প্রধান শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ।

সংস্কৃতি সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। শিল্পের এ মহাযজ্ঞের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন দেশ-বিদেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী, জুরি, শিল্প সমালোচক, পর্যবেক্ষক, কিউরেটর ও অতিথিরা।

প্রদর্শনীতে এবার গ্র্যান্ড পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশের আতিয়া ইসলাম, সালমা জাকির বৃষ্টি ও ভারতের কান্দন জি। সম্মানসূচক পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশের কামরুজ্জামান স্বাধীন, ফকরুল ইসলাম মজুমদার, নাজমুন নাহার কেয়া, চীনের উ জুন, ফিলিস্তিনের মুনথে জাওয়াব্রে ও থাইল্যান্ডের ত্রিরাত স্রিবুরিন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রাথমিকভাবে দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন শুধু এশীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সম্প্রতি এ আয়োজনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এবারের আয়োজনে বিশ্বের ৬৮ দেশের অংশগ্রহণ সত্যিই প্রশংসনীয়। এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল আজ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও খ্যাতনামা চারুকলা প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।

আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশের রয়েছে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ভাষার জন্য আত্মদানের মহিমায় বাঙালি জাতি বিশ্বব্যাপী পরিচিত ও সমাদৃত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিল্প-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ সৃজনশীল মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন।

অনেক বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও দেশের বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সহযোগিতায় শিল্পকলা একাডেমি সংস্কৃতির বিকাশে পালন করছে অনবদ্য ভূমিকা। আন্তর্জাতিক এ আয়োজন বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরবে।

আবদুল হামিদ বলেন, সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের দর্পণ। যে জাতির শিল্প-সংস্কৃতি যত বেশি সমৃদ্ধ, সে জাতি তত বেশি উন্নত। ঐতিহ্যগতভাবেই এ দেশের মানুষ শিল্প ও সংস্কৃতিমনা। এ দেশের কবি, গায়ক ও শিল্পীরা অনেকেই দীক্ষা লাভ করেছেন বাংলার অপরূপ প্রকৃতি ও উদার সাংস্কৃতিক চেতনা থেকে।

তারা আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন মেধা ও মননে এবং তুলে ধরেছেন দেশের পাশাপাশি বহির্বিশ্বে। বাঙালি জাতির অর্জনের পেছনে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের রয়েছে অসামান্য অবদান। জাতির যে কোনো প্রয়োজনে বা সংকটময় মুহূর্তে সংস্কৃতিকর্মীরা সব সময় সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণেও শিল্প-সংস্কৃতি অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। একটি জাতির তরুণ ও যুবসমাজের মাঝে শৃঙ্খলা, জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেমের চেতনা বিকাশসহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য জাগিয়ে তুলতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, দেশে-দেশে, মানুষে-মানুষে মৈত্রীর বন্ধন ও সম্পর্কের উন্নয়নে শিল্পকলার অবদান ব্যাপক। শিল্পকলা একটি দেশ ও জাতিকে বিশ্ব মানচিত্রে গৌরব ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারে। এ প্রদর্শনী হয়ে উঠতে পারে দেশ-বিদেশের শিল্পীদের মত ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের পরিবেশনায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেপ্টেম্বরজুড়ে শিল্পরসিকরা বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চিত্রশালার ছয় গ্যালারিতে অবলোকন করতে পারবেন এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো। প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত।