‘রোহিঙ্গা’ শব্দ উচ্চারণ করলেন পোপ ফ্রান্সিস

0
52
ঢাকা: ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে বলেছেন, যারা তোমাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে, যারা তোমাদের আঘাত করেছে, তাদের পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চাইছি। তোমাদের মহৎ হৃদয়ের কাছে আমার আবেদন, আমাদের ক্ষমা করো।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার বিকালে ঢাকার সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বলে, তাদের দুর্দশার কথা নিজের কানে শুনে এ কথা বলেন পোপ। তিনি আরও বলেন, ‘আজ ঈশ্বরের যে উপস্থিতি, তা রোহিঙ্গারূপেও বিরাজমান।’
পোপ ফ্রান্সিস তার এশিয়া সফরে বাংলাদেশে আসার পর এই প্রথমবারের মতো ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করলেন। এর আগে তিনি মিয়ানমার সফর করলেও সেখানে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি।
বিকাল পৌনে ৪টায় বিশেষভাবে সাজানো রিকশায় চড়ে রাজধানীর কাকরাইলের সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রালে যান এবং মাঠে আয়োজিত সভায় যোগ দেন পোপ ফ্রান্সিস। ওই সময় অপেক্ষমাণ অতিথিরা তাকে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান।
রিকশায় বসেই তিনি আনন্দময় এ পরিবেশ হাসিমুখে উপভোগ করেন। রিকশায় পোপকে দেখে ভ্যাটিকান থেকে আসা নিরাপত্তাকর্মীরা অবাক হয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। তাদের কাছে নতুন মনে হওয়ায় রিকশা নিয়ে তারা আগ্রহী হয়ে ওঠেন ও নানা প্রশ্ন করেন।
বিকাল ৫টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। আন্তঃধর্মীয় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে পোপ ফ্রান্সিস আসন গ্রহণ করেন। এ সময় উপস্থিত অতিথিরা তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা।
এ সময় বক্তব্য রাখেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ, বাণী পাঠ করেন স্বামী ধ্রুবনান্দ মহারাজ, সংঘ নায়ক সুদ্ধানারায়ণ মহানান্দ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।
আনিসুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, আজ বিশ্বে সংঘাত পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চলছে। পোপ ইতিমধ্যে মিয়ানমার সফর করেছেন। তার সফরে নিশ্চয় অত্যাচারীরা ভুল বুঝবে, বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে। তিনি বলেন, পোপ বাংলাদেশে সফর করছেন, এর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মানুষের মন জয় করেছেন।
বিকাল ৫টা ৪২ মিনিটে পোপ তার লিখিত বক্তব্য রাখেন। প্রায় ১১ মিনিট বক্তব্য রাখেন নিজ দেশের ভাষায়। বক্তব্যে তিনি বিশ্বের শান্তি কামনা করেন। বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তিনি ভালোবাসা জানিয়েছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের তিন পরিবারের ১৮ সদস্য পোপের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। ১৮ সদস্যের সবাই পোপের সঙ্গে কথা বলেন।
এ সময় পোপ মাথায় হাত রেখে তাদের জন্য দোয়া করেন। তিনি রোহিঙ্গা শিশুদের আদরও করেন। এরপর পোপ বলেন, ‘আজ ঈশ্বরের যে উপস্থিতি, তা রোহিঙ্গারূপেও বিরাজমান।’
পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ : 
বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার বিকালে নগরীর ভ্যাটিকান দূতাবাসে পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, পোপ ও প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর তারা ২০ মিনিট আলাপ-আলোচনা করেন।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে পোপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় শেখ রেহানার পুত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও তার স্ত্রী পেপি সিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন। পরে পোপ ফ্রান্সিস, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা ফটোসেশনে অংশ নেন।
যা বিশ্বাস করো তা শিক্ষা দাও এবং অনুশীলন করো :
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুক্রবার সকালে বিশেষ খ্রিস্টযোগে অংশ নেন পোপ। সেখানে তরুণদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘প্রভুর আজ্ঞা অনুধ্যান করে করে তোমরা দেখবে- যা পড়ো তা যেন বিশ্বাস করো। যা বিশ্বাস করো তা শিক্ষা দাও এবং যা শিক্ষা দাও তা অনুশীলন করো।’
নতুন প্রজন্মের প্রতি পরামর্শ দিয়ে পোপ ফ্রান্সিস আরও বলেন, ‘তোমাদের সেবাকর্মের মাধ্যমে বিশ্বাসী ভক্তজনের আত্মিক বলিদান পূর্ণতা লাভ করবে। তাই যথার্থভাবে বুঝে নিও, তোমরা কী করো এবং যা উদযাপন করো তা অনুকরণ করো। প্রভুর মৃত্যু ও পুনরুত্থানের নিগূঢ়ত্বের উদযাপনকারী হিসেবে তোমাদের মধ্যে সমস্ত পাপময়তার মৃত্যু ঘটাতে এবং নবজীবনের পথে চলতে সচেষ্ট থেকো।’
অনুষ্ঠানে পোপ ফ্রান্সিসের মাধ্যমে যাজক বা ফাদার হিসেবে অভিষিক্ত হন ১৬ জন। তাদের উদ্দেশ করে পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, ‘স্নেহের সন্তানেরা, তোমরা এখন যাজক পদে উন্নীত হতে যাচ্ছো। তোমাদের পক্ষ থেকে তোমরা শিক্ষাগুরু খ্রিস্টের নামে শিক্ষাদানের পুণ্য সেবাকাজ সম্পাদন করবে। যে ঐশীবাণী তোমরা আনন্দের সঙ্গে লাভ করেছো, তা সবাইকে প্রদান করবে। এভাবে তোমাদের জীবনের পবিত্রতা খ্রিস্টবিশ্বাসী জনগণের জন্য বয়ে আনুক সুরভিত হৃদআনন্দ।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রিয় সন্তানেরা, তোমাদের বিশপের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ও তার অধীন হয়ে মণ্ডলীর মস্তক ও পালক খ্রিস্টের সেবাকর্ম সম্পাদন করতে করতে বিশ্বাসী জনমণ্ডলীকে এক পরিবারে একত্রিত করতে সচেষ্ট থেকো। যেন তাদের খ্রিস্টের মাধ্যমে পবিত্র আত্মাতে পিতা পরমেশ্বরের কাছে পরিচালনা করতে পারো। তোমাদের দৃষ্টিগোচরে রেখো উত্তম মেষপালকের আদর্শ, যিনি সেবা পেতে নন, বরং সেবা করতে, যারা হারিয়ে গেছে তাদের খুঁজে নিতে ও মুক্তি দিতে এসেছেন।’
মঞ্চে উঠে পোপ বাংলায় আগতদের উদ্দেশে বলেন, ‘পিতা ও পুত্র পবিত্র আত্মার নামে তোমাদের শান্তি হোক।’ তার পর তিনি হাত নাড়িয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান।
এর আগে মঞ্চে উঠে তিনি টেবিলে রাখা পবিত্র বাইবেলে চুমু খান। মঞ্চে উঠার সময় চারপাশে অপেক্ষারত বিশেষ ব্যক্তি ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ১০টা ২৭ মিনিটে তিনি বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান শেষে ১২টা ১৭ মিনিটে তিনি মঞ্চ থেকে নেমে আবারও উপস্থিতগণদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
সারা দেশ থেকে লাখো খ্রিস্টান, তিন শতাধিক যাজক, ১৫ শতাধিক ব্রাদার-সিস্টার এ বিশেষ খ্রিস্টযোগে ছিলেন। এছাড়া পোপের সফর উপলক্ষে ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে এখানে আসেন ৩০ জন কার্ডিনাল, আর্চবিশপ ও বিশপ।
লিখিত ভাষণের বাইরে তাদের উদ্দেশে পোপ বলেন, ‘ভাই ও বোনেরা, আপনারা অনেক দূর-দূরান্ত থেকে অনেক কষ্ট করে এ অনুষ্ঠানে যোগদান করতে এসেছেন। আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের এ অংশগ্রহণ যীশুর প্রতি ভালোবাসারই প্রকাশ। ঈশ্বরের প্রতি আপনাদের বিশ্বস্ততার বহিঃপ্রকাশ। আপনাদের কাছে আমার বিশেষ আহ্বান, আজ যারা যাজক পদে অভিষিক্ত হয়েছেন তাদের জন্য প্রার্থনা করবেন।’
খোলা পিকআপে চড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসেন পোপ ফ্রান্সিস। এখানে শুধু খ্রিস্টানরাই নন, ছিলেন মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধরা। অনুষ্ঠানে পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে ছিলেন পোপের সেক্রেটারি অব দ্য স্টেট কার্ডিনাল পিয়াত্রো পারোলিন, ঢাকার আর্চবিশপ প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপ সম্মিলনী কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি রোজারিও, বিশ্বাস বিস্তার সংস্থা প্রিফেক্ট কার্ডিনাল ফার্নান্দো ফিলনি, সেক্রেটারি অব স্টেট সহ-সেক্রেটারি আর্চবিশপ জি. অ্যাঞ্জেলো বিক্কিও, বাংলাদেশের ভ্যাটিকান রাষ্ট্রদূত আর্চবিশপ জর্জ কোচেরি, ঢাকার সহকারী বিশপ শরৎ ফ্রান্সিস প্রমুখ।
আজ শনিবার সকালে তেজগাঁওয়ে মাদার টেরিজা হাউস পরিদর্শনে যাবেন পোপ। তেজগাঁও হলি রোজারিও চার্চে খ্রিস্টান যাজক, ধর্মগুরু ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে চার্চের কবরস্থান পরিদর্শন করবেন। দুপুরের পর ঢাকায় নটরডেম কলেজে তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করবেন। পরে সফরের ইতি টেনে বিকাল ৫টায় শাহজালাল বিমানবন্দর ছাড়বেন ক্যাথলিক ধর্মগুরু। তাকে বিদায় জানাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের ক্যাথলিক বিশপের আমন্ত্রণে সম্প্রীতি ও শান্তির বাণী নিয়ে তিন দিনের সফরে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে আসেন পোপ ফ্রান্সিস। এদিন বিকাল ৩টায় মিয়ানমার থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান তিনি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাকে অভ্যর্থনা জানান। এরপর রাতে তারা অংশ নেন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও একান্ত আলোচনায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here