রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনায় ঢাকায় আসছেন ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী

0
49

নিউজ ডেস্ক: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর চলমান অত্যাচার-নির্যাতন ও নিধনের ইস্যুতে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসছেন ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি। আগামীকাল মঙ্গলবার (৫ সেপ্টেম্বর) তাঁর বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ঢাকাস্থ ইন্দোনেশীয় দূতাবাসের এক কূটনীতিকও তাঁর আসার খবরটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

ইন্দোনেশীয় দূতাবাসের ওই কূটনীতিক জানান, রেতনো মারসুদি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি এ সময় বাংলাদেশে আসার আগ্রহের কথা জানান। এর পাশাপাশি তিনি রোহিঙ্গা সমস্যায় বাংলাদেশের ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানান। রেতনো মারসুদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এও জানান যে, বাংলাদেশ সফরের আগে তিনি মিয়ানমার সফর করবেন। এ সময় তিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থিন কিউ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এবং দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করবেন।

সিঙ্গাপুরের চ্যানেল নিউজ এশিয়া জানায়, আজ সোমবার (৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রেতনো মারসুদির মিয়ানমার চলে যাওয়ার কথা।

মিয়ানমারের রাখাইনে গত সপ্তাহে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর হাজারো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে ওই সংখ্যা ৭৩ হাজার বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের উপর চলমান অত্যাচার-নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার বিক্ষোভ ছড়িয়েছে জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায়। মূলত এরপরই মিয়ানমার সরকারকে নির্যাতন বন্ধের তাগাদা দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদিকে পাঠানো হয়েছে সেখানে।

ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় মিয়ানমার দূতাবাসে পেট্রোল বোমা হামলার পর রবিবার এক ঘোষণায় এ কথা জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ান প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো।

ইন্দোনেশিয়ায় ২০ কোটির বেশি মুসলিমের বাস। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের খবরে এই মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

রোহিঙ্গা নির্যাতন ইস্যুতে মিয়ানমারের নেতা শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সূ চির ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্টরা শনিবার ইন্দোনেশিয়ায় তার নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আন্দোলনও করেছেন। রবিবারও সেই আন্দোলন চলে। ওই আন্দোলন থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকাল লঙ্ঘন ঠেকাতে ইন্দোনেশিয়া সরকারের জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার দাবিও জানানো হয়।

উইদোদো বলেছেন, জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর সঙ্গে ‘নিবিড় যোগাযোগের’ জন্য মারসুদিকে মিয়ানমার পাঠানো হয়েছে।

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে মারসুদি বাংলাদেশ সফর করেন। গত বছরের অক্টোবর মাসে মিয়ানমারে রাখাইনের সীমান্তচৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার পর সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক নিধনযজ্ঞ শুরু করে। ওই ঘটনার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। এ বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। সরকারি হিসাবে আরও প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা আগে থেকে বাংলাদেশে আছে। গত বছরের এই এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই রেতনো মারসুদি বাংলাদেশ এসেছিলেন।

ওই সফরের সময় রেতনো মারসুদি ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া তিনি কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের একটি নিবন্ধিত শরণার্থীশিবির এবং একটি অস্থায়ী শিবির পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের দায়িত্ব নেওয়া উচিত বলে মনে করে ইন্দোনেশিয়া। কারণ, রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর যে মানবিক সংকটের শুরু, এর উৎস মিয়ানমারেই। কাজেই মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব নিতে হবে।

গত বছরের বাংলাদেশ সফরের আগে মারসুদি মিয়ানমারে গিয়ে অং সান সুচির সঙ্গে বৈঠক করেন।

গত বছরের অক্টোবরের পর গত ২৪ আগস্ট রাখাইনে আবার নতুন করে নিরাপত্তা বাহিনী ও মুসলিম বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এতে অন্তত ৮৯ জন নিহত হয় বলে জানায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চির দপ্তর। এদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য এবং বাকিরা ‘জঙ্গি’ বলে জানায় তারা। বৃহস্পতিবারই জাতিসংঘের কফি আনান মিয়ানমারে উন্নয়ন সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে দেওয়া ৮৮ দফা সুপারিশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া এবং তাদের চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর একদিন না যেতেই নতুন করে সংঘাত শুরু হয়।

নতুন করে সংঘাত শুরুর পর গত নয় দিনে অন্তত ৬০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে বলে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর গতকাল শনিবার জানায়। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ভিভিয়ান ট্যান বলেন, ‘এ পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে আসা মানুষের আনুমানিক সংখ্যা ৫৮ হাজার ৬০০। এ সংখ্যা ক্রমে বাড়ছেই।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পর্যন্ত আরাকানে অন্তত ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে।  ১১ হাজার ৭০০ ‘জাতিগত অধিবাসী’ তাদের বাসস্থান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, ২৭ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার উপগ্রহ চিত্র পাওয়া গেছে।