রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের ৪ বছর, কামালপুর থেকে বঙ্গভবন

0
103
untitled-5_287665নিউজ ডেস্ক: হাওরবেষ্টিত উপজেলা মিঠামইনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর গ্রাম কামালপুর। একসময়ের অখ্যাত এ গ্রাম আজ সারাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত। কিশোরগঞ্জ জেলার এ গ্রামেরই মো. আবদুল হামিদ আজ দেশের রাষ্ট্রপতি। হাওরাঞ্চলের গণমানুষের অতিপ্রিয় নেতা তিনি। তার শৈশব কেটেছে গ্রামেই। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে তার চার বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ২৪ এপ্রিল।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে পঞ্চম বছরে পদার্পণ উপলক্ষে আবদুল হামিদ হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের প্রতি বিত্তবানদের সাহায্যের হাত বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকারের সাহায্যের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিত্তবানরা আন্তরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসীর পাশে থাকলে সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলা সম্ভব হবে। এ ছাড়া তিনি সমকালকে বলেন, ‘জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমি সব সময়ই আন্তরিকভাবে সচেষ্ট থেকেছি। বিগত দিনগুলোর মতো আগামী দিনেও যেন আমি দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষা পূরণে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারি সেজন্য পুরো জাতির দোয়া ও সহযোগিতা চাই।’

গ্রামের অন্য শিশুদের মতোই শৈশবে দুরন্ত আর ডানপিটে ছিলেন আবদুল হামিদ।

ছোট্ট গ্রাম কামালপুরের আলো-বাতাস তাকে সবসময় আকর্ষণ করে। তাই শত ব্যস্ততার ফাঁকে সামান্য অবসর পেলেই তিনি ছুটে আসেন কামালপুরের মানুষের কাছে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর যতবার হাওরাঞ্চল সফরে এসেছেন, ততবারই রাতযাপন করেছেন গ্রামের নিজ বাড়িতে। যতবার এলাকায় এসেছেন, ততবারই তিনি শৈশব নিয়ে বারবার স্মৃতিকাতর হয়েছেন। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। রাষ্ট্রপতির চাচাতো ভাই ও খেলার সাথি হাজি মোনতাজ উদ্দিন এবং দারোগ আলী বলেন, ছেলেবেলার বন্ধু যখন জীবনে সফলতা লাভ করে, তখন কার না ভালো লাগে। আমাদের প্রাণপ্রিয় মানুষটি আজ দেশের রাষ্ট্রপতি- এ গর্ব আমাদের সবার। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় পুরো জাতির সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। রাষ্ট্রপতির স্নেহধন্য কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘হামিদ ভাই আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবক। তিনি আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত নেতা। চরম দুর্দিনে সব রাজনৈতিক প্রলোভন তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের আদর্শকে যাবতীয় প্রতিকূলতা ঠেলে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছেন।’

জেলা ছাত্রলীগের এক সময়ের নেতা, ছড়াকার ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক জাহাঙ্গীর আলম জাহান বলেন, জনসম্পৃক্ততাই আবদুল হামিদকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তার জীবনাচার থেকে রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

গত সপ্তাহে কামালপুরে গিয়ে কথা হয় তার স্বজনদের সঙ্গে। তার বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে যেতেই চোখে পড়ে ইটের দেয়াল এবং টিনের তৈরি বাংলো ধরনের ঘর। ঘরের সামনে একদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃষ্টিনন্দন ম্যুরাল, অন্যপাশে রাষ্ট্রপতির একটি আবক্ষ ম্যুরাল। বাংলোঘর পার হলেই বিশাল উঠান। উঠানের চারদিকে ইটের দেয়ালসহ টিনের ঘর। এসবের একটি টিনের দোতলা ঘর। এ ঘরের সামনে ফলকে লেখা ‘মো. আবদুল হামিদ, অ্যাডভোকেট।’ গ্রামে এলে এ ঘরের দোতলার একটি কক্ষে রাতযাপন করেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির বাড়ির পাশেই আছে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ। বাড়ি দেখভালের দায়িত্ব পাওয়া নাসির মিয়া জানান, রাষ্ট্রপতি বাড়ি এলেই এলাকাবাসীর খোঁজখবর নেন। এলাকার জনগণও ভালোবাসার টানে ছুটে আসেন তার কাছে। পুরো কামালপুরে যেন ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।

কামালপুর গ্রামে ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হাজি মো. তায়েব উদ্দিন ও মা মোছা. তমিজা খাতুন। আবদুল হামিদ শৈশবে কামালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। পরে ভৈরব কেবি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষে নিকলী গোরাচাঁদ (জেসি) উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পাস করেন।

ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গুরুদয়াল কলেজের ভিপি নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। পরে ঢাকার সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি নিয়ে রাজনীতির পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ জজকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। তিনি জেলা বারে পাঁচবার সভাপতি নির্বাচিত হন। অষ্টগ্রাম-ইটনা-মিঠামইন আসন থেকে তিনি সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৬ সালের ১৩ জুলাই তিনি সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ১১ জুলাই থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। নবম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো স্পিকার নির্বাচিত হন। ১৯তম রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের ২২ এপ্রিল কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই ২০তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। ২৪ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here