যে কারণে বামা একটি ভূতুড়ে শহর

0
244

_90991685_mediaitem90991684আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বামা শহরটি বোকো হারাম জঙ্গিরা প্রায় সাত মাস দখল করে রেখেছিল, আর এই সাত মাসেই শহরটি পুরোপুরি বদলে গেছে। নাইজেরিয়ার বড় একটি শহর বামা, বোকো হারামের জঙ্গিরা যেটি অনেকদিন দখল করে রেখেছিল।খবর-বিবিসি বাংলা।

কিন্তু জঙ্গিদের কাছ থেকে ওই শহরটি নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী পুনর্দখলে নেয়ার ১৮ মাস পরও শহরটি যেন একটা সময়ে আটকে আছে।

পুরোপুরি বিধ্বস্ত একটি শহর বামা। এখানকার রাস্তাগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যে কয়জন লোক শহরের হাসপাতালের মাঠে তাবু গেড়ে আছে, যাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে সেনা সদস্যরা তাদেরও মানবিক সাহায্য প্রয়োজন।

শহরের কয়েকশো বাড়ি জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। পোড়া গাড়ি রাস্তায় পড়ে আছে। অনেক বাড়িতে বড় বড় ঝোপঝাড় জন্মেছে। সেনা টহলের বিষয়টি বাদ দিলে শহরটিতে পুরোপুরি ভুতুড়ে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ক্যামেরুনের সীমান্তবর্তী, নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বর্নো প্রদেশের শহর বামা একসময় বানিজ্যিক কর্মকান্ডের জন্য সুপরিচিত ছিল, প্রায় আড়াই লাখ মানুষের বাস ছিল এখানে। ২০১৪ সালের অগাস্টে বোকো হারাম এটি দখল করে নেয়, এবং সাত মাস পর্যন্ত এর নিয়ন্ত্রণ করতো জঙ্গিগোষ্ঠীটি।
২০১৫ সালের মার্চে সেনাবাহিনী আবার এটি পুনর্দখল করে। কিন্তু এই সাত মাসে শহরটির চেহারাই বদলে দিয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠীটি।

খাবার নেয়ার জন্য বামা হাসপাতালের সামনে মানুষেরা এভাবেই ভিড় জমায়। যেদিন বোকো হারাম প্রথম এই শহরে হামলা করলো সেদিনের স্মৃতিচারণ করছিলেন এক বাসিন্দা- “আমরা প্রথমে বন্দুকের শব্দ শুনলাম, তারপর বোমার শব্দ। এরপর আমরা দৌড়াতে শুরু করলাম।

স্থানীয়দের কেউ বলেন সংঘর্ষে কয়েকশো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, আবার কারো মতে এই সঙখ্যাটি হাজারের মতো। কেউ সঙখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। কারণ জঙ্গিরা মানুষ মেরে ব্রিজ দিয়ে নদীতে সেটি ফেলে দিত।

যদিও আস্তে আস্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাইজেরিয়ার উত্তর পূর্বাঞ্চলে পাল্টাচ্ছে, কিন্তু বোকো হারাম মানুষের জীবনে সংকট তৈরি করে যাচ্ছে, সেই ক্ষতি পুষাতেই হয়তো কয়েক বছর বা দশক লেগে যাবে। কিভাবে বেঁচে আছে মানুষ?

তৃতীয় বছরের মতো এখানকার চাষীরা জমিতে কোন ফসল বুনতে পারেনি। কারণ জমিতে এখন গোলার আঘাত আছে, গুলি বা কার্তুজও খুঁজে পাওয়া যাবে এখানে।

আর নিরাপত্তার খাতিরে নাইজেরিয়ান সেনাবাহিনী এখননকার সমস্ত বাজার বন্ধ করে দিয়েছে।
কিন্তু সেনাবাহিনীর এ কেৌশলের কারণে সেখানে চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

সাহায্য সংস্থাগুলোও বলছে সেখানে মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছাচ্ছে। জাতিসংঘ বলেছে, আড়াই লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। আর ৫০ হাজারের মতো শিশু খাবারের অপর্যাপ্ততার কারণে মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে।
কিন্তু এখনো নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী বোকো হারাম জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। গ্রাম পুনদর্খল করার চেষ্টা করছে এবং যারা পালিয়ে যাচ্ছে তাদের উদ্ধার করছে।

বামা হাসপাতালে যে দশ হাজার মানুষ আশ্রয় শিবিরে আছে তারা আশেপাশের গ্রাম থেকে এসেছে এবং তাদের প্রয়োজন প্রচুর।

কদিন আগেই এ শিবিরে একজন মা ও তার অপুষ্টিতে ভোগা শিশুকে ধরে এনেছে সেনারা। পথের ধারে এই মা আর শিশুকে ঘাস খেতে দেখে তাদের তুলে আনে সেনারা। “আমরা শুধু শস্য কনা পেতাম”-ছেলের ধারে বসে তার মা বলছিল।

“খাবার কেনার কোন টাকা আমার কাছে নেই। আমাদের গ্রামের মানুষেরা কোনরকমে বেঁচে আছে”। তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ডাক্তাররা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। জুন মাসে মেদসা সঁ ফ্রতিঁয়ে বলেছিল অনাহারে সেখানকার প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

পরিস্থিতি ভালোর দিকে যাচ্ছে কিন্তু সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে আরো অনেক কিছু করার আছে।

চাষী বুলামা মোহাম্মদ বলছেন মাইদুগুরির আশ্রয় শিবিরে থাকা মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে।
নাইজেরিয়ার চাদ, ক্যামেরুন এবং সাউথ সুদানের লাখ লাখ মানুষ সরকারি এবং আন্তর্জাতিক সাহায্যের ওপরেই নির্ভরশীল। তারা অপেক্ষায় থাকে কখন খাবার আসবে।

যদি কারও কাছে টাকাও থাকে তাহলেও খাবারের জিনিস কেনার দোকান খুঁজে পাওয়া মুশকিল। শহরে খুব কম দোকানই আছে যেখানে খাবার কিনতে পাওয়া যায়।

বুলামা মোহাম্মদ নামে একজন কৃষক যিনি বামায় সংঘর্ষের সময় সেখান থেকে পালিয়ে রাজধানী মাইদুগুরিতে চলে আসেন। নয় সন্তানের জনক বুলামা এখন বামায় ফেরার জন্য খুবই উদগ্রীব।

বোকো হারাম জঙ্গিরা তার ১৩ বছরের মেয়ে জেয়নাবকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং এখনও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ৩৯বছর বয়সী মি: মোহাম্মদ বলছেন এ শিবিরে জীবন অনেক কষ্টের।
এই সপ্তাহেই এক নববধুসহ চারজন অনাহারে মারা গেছে বলে জানান তিনি।

মাঝেমধ্যে শ্রমিকের কাজ করতে পারেন বুলামা মোহাম্মদ, কিন্তু সন্তানদের খাওয়াতে প্রায় সময়ই তাকে ভিক্ষা করতে হয়।

সংঘর্ষের জেরে যাদের শরণার্থী হিসেবে জীবন যাপন করতে হচ্ছে, তাদের ভবিষ্যত যে কতটা নিরাপদ সে বিষয়ে প্রশ্ন চলে আসে।