মুক্তিযুদ্ধের গল্পের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কতটুকু?

0
138

বিনোদন ডেস্ক: বিজয়ের মাস যাচ্ছে অথচ প্রেক্ষাগৃহে নেই মহান মুক্তিযুদ্ধ গল্প নিয়ে নির্মিত নতুন কোনো ছবি। ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে টিভি চ্যানেলে মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে নির্মিত পুরনো ছবি প্রচার হয়। যে ছবিগুলোর বাইরে বর্ণিল এ ইতিহাস নিয়ে নতুন কোনো ছবিই নির্মাণ হচ্ছে না। অথচ নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা মুক্তিযুদ্ধের গল্পে কাজ করতে মুখিয়ে আছেন। তারা চাইছেন নিজেদের গর্বের এ ঘটনাটি নিয়ে নির্মিত হোক ছবি এবং নাটক। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে প্রতিবেদনটি লিখেছেন- অনিন্দ্য মামুন

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। এ মাসের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশিদের জন্য ভিন্ন কিছু। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পাওয়ার মাস এটি। এ মাসকে ঘিরেই জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশিদের মুক্তি আর সংগ্রাম জড়ানো আবেগ। তবে স্বাধীনতার এত বছর পার হওয়ার পরও নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ ১৯৭১ সালের দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বাঙালি জাতির আত্মত্যাগ এবং হানাদার বাহিনীর বর্বরতা সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত নয়।

এর পেছনেও রয়েছে আমাদের দুর্বলতার নানা দিক। ইন্টারনেটের যুগে বিশ্ব এখন নতুন প্রজন্মের হাতের মুঠোয়।

পড়াশোনার পরে অবসর সময়টুকু তাদের কাটে ইন্টারনেট নিয়ে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মের পেছনের ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং বীরত্বের চিত্রগুলো তাদের কাছে তুলে ধরা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে চলচ্চিত্র। তিন ঘণ্টার একটি চলচ্চিত্রে যেটি দেখানো সম্ভব সেটি অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব নয়। তা ছাড়া আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক ভালো ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ভালো মানের চলচ্চিত্রগুলো নতুন প্রজন্মকে দেখানোর দায়িত্বটা অনেকটাই নিতে পারেন সিনেমা ও নাটকের নির্মাতারা। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেও। এখন মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ছবি খুব একটা নির্মিত হচ্ছে না।

কেন নির্মিত হচ্ছে না এর উত্তরে অনেকে অনেক কথাই বলেছেন। যার মূলভাব হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধনির্ভর ছবিতে যেমন অ্যারেজমেন্ট থাকা দরকার সেটি নেই। এ ছাড়া এ ধরনের ছবিতে সরকারের সহায়তারও প্রয়োজন পড়ে। সেটিও গুটিকয়েক নির্মাতা ছাড়া তেমন কেউ পান না। আগে এ ধরনের ছবি নির্মিত হলেও এখন আর হচ্ছে না। তবে মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে তারকাদের আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে খুব। নির্মাতা ও তারকারা এখনও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পের ছবিতে অভিনয় করতে অধীর আগ্রহ নিয়েই থাকেন। কিন্তু এখন যে মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মিত হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। যেগুলো নির্মিত হচ্ছে তাতে অনেকটাই মুক্তিযুদ্ধকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে নাটক ও ছবি যা-ই নির্মিত হয়েছে, তাতেই অভিনয় করতে আগ্রহ দেখিয়েছেন শিল্পীরা। দেখাচ্ছেন এখনও। বলা যায় তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ছবি বা নাটকে অভিনয় করার জন্য মুখিয়ে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকাই ছবির অন্যতম চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্পের প্রতি আমার দারুণ আগ্রহ। আমি চাই ওরা এগারোজন ও আগুনের পরশমণির মতো আরও অনেক ছবি নির্মিত হোক। সেই ছবিগুলোর একজন হয়ে অভিনয় করি। আমাদের আগের সময়ে বেশ আয়োজন করেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প নিয়ে ছবি নির্মিত হতো। এখন সেটি হচ্ছে না। প্রতি বছরই শুনি মুক্তিভিত্তিক গল্পের ছবি নির্মিত হচ্ছে। খোঁজ নিলে আগের ছবির বাইরে নতুন ছবি খুঁজে পাই না।’

চলচ্চিত্রের এ প্রজন্মের অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা মিম। তিনিও জানালেন এ ধরনের ছবিতে অভিনয় করার তার আগ্রহের কথা। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্বের অন্যতম কারণ। আমরা যুদ্ধ দেখিনি। নাটক, সিনেমা দেখে ও বইয়ে পড়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও তখনকার অবস্থা এবং আমাদের সাহসিকতার পরিচয় পেয়েছি। এখন যদি এ ধরনের ছবিতে আমাকে প্রস্তাব দেয়া হয় তা হলে অবশ্যই আমি অন্য ছবির চেয়ে এ ধরনের ছবিকে গুরুত্ব বেশি দেব। আমি চাই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মিত হোক। জানি না এ ধরনের ছবিতে অভিনয় করার যোগ্যতা এখনও আমার হয়েছে কিনা। তবে আমি নিজের সবটুকু দিয়েই অভিনয় করার চেষ্টা করব।’

বর্তমানে চলচ্চিত্র ‘একজন কবির মৃত্যু’ নিয়ে বেশ আলোচনায় আছেন তরুণ প্রজন্মের আরেক চিত্রনায়িকা আইরিন। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আবেগের জায়গা। যে সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আজ স্বাধীনভাবে দেশে বসবাস করতে পারছি। যে স্বাধীনতার জন্য আমাদের ভাই-বোনদের রক্ত দিতে হয়েছে সেই ইতিহাস বা তার ওপর নির্মিত ছবিই নয়, তথ্যচিত্রেও কাজ করতে আগ্রহী আমি।’ একই সঙ্গে এ ধরনের ছবিতে অভিনয় করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্রের তরুণ নায়ক সাইমন সাদিক। তিনি বলেন, ‘চাষী নজরুল ইসলাস স্যারের ওরা ১১জন দেখেই মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রতি আগ্রহ জেগেছে। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। এ ধরনের ছবিতে অভিনয় করলে অন্তত অভিনয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের কষ্টের দিনগুলো, তাদের সংগ্রামের বিষয়টি কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারব।’

চিত্রনায়ক নিরব ও বাপ্পী চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিতে অভিনয়ের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। নিরব বলেন, ‘সেই ছোটবেলা থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ছবি দেখে বড় হয়েছি। আমরা তো আর মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। ছবির মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধ আমার কাছে জীবন্ত হয়ে এসেছে। নিজেদের গর্বের ইতিহাসের এমন ঘটনা নিয়ে ছবির প্রস্তাব পেলে অবশ্যই করব। এ ধরনের ছবিতে কাজ করা মানেই নিজেদের ইতিহাসটাকে আরও কাছ থেকে অনুভব করা।’ বাপ্পী বলেন, ‘অনেক ছবিতেই তো অভিনয় করলাম। এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের গল্পনির্ভর ছবিতে অভিনয় করা হয়নি। তবে আগামীতে এমন একটি গল্পের ছবিতে অভিনয় করতে চাই। মুক্তিযুদ্ধ বা দেশপ্রেমের গল্পনির্ভর ছবিতে অভিনয়ের বেশ আগ্রহ আমার। এতে ইতিহাসের কাছকাছি থাকা যায়। দেশের প্রতি কিছুটা হলেও দায়িত্ব পালন হয়।’

এত গেল চলচ্চিত্রে তরুণ তুর্কিদের ইচ্ছার কথা। নাটকের তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরাও জানিয়েছেন মুক্তক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পে কাজ করা তাদের অন্যরকম অভিজ্ঞতার সঞ্চার করে। এ ধরনের গল্পে কাজ করতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তাদের। টিভি নাটকের অন্যতম পরিচিত মুখ মেহজাবিন চৌধুরী। যুদ্ধভিত্তিক নাটক বা সিনেমা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্পের নাটকে অভিনয় করা হয়নি। অনেক সময় প্রস্তাব এলেও শিডিউল জটিলতায় পড়ে হাতছাড়া করতে হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের গল্পের চরিত্রগুলোতে আমার আগ্রহ রয়েছে।

আমিও চাই মুক্তিযুদ্ধের আসল চিত্র ফুটে ওঠে এমন নাটকে অভিনয় করব। তবে মুক্তিযুদ্ধের অনেক নাটক ও ছবি দেখেছি। সেসব দেখে মনে হয়েছে কাজগুলো করা একটু কঠিন। তবে আমি করতে চাই।’ অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পের নাটকের পাশাপাশি বেশ কয়েক ছবিতে অভিনয় করেছেন অপর্ণা ঘোষ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্পের প্রতি আমার অন্যরকম দুর্বলতা। আমি খুব লাকি যে ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বেশ কয়েকটি ছবি ও নাটকে অভিনয় করেছি। এ ধরনের গল্পে অভিনয় করতে এসে একাত্তরের দিনগুলোর অনেক ভয়াবহতার চিত্র মনে হয় সামনে থেকে দেখছি। আগামীতেও এ ধরনের গল্পে অভিনয় করার আগ্রহ থাকবে।’ একই সঙ্গে এ প্রজন্মের টিভি পর্দার আলোচিত মুখ জোবান, তৌসিফ, সিয়াম, সাফা কবির, টয়া, শার্লিন সবাই এ ধরনের গল্পের নাটকে অভিনয়ের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন।