ভারতীয় মুসলিমরা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হত্যা-নির্যাতনে মোদির হস্তক্ষেপ চায়

0
241

আবুল কালাম, ঢাকা থেকেঃ বাংলাদেশে ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মোদির কাছে দাবি ভারতীয় মুসলিমদের। সম্প্রতি সংখ্যালঘু হিন্দ সম্প্রাদয়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ভারত সরকারকে সক্রিয় হতে বলেছেন দেশটির দুটি মুসলিম সংগঠন। গত কয়েকদিনে পুরোহিত ও সেবক হত্যাকান্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গত মঙ্গলবার ভারতের আসাম রাজ্যের জামিয়া ইসলামিয়া খানক্কায়ে মদনি ও কাছাড় মুসলিম যুব প্রজন্ম দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে নৃশংস হত্যাকান্ড বন্ধের জন্য শেখ হাসিানার সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির কাছে দাবিড় জানান ।

উত্তর পূর্ব ভারতের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক যুগশঙ্খ বুধবার এখরব গিয়েছে।
পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাছাড় মুসলিম যুব প্রজন্মের নেতা নাজির হুসেইন মজুমদার, বাহারুল ইসলাম বড়ভূঁইয়া, শাবানা আহমদ মজুমদার, জিয়াউর রহমান, জাকারিয়া আহমদ বড়ভূঁইয়া বাংলাদেশে সম্প্রতি হিন্দু পুরোহিত ও সেবক হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়েছেন। তারা শিগগিরই নৃশংস হত্যাকান্ড বন্ধের জন্য বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুষ্টি আর্কষন করে।

এসব ঘটনা তীব্র নিন্দা জানিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা আহমদ সায়ীদ গবীন্দপুরী জানিয়েছেন, বাঙালি রাষ্ট্র বাংলাদেশের হিন্দু মুসলিম সবাই বাঙালি। অথচ দেশটির এক বাঙালির ওপর আরেক বাঙালির আক্রমন কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মেনে নিতে পারেন না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান ঘটনা প্রবাহ তাদের অভ্যন্তরীণ হলেও আমরা ভারত সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার রক্ষার নিয়ম অনুযায়ী ভারত সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করুক।
যুগশঙ্গের প্রতিবেদন বলা হয় , আসামের পূর্ব গোবিন্দপুরের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া খানক্কায়ে মদিনাতে রমজান মাস উপলক্ষে চলছে খানক্কা। এর মধ্যেই বাংলাদেশের হিন্দু সম্পাদ্রায়ের নাগরিকদের ওপর একের পর এক হত্যাকান্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আহমদ সায়ীদ এসব হত্যাকান্ডের অবিলম্বে বন্ধে বিশেষ দোয়াও করেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে সোমবার ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদসগ বেশ কয়েকটি হিন্দু সংগঠন। তারা সংখ্যালঘু হত্যাকান্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদির হন্তক্ষেপ দাবি করেচেন। এ ঘটনার একদিন পর ভারতের দু’টি মুসলিম সংগঠন বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদ জানালো ।

ভারতে হিন্দু শরণীদের নাগরিকত্ব দিলে বিরুপ প্রভাবের আশক্ষা ।

শরণার্থী হিন্দুদের পাকাপাকি আশ্রয় এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রতিবেশী বাংলাদেশের সংখ্যালগু সম্প্রাদায়ের ওপর বিরুপ প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের বিভিন্ন পেশার মানুষজাতের অনেকেরই ধারনা এমনই । তারাঁ মনে করেন, এত দিন যা ছিল অনুচ্চারিত সত্য, তা ঢাকঢোল পিটেয়ে ঘোষনা করাটা খুব বিবেচকের কাজ নয়। এর ফলে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাম্প্রাদায়ের শক্তি যেমন উৎসাহিত হবে, তেমন শন্কিত হবে সেখানের হিন্দুরা।

ভারতের প্রধানমস্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসক দক্ষিনপন্থী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষস্থানীয় নেতারা নির্বাচনের আগে থেকেই তাদের শরণার্থী নীতি নিয়ে অত্যন্ত সরব। নীতিটা হলো, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান সহ পৃথীবীর যেকোনো দেশ থেকে ভারতের চলে আসা হিন্দুদের শুধু থাকতে দেওয়া হবে না, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এ জন্য ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন করা হচ্ছে। বদলানো ১৯২০ সালের পাসর্পোট আইন এবং ১৯৪৬ সালের বিদেশি আইনও । আপাতত ঠিক হয়েছে, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর মধ্যে যেসব হিন্দু ভারতের চলে এসেছেন তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। চলতি ১৫ আগস্টের মধ্যেই সরকার এই কাজ শেষ করতে চায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এতে কমবেশি প্রায় দুই লাক্ষ হিন্দু নাগরিক্তব পাবেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ১ জুন প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ভারতেহ আসা সংখ্যা লঘূ শরণার্থীদের সুযোগ সুবিধা বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান , উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র কর্ণাটক, অন্ধ্র প্রদেশ, ও হরিয়ানায় ২৬ টি শরণার্থী শিবির প্রতিষ্ঠার করার উদ্যেগ নিয়েছে কেন্দ্রয়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রালয়।

এ সিদ্ধান্তের রুপায়ণ ও প্রধানত আসাম-বাংলাদেশ সীমান্তে কাটা তারের বেড়া দেয়া অসমাপ্ত কাজ ত্বরান্বিত করতে সরকারের বাড়তি উদ্যোগকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে সংশয় দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি হিন্দুরা নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রাদয়ের সংগঠনগুলোও শন্কিত হয়ে পড়ছে। তারা সরকারের কাছে জীবন ও সম্পতির নিরাপত্তা দাবি করছে। ভারতের বিভিন্ন পেশার মানুষজনের কাছে মনে তাই প্রশ্ন উঠেছে। ভারত সরকারের শরণার্থী নীতি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে সংখ্যাগুলোতে আরও শন্কিত করে তুলছে কী না।

ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন মহাপরিচালক অলক বনসল মনে করেন, ভারতের এই উদ্বান্ত হতে যেমন উৎসাহিত করা হবে। তেমনই প্রতিবেশী রাষ্ট্র গুলোর সাম্প্রাদয়ের শক্তিগুলোও প্ররোচিত হবে। অলক বনসর মনে করেন, বাংলাদেশের জনগনের একটা অংশ ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিতে সব সময় আগ্রহী। এই শক্তি এর ফলে অনর্থক আগ্রহী হবে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশন দেব মুখার্জি সমসাময়িক ঘটনাবলিতে বিশেষ চিন্তিত । তিনি বলেন,সরকার যেভাবে হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া এবং কাঁটাতারের বেড়া লাগানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে প্রচার করছে তা সমীচীন নয় বলে মনে করি। তা ছাড়া ধর্মের ভিত্তিতে এভাবে হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি সংবিধানের পরিপন্থি কি না, সেটা খতিয়ে দেখা উচিৎ। সাবেক এই হাই কমিশন বলেন বাংলাদেশের হিন্দুদের একটা সমস্যা আছে। সাতচল্লিস সালে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের সংখ্যা ছিল ২৭ শতাংশ, একাত্তর সালে বাংলাদেশের পত্তনের সময় ১৩ শতাংশ, এখন এসে দাড়িয়েছে। হিন্দুদের এই দেশত্যাগ একটা ধারাবাহিকতা সমস্যা। তারঁ কথায় – নাগরিকত্ব দান দিয়ে সরকারের নীতি যত বেশী প্রচার পাবে। যতই দেশত্যাগী হিন্দুদের সাদরে গ্রহন করার কথা জানানো হবে। ততই কিন্তু বিদেশীদের হিন্দুদের চলে আসতে উৎসাহ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী মেজর চন্দ্রাকান্ত সিং সরকারের এই প্রচারে যথেষ্ট ক্ষুদ্ধ। ইন্ডিয়ান ওয়ার ভেটারেন্স অ্যাসোসিয়েশনের এই প্রতিষ্ঠাতা ট্রাষ্টি ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে শেখ মজিবুর রহমানকে ঢাকা বিমানবন্দরে স্বাগত জানিয়েছিলেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, নীতিপ্রণেতাদের বোঝা উচিৎ কোনটা প্রচার করা দরকার । এ ক্ষেত্রে সরকারি ঢাক পিটিয়ে প্রচার করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের হিন্দুদের আরও সংকুচিত করে দেবে। তাদের ভারতে পাঠিয়ে যারা জমি দখলে আগ্রহী, তারা উৎসাহিত হবে। এই প্রচারের তাই কোনো প্রয়োজনেই নেই। অবসর মেজর চন্দ্রকান্ত বলেন, পাকিস্তানের হিন্দুরা তো সে দেশের তৃতীয় শ্রেনীর নাগরিক। তদের প্রতিদিন যেভাবে অত্যাচারি হতে হয় তা অমানবিক। সরকারের এই নীতি তাদের মনোবল একেবারে ভেঙে দেবে। আমি এই প্রচারকে একেবারেই সমর্ধন করি না।

মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ফর এশিয়ান স্টাডিজের মহাপরিচালক শ্রীরাধা দত্তের অভিমত অবশ্য কিছুটা আলাদা। তিনি মনে করেন, আগের তুলনায় বর্তমানে সময়ের পার্থক্য একটাই আগে এ ধরনের নীতি এত ঘোষিত ছিল না। এখন রাজনৈতিক কারনেই প্রবলভাবে ঘোষিত। ভারত চিরকালই হিন্দুদের কোল পেতে দিয়েছে । অহিন্দু শরণার্থীদের জায়গা দিয়েছে । শ্রীরাধা মনে করেন , ভারতের শাসক দল ও সরকারের এই নাগরিকত্ব নীতির সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হিন্দু নীধরনের কোনো সর্ম্পক নেই । এটা অন্য সমস্যা । তা ছাড়া আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে – নিজের দেশ সহজে কেউ ছাড়তে চায় না।
দেব মুখার্জি আরও একটি বিষয় ওপর জোর দিয়ে বলেন ,বাংলাদেশের ও পাকিস্তানের হিন্দুদের প্রতিষ্ঠানের লড়াই সব সময় চালিত যেতে হয়। খুবই প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে তাদের এই লড়াই চালাতে হয়। বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতির স্বার্থে যা করছে, তাতে এই লড়াইয়ের মানসিক নষ্ট হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here