বিরোধী প্রার্থী সিসির হাতের পুতুল

0
56

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: রাত পোহালেই সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনের এ নির্বাচনে মিসরীয়রা তাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। আরব দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার এ দেশটিতে প্রায় ৬ কোটি নিবন্ধিত ভোটার রয়েছে। তবে বিপুল সংখ্যক এ ভোটারের সামনে রয়েছে মাত্র দু’জন প্রার্থী।

দ্বিতীয়বারের জন্য প্রার্থী হয়েছেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। নির্বাচনের অপর প্রার্থী মুসা মোস্তফা মুসা। তাকে সিসির হাতের পুতুল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ নির্বাচনে আগামী চার বছরের জন্য সিসির জয় অনেকটা নিশ্চিত।

এ নির্বাচনে যারাই প্রার্থী হতে চেয়েছেন, ছলে-বলে-কৌশলে তাদেরকে সরিয়ে দিয়েছেন মিসরের সাবেক সেনাপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া সিসি। এমনকি স্বল্প পরিচিত কোনো প্রার্থীকেও। ৬৩ বছর বয়সী সিসির একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাত্র দু’মাস আগে দৃশ্যপটে হাজির হন ৬৫ বছর বয়সী মিসরীয় রাজনীতিক মুসা মোস্তফা।

নির্বাচন যাতে ‘মাত্র একটি ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা’ না হয়ে যায় তাই মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ২৯ জানুয়ারি প্রার্থিতার ঘোষণা করেন তিনি। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই সিসি যেখানে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে জনসম্মুখেই দেখা যাচ্ছে না মুসাকে। তিনি যে আদৌ সিসির বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, রাজধানী কায়রোর কোথাও তেমন কোনো চিহ্নও নেই।

এএফপি জানায়, প্রচারণার লক্ষ্যে নিয়মিত টিভি ও পত্রপত্রিকায় হাজির হচ্ছেন সিসি। মিসরের শহরগুলো বিশেষ করে রাজধানী কায়রো সিসির পোস্টার-ব্যানারে সয়লাব। তবে মুসাকে সমর্থন করে পোস্টারের ছিটেফোঁটাও চোখে পড়েনি শহরগুলোতে। আলজাজিরা জানায়, নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার আগ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সিসিকেই সমর্থন জানিয়েছিলেন মিসরের ঘাদ পার্টির নেতা মুসা।

এমনকি সিসিকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করতে যা যা করা প্রয়োজন তার সবই করেছিলেন তিনি। তার মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার ঘটনাকে আজব ব্যাপার হিসেবে দেখছে খোদ তার নিজের দল ঘাট পার্টি। পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, সিসিই মুসাকে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করেছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে সিসি বলেছেন, তিনি চেয়েছিলেন, নির্বাচনে অনেক প্রার্থী থাকুক।

মুসা বলেছেন, অন্য সব প্রার্থী নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নেয়ায় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘জয়ী হতেই অবাধ ও মুক্ত এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি আমি।’ মিসরের নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোট হবে অবাধ ও মুক্ত। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাজানো এ নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য এরই মধ্যে জয় নিশ্চিত করে ফেলেছেন সিসি। কারণ এ নির্বাচনের সাতজন শক্ত প্রার্থী নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ছলে-বলে-কৌশলে নির্বাচন থেকে তাদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ভোটের ফলাফল যাই হোক প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসিই যে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন এটা সর্বজনবিদিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনে সিসির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বামপন্থী রাজনীতিক হামদান সাবাহি।

মুসা মোস্তফার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত ও জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। তারপরও ৯৬.৯ শতাংশ ভোটে জয়ী হন সিসি। জেনারেল সিসি যে বিপুল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন এখন তার সে জনপ্রিয়তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। মিসরের বিভিন্ন ধারার মানুষ সে নির্বাচনে তাকে সমর্থন জুগিয়েছিল।

মিসরের ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট ব্রাদারহুড সমর্থিত মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করায় তার প্রতি উদার মনোভাবাপন্ন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষের সমর্থন ছিল। তবে গত পাঁচ বছরে মিসরের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিই জনসম্মুখে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি সিসি। উপরন্তু এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ যাতে কথা না বলতে পারে সে ব্যবস্থা তিনি সুচারুভাবেই সম্পন্ন করেছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই নির্বাচনে জয়লাভের পর সিসি ও তার সমর্থকরা মিসরের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির দোহাই দিয়ে সংবিধান থেকে প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের ক্ষমতায় থাকার বিধান তুলে দিয়ে আরও পাকাপোক্ত ও চিরস্থায়ী ব্যবস্থার দিকে যেতে পারেন। সিসি নিজে কোনো নির্বাচনী প্রচারে অংশ না নিলেও সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো তার স্বরে গণতন্ত্রের জয়গান গাইছে। জনগণকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে।

মিসরে গণঅভ্যুত্থানের সাত বছর

চলতি বছর মিসরে গণঅভ্যুত্থানের সাত বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১১ সালের প্রথমদিকের ওই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই সময়ের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ২০১২ সালে প্রথম কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। কিন্তু এক বছরের মাথায় আবারও স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে দেশটির জনগণ। গণঅভ্যুত্থানের পূর্বাপর উল্লেখযোগ্য ঘটনা:

২০১১ : হোসনি মোবারকের পতন-

২৫ জানুয়ারি : তিউনিসিয়ার বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হয়ে মোবারকের শাসনের অবসান চেয়ে কায়রোর রাস্তায় হাজার মিসরীয়র বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।

২৮ জানুয়ারি : মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ কেটে দেয় সরকার। দেশজুড়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বিক্ষোভকারীদের। অনেকগুলো থানায় হামলা। রাস্তা থেকে নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার। মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন মোবারক। মোতায়েন করেন সেনাবাহিনী।

১১ ফেব্রুয়ারি : কায়রোর বিখ্যাত তাহরির স্কয়ারে কয়েক দিনের বিরামহীন বিক্ষোভের মাঝে মোবারকের নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেইমান এক ঘোষণায় জানান, পদত্যাগ করেছেন প্রেসিডেন্ট মোবারক। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী।

২০১২ : প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে নির্বাচিত মুরসি-

৩০ জুন : ৫১.৭ শতাংশ ভোটে জয়ী মোহাম্মদ মুরসি।

১২ আগস্ট : মিসরের সিনাই উপদ্বীপে জঙ্গিদের হাতে সেনা হত্যাকাণ্ড। সেনাদের দাফন অনুষ্ঠানে মুরসির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত করে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসিকে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ।

জুলাই ২০১৩ : সেনাঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসির নিয়োগ সেনাপ্রধান সিসিই মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি করেন।

১৪ আগস্ট : কায়রোয় মুরসির মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ। বিক্ষোভকারীদের দুটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেয় পুলিশ। কয়েক ঘণ্টার অভিযানে হত্যা করা হয় প্রায় ৭০০ জন বিক্ষোভকারীকে।

২০১৪ : প্রেসিডেন্ট হলেন সিসি-

৮ জুন ২০১৪ : সাজানো নির্বাচনে ৯৬.৯ শতাংশ ভোটে নির্বাচিত হন সিসি।

২৪ মার্চ ২০১৭ : বিক্ষোভকারীদের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকা ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তিন বছর সাজা ভোগের পর মুক্তি দেয়া হয় মোবারককে।