বিতর্ক এড়াতেই রোডম্যাপ প্রণয়নে সময় নিচ্ছে ইসি

0
80
untitled-2_286233ঢাকা: একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সব ধরনের বিতর্ক এড়িয়ে চলার কৌশল নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ কারণেই নির্বাচনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে আরও সময় নেওয়া হচ্ছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। সরকারি দলের পক্ষ থেকে ই-ভোটিংয়ের পক্ষে মত দেওয়া হলেও বিএনপি ও তাদের শরিক দলগুলো এর বিরোধিতা করে আসছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থানের কারণেই কমিশন বিষয়টি এখন সামনে আনতে চাইছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে সব ধরনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ইসি। এ জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও পাওয়া গেছে। এসব নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের আগে কিছু নির্বাচনী আইন সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। তাই পরিস্থিতি বুঝে রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে আরও সময় নিতে চাচ্ছে কমিশন। এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ২৮ মার্চ কমিশন সভায় ইভিএম নিয়ে ইসি সচিবালয়ের একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হলেও তা ফেরত পাঠানো হয়েছে। কমিশনের সদস্যরা এর পক্ষে-বিপক্ষে কোনো মত না দিয়ে বলেছেন, ইভিএম নিয়ে আরও জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি কার্যালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ সমকালকে বলেন, খসড়া রোডম্যাপ তৈরি করে ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় উত্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। নানা বিবেচনায় রোডম্যাপ তৈরিতে আরও কিছু সময় নেওয়া হচ্ছে। কমিশনের নির্দেশেই সবকিছু করা হচ্ছে। ইভিএম ব্যবহারের প্রস্তাবনাও ফেরত পাঠানোর কথা স্বীকার করেন তিনি। এর আগে ইসি সচিব জানিয়েছিলেন, ২৮ মার্চের কমিশন সভায় রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হতে পারে।

সবার আস্থা অর্জনের চেষ্টায় ইসি :একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিজেদের নিরপেক্ষতা প্রমাণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে বড় ধরনের কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না বলে অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গেছেন কমিশন সদস্যরা। সরকারের পক্ষ থেকে ইসিকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে সব ধরনের নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করার মাধ্যমেই নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনমুখী করতে চায় ইসি। গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সিইসি কে. এম. নুরুল হুদা বলে আসছেন, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তিনি নিশ্চিত করবেন।

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল সিইসির সঙ্গে বৈঠক করে। ওই বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র জানায়, কুমিল্লার নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দল কমিশনে গেলেও সেখানে সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা হয়েছে।

ইসিকে বিতর্কমুক্ত রাখতে সরকার ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও কমিশন সচিবালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার মতে, আওয়ামী লীগ আপাতত কোনো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত এবং মাঠের প্রতিপক্ষ বিএনপির হাতে কোনো ইস্যু তৈরি করে দিতে চায় না। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন সুষ্ঠু করার বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে কমিশন সচিবালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়। একই সঙ্গে সরকারি দলের প্রার্থী বা তার পক্ষে কেউ যাতে নির্বাচনে অবৈধ প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ সমকালকে বলেন, সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কে ফেলানোর মতো পদক্ষেপ সরকারি দল থেকে নেওয়া হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রমাণের জন্য আগামী সংসদ নির্বাচনের আগের সব নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। এর আগে অনুষ্ঠিত রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুর সিটির নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়েছিল। এসব নির্বাচনে রংপুর ছাড়া বাকি সবক’টিতে বিএনপির প্রার্থীরা জয় পান। তবে সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সীমাহীন অনিয়ম ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। একই ধরনের অভিযোগ ওঠে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন নিয়েও।

সর্বশেষ অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও গাইবান্ধা-১ আসনের উপনির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এ দুটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। জামায়াত অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত গাইবান্ধা-১ আসনের উপনির্বাচনে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম হলেও তেমন কোনো অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি। সরকারি দলের একাধিক দায়িত্বশীল নেতার মতে, ভবিষ্যতে সব নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ একই কৌশল গ্রহণ করবে। অর্থাৎ নিজেদের প্রার্থী জিতলে খুবই ভালো, হারলে ক্ষতি নেই।

রোডম্যাপে থাকছে সংলাপ :একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে একটি কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ তৈরি করছেন ইসি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। রোডম্যাপ তৈরির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী আইন সংস্কার ও ই-ভোটিং চালুসহ বেশকিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চায় ইসি। এসব বিষয় সমন্বয় করেই রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হবে।

২১টি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক খসড়া রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন-বিধিমালা সংশোধন করে তা চূড়ান্ত করা হবে এবং এ বিষয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here