বাংলা চলচ্চিত্রের আজকাল

0
266

8বিনোদন ডেস্ক: বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলী, বিপণন ও প্রদর্শনী ব্যবস্থা-সব ক্ষেত্রেই এখন চরম দুরবস্থা বিরাজ করছে। চলচ্চিত্রে সংকটময় এ পরিস্থিতির জন্য সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকে দায়ী করা যায়। চলচ্চিত্র নির্মাণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়েনি। সুযোগ-সুবিধাও বাড়েনি। ক্রমেই বাংলা সিনেমার মান নিম্নগামী হচ্ছে। যেসব ছবি তৈরি হচ্ছে, তার গল্পে কোনো চমক বা বৈচিত্র্য থাকছে না। এসব ছবি টিভি ফিল্ম কিংবা সাধারণ নাটকের চেয়েও দুর্বল মানের। কেবল দর্শকদের সঙ্গে তামাশা করতে এসব ছবি তৈরি করছেন কতিপয় চিত্রনির্মাতা। দর্শকদের যতটা বোকা ভাবছেন আজকের চলচ্চিত্র নির্মাতারা, আসলে তারা ততটা বোকা নন। দর্শকদের এখন সহজে ধোঁকা দেয়া কিংবা বোকা বানানো সম্ভব নয়।

বর্তমানে আমাদের দেশে মূলধারার বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি ভিন্নধারার চলচ্চিত্রও তৈরি করছেন অনেক নির্মাতা। দুঃখজনক হলেও বলতে হয়, কোনো ধারার চলচ্চিত্রই এখন দর্শকদের আগের মতো মন ভরাতে পারছে না। ভদ্র, শিক্ষিত, রুচিশীল দর্শক ঢালিউডের তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবি দেখা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক আগে। আজকাল সাধারণ শ্রেণীর দর্শকও বাংলাদেশের সিনেমা দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। গত কয়েক বছর ধরে মুক্তিপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক ছবির অধিকাংশই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে।

বাংলা চলচ্চিত্রের অবস্থা কেমন? এ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত সবারই জানা। ভাল নয়। দেশের সিনেমা হলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশে ১ হাজার ২শ’ সিনেমা হলের মধ্যে এখন রয়েছে মাত্র ৪শ’টি। কোন কোন জেলা শহরে এখন আর সিনেমা হলই নেই। যে শহরে ৫টি ছিল সেখানে এখন মাত্র একটি সিনেমা হল।

‘চলচ্চিত্র শুধু আর্ট নয় ইন্ডাস্ট্রিও’। তাই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে হলে, এই শিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে হলে ক্রিকেট, ফুটবল এবং গার্মেন্টস খাতের মতই প্রণোদনা প্রয়োজন। তা না হলে আকাশ সংস্কৃতি ও বিদেশি সিনেমার চাপে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ধ্বংস অনিবার্য। তবে বর্তমান সরকার আসার পরে চলচ্চিত্র শিল্প উন্নয়নে কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে। খুব দ্রুতই এসব উদ্যোগের সুফল পাবে বলে আশা করছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা।

অনেকের মতে, দেশে ভালো চলচ্চিত্রের দর্শক আছে কিন্তু মানসম্পন্ন ছবির অভাবে দর্শকরা হলে আসছেন না। এর পাশাপাশি রয়েছে অশ্লীল ছবির দৌরাত্ম্য। শাকিব খানসহ হাতে গোনা দুই-একজন নায়িকা ছাড়া একটি সিনেমার লগ্নি তুলে আনার মত কোন শিল্পী বর্তমানে নেই। অথচ পাকিস্তান আমলে তো বটেই বাংলাদেশ হওয়ার পরেও বেশ কয়েকজন নায়ক-নায়িকা ছিলেন, যারা একটি সিনেমাকে ব্যবসা সফল করার ক্ষমতা রাখতেন। কিন্তু এখন সেই ইন্ডাস্ট্রি একেবারেই ধসে গেছে। টিভিতে প্রচুর লগ্নি হচ্ছে, অনেক শিল্পী, কলাকুশলী টিভিতে নিজের ক্যারিয়ার করছেন, কিন্তু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে শিল্পী, কলাকুশলী, টেকনিশিয়ান আসছে না। বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সামগ্রিক অবস্থা একেবারেই ভালো নয়।

পনেরো-বিশ বছর আগেও ১০ কোটি টাকা লগ্নি করে তা ফেরত আনতে পারতেন প্রযোজকরা। এখন বাংলা সিনেমার গড় বাজেট দাঁড়িয়েছে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা বা তারচেয়েও কম। পরিচালকের একাংশ সিনেমা হলগুলোর পরিবেশকে দুষছেন। ভালো পরিবেশ না থাকায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী সিনেমা দেখতে যেতে চাইছে না।

অথচ কী গৌরবময় যাত্রাই না শুরু হয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের। একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা এসে মোহিত করেছে দর্শকদের। ভারত পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার পরে বাংলাদেশের হলগুলোতে ভারতীয় বাংলা সিনেমা দেখানো হতো। দেখানো হতো হিন্দি ও উর্দু সিনেমা। কিন্তু সেসব সিনেমা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিকাশে।

সম্প্রতি গুণী নির্মাতা অমিতাভ রেজা পরিচালিত আয়নাবাজি ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রে রেকর্ড গড়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের নড়বড়ে খুটি শক্ত করার প্রয়াস যুগিয়েছে এই ছবিটি। বিনোদন অঙ্গনের অনেকেরই মন্তব্য, বাংলা চলচ্চিত্রের সম্ভাবনাময় এই সময়টিতে এমন একটি চলচ্চিত্র দেখার জন্য দর্শক মহল দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে। সেই সঙ্গে সবাই বাংলা চলচ্চিত্রের অগ্রগতির ভাবধারা অপরিবর্তীত থাকবে বলেও মনে করছের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট গুণী ব্যক্তিবর্গরা।
আয়নাবাজি চলচ্চিত্রটি দেখে দর্শকরা একটু হলেও বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতি নাক সিটকানো ভাবটি দূর করতে সক্ষম হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় দর্শকসহ বিনোদন অঙ্গনের সবাই আশাবাদী বাংলা চলচ্চিত্রের এই মোড় নিয়ে। কয়েক বছর ধরে ডিজিটাল সিনেমার নামে যেসব ছবি নির্মাণ হয়ে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে, সেগুলো না হচ্ছে ঘরকা না ঘাটকা।

হলিউড-বলিউড-টালিউডের আধুনিক ও উন্নত মানের বিনোদনধর্মী এবং শিল্পশোভন রুচিশীল চলচ্চিত্র দেখে অভ্যস্ত দর্শক ইদানীংকার ঢালিউডি তথাকথিত ডিজিটাল সিনেমার নামে নির্মিত দুর্বল কাহিনীর যাচ্ছেতাই মানের কম বাজেটের ছবিগুলো দেখে তাচ্ছিল্য ভরা হাসি হাসছেন। বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র শিল্প যেখানে নানা বৈচিত্র্যে আর চমকে পরিপূর্ণ হয়ে বিনোদনের ভিন্নমাত্রা নিয়ে দর্শকদের আন্দোলিত, চমকিত ও শিহরিত করছে। সেখানে বাংলাদেশের তথাকথিত ডিজিটাল সিনেমা দর্শকদের কেবলই প্রতারিত করছে। প্রত্যাশিত বিনোদন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। এখন দর্শক বাংলাদেশের ছবি দেখতে গিয়ে হতাশ হয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বাড়ি ফিরছেন। বিশ্বায়ন আর আকাশ সংস্কৃতির যুগে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে এখন থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।

অন্যদিকে বর্তমানে নতুনভাবে বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশে যৌথ প্রযোজনার নামে চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইদানীং যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু চলচ্চিত্রের উন্নয়নের দোহাই দিয়ে নামকাওয়াস্তে যৌথ প্রযোজনায় ছবি বানানোর ঘোর বিরোধী বিনোদন অঙ্গনের অনেক কলাকুশলী সহ নির্মাতারাও। তাদের অনেকেরই মন্তব্য যৌথ প্রযোজনার নামে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের সঙ্গে যৌথ প্রতারণা করা হচ্ছে। যদিও ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ শুরু হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রথম ছবিটি ছিল আলমগীর কবিরের পরিচালনায় “ধীরে বহে মেঘনা”। একই বছর ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত “তিতাস একটি নদীর নাম” ছবিটি মুক্তি পায়। শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়।

১৯৮৩ সালে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—তিন দেশের প্রযোজনায় “দূরদেশ” ছবিটি নির্মিত হয়। এর পরও যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মিত হতে থাকে। তবে সে সময় কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলতে হতো। কিন্তু বছর তিনেক আগে যৌথ প্রযোজনার ছবির ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম করা হয়। এখনকার ছবিগুলোতে ঠিকমতো সেই নিয়মও মানা হচ্ছে না। আর তাই ঢাকাই চলচ্চিত্রের এখনকার যৌথ প্রযোজনার ছবি নিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত বিনোদন অঙ্গনের গুণী ব্যক্তিবর্গরা।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রের অবস্থা ও অবস্থান শৈল্পিক ও কাহিনি নির্ভর হলে তা নতুন প্রজন্মকে ভাবাবে। রোমানরা যেমন গ্রিক সভ্যতাকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিল, অ্যাসেরীয়রাও একই ধরনের ভূমিকা পালন করেছিল ব্যাবিলনীয় সভ্যতা বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলা চলচ্চিত্রেরও জয় হবে একদিন-নিশ্চয়!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here