বাংলাদেশ কি আইসিসের পরবর্তী উর্বরভূমি হয়ে উঠছে?

0
242

imagesবাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে উগ্রপন্থীদের হামলা ও হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানা আলোচনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো বাংলাদেশে উগ্রপন্থীদের হামলার ওপর বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ দেশে উগ্রপন্থা নিয়ে সিএনএনর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি রবি আগরওয়ালও একটি প্রতিবেদন লিখেছেন। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অনেক বিষয় আছে। দেশটির অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। যুবসমাজ সমৃদ্ধ জনসংখ্যার এ দেশে রয়েছে গণতন্ত্র। আশীর্বাদ হিসেবে আছে উর্বর জমি। এ দেশটিতে প্রায় ১৫ কোটি মুসলিম। সাম্প্রতিক সময়ের পূর্ব পর্যন্ত এটি ছিল উগ্রপন্থার বাইরে। উগ্রপন্থা বাকি বিশ্বে মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এ েেত্রও বাংলাদেশে অশুভ ইঙ্গিত মিলছে। এখানেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে।

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্রমবর্ধমান নৃশংস হত্যাকাণ্ড দণি এশিয়ার এ দেশটিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথম দিকে হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি পরিষ্কার ধরন ছিল। সে সময় রাজধানী ঢাকায় সুপরিচিত ধর্মনিরপে লেখকদের টার্গেট করা হয়। ওই হামলাগুলো দৃশ্যত ইসলামের সমালোচকদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য করা হয়েছিল। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৪ সালে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এক মার্কিন লেখক অভিজিৎ রায়। তাকে ঢাকায় অমর একুশে গ্রন্থমেলার বাইরে হত্যা করা হয়। এরপর এ বছর এপ্রিলে নিজের বাসায় হত্যা করা হয় একজন সুপরিচিত এলজিবিটি অধিকারকর্মী ও তার বন্ধুকে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ হামলা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘন ঘন এমন হামলা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর থেকে শুরু করে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, এমনকি সুফি মুসলিমদের মধ্যেও টার্গেট করা হয়েছে। এ যাবৎ এমন হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৪০।

আইসিসের হাত?
নৃশংস এসব হত্যায় একটি সম্পর্ক আছে। তাহলো চাপাতি দিয়ে হত্যা। কিন্তু প্রশ্ন হলো এসব হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা কে? নিজস্ব মিডিয়ার মাধ্যমে এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগের দায় স্বীকার করেছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইসিস)। কিন্তু দেশে কোনো আইসিসের উপস্থিতি নেই বলে অব্যাহতভাবে দাবি করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। অন্য হামলাগুলোর দায় স্বীকার করেছে স্থানীয় ইসলামপন্থী গ্রুপগুলো। পুলিশ বলেছে, এসব হামলার বেশির ভাগের জন্য দায়ী নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামি গ্রুপ জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ বা জেএমবির সদস্যরা। এমন দাবির পে সুস্পষ্ট সর্বসম্মতি মেলেনি। এমনকি এ অঞ্চলের সন্ত্রাস বিষয়ে যেসব বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ করেন তাদের কাছ থেকেও এ দাবির সত্যতা মেলেনি। সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টালের নির্বাহী পরিচালক অজয় সাহনি বলেছেন, প্রকাশ্য স্থানে কাউকে হত্যা করতে যাবে না আইসিস। হয়তো কিছু হামলার দায় আইসিস সংশ্লিষ্ট মিডিয়া স্বীকার করতে পারে এ জন্য যে, তারা তাদের গ্রুপকে বড় করে দেখাতে চায়। তারা বিশ্বব্যাপী তাদের বিস্তার চায়। কিন্তু যদি আইসিস এসব হামলায় জড়িত হতো তাহলে তাদের আসল অস্ত্র কোথায়? তাদের প্রশিতি ও যুদ্ধ-

মনোভাবাপন্ন যোদ্ধারা কোথায়?
কিন্তু এশিয়া-প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের সন্ত্রাসবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাজ্জান গোহেল বলেছেন, জেএমবিকে এখন আইসিসের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি বলেন, জেএমবি বিদেশী, প্রফেসর ও শিাবিদদের টার্গেট করেছে। অন্য দিকে স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ আনসারুল্লা বাংলা টিম বা এবিটি বেশির ভাগই টার্গেট করেছে ব্লগার ও নাস্তিকদের। গোহেল আনসারুল বাংলা টিমকে দেখছেন সম্প্রতি চালু হওয়া আল কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্টের (একিউআইএস) ঘনিষ্ঠ হিসেবে।
যদি গোহেল সঠিক হন তাহলে বাংলাদেশ আইসিস ও আলকায়েদার মধ্যে প্রক্সি যুদ্ধেেত্র পরিণত হতে পারে অথবা এরই মধ্যে তা হয়ে গেছে। তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। তারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে তাদের অবস্থান পোক্ত করতে চায়। এ দেশটির সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। সাজ্জান গোহেল সম্প্রতি আইসিসের অনলাইন প্রচারণামূলক ম্যাগাজিন দাবিককে কু হিসেবে তুলে ধরে বলেন, আইসিস এতে বলেছে, তারা বাংলাদেশে আরো হাইপ্রোফাইল হামলা চালাতে চায়। যদিও বাংলাদেশ সরকার দেশটিতে আইসিসের অস্তিত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করার অবস্থানে রয়েছে।

রাজনীতি ও অঙ্গুলি নির্দেশনা
যদি আপনি সরকারকে জিজ্ঞেস করেন তাহলে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে পরিষ্কার উদ্দেশ্য আছে এবং এগুলো অপরাধীরা করেছে বলে বক্তব্য মিলবে। গত মাসে সিএনএন এর সাথে বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু কথা বলার সময় তিনি খোলাখুলিভাবে আঙ্গুল তোলেন বিরোধী দল বিএনপি ও তার মিত্র জামায়াতের দিকে। কিন্তু এ মাসের শুরুর দিকে তিনি যখন আবার সিএনএনের সাথে কথা বলেন, তখন তিনি বলেছেন, এর প্রযোজক হলো বিএনপি। পরিচালক জামায়াত। মাঠপর্যায়ে ছোট ছোট অভিনেতা হলো আনসারুল্লা বাংলা টিম, জেএমবি ও ইসলামপন্থী অন্যান্য নেটওয়ার্ক। আইসিসর এসব হামলার দায় স্বীকার করাকে তিনি মিথ্যা ও কল্পিত বলে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে এসব করছে বিএনপি।
তবে বিএনপির মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেছেন, আমরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আদর্শে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। সরকারের প্রধান ল্য হলো বিএনপিকে নিঃশ্বেষ করা। তারা (সরকার) চায় বাংলাদেশে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু বিএনপিকে ধ্বংস করা যাবে না।

রিজভির হিসাব অনুযায়ী হত্যাকাণ্ড বন্ধের নামে সরকার যে অভিযান চালিয়েছে তাতে চলতি জুনে বিএনপির ২ হাজার ৭ শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সব মিলেয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে ১৪ হাজারেরও বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এর মধ্যে মাত্র দুই-এক শ’ জঙ্গি। গত সপ্তাহে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এসব গ্রেফতারকে খেয়ালখুশি মতো বলে আখ্যায়িত করেছে এবং বলেছে, অপরাধের যথাযথ প্রমাণ ছাড়া এসব গ্রেফতার করা হয়েছে। হিউম্যান রাইট ওয়াচের তেজশ্রী থাপা বলেছেন, আপনি মাত্র ৫ দিনের মধ্যে ১৪,০০০ মানুষকে গ্রেফতার করতে পারেন না। এই গ্রেফতারকে বৈধও বলতে পারেন না।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

বাংলাদেশ নিয়ে যারা পর্যবেণ করেন তারা শুধু ব্যাপকভাবে মতার অপব্যবহার নিয়েই উদ্বিগ্ন নন, একই সাথে তারা দুর্বল হয়ে পড়া বিরোধী দলের প্রভাব নিয়েও শঙ্কিত। বাংলাদেশে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন উইলিয়াম বি মাইলাম। তিনি সম্প্রতি ঢাকা সফর করেন। তিনি বলেছেন, বিএনপি পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। তারা নিজেদের নির্দোষ ও সরকারকে দায়ী করেই তাদের সময় পার করছে। দুর্বল হয়ে পড়া বিরোধী দল দৃশ্যত একদলীয় ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়ার পথে অবদান রাখছে।