বাংলাদেশে সংখ্যালুঘুদের ওপর আক্রমণ ‘চরম কষ্টদায়ক ও দুর্ভাগ্যজনক’-সুষমা স্বরাজ

0
249

imagesঢাকা ডেস্ক: ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, সংখ্যালুঘুদের ওপর হামলায় বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার অবশ্য বসে নেই। তারা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে। গতকাল রোববার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তবে তিনি এও বলেন, বাংলাদেশে সংঘ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ ‘চরম কষ্টদায়ক ও দুর্ভাগ্যজনক’।

সরকারের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হঠাৎ বেড়ে যাওয়া আক্রমণ, রামকৃষ্ণ মিশনকে পাঠানো হুমকি-চিঠি, মোদি সরকারের হিন্দু-নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় সুষমাকে। তিস্তা-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে সমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার ফলে তিস্তা নিয়ে দেশে অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়ার কাজ এবার শুরু হবে।

বাংলাদেশে হিন্দুসহ অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ভারত বিশেষ উদ্বিগ্ন। ঢাকায় এক শ বছরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রামকৃষ্ণ মিশনকে হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এই চিঠি পাওয়ার পর দিল্লিতে ভারত সরকার নড়েচড়ে বসেছে। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর গভীর উদ্বেগের কথা সন্ন্যাসীদের জানান। নির্দেশ যার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ নিয়েই সুষমাকে একগাদা প্রশ্ন করা হয়। সব প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক প্রতিবেশীদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো। স্থলসীমান্ত চুক্তি, পালাটানা থেকে বিদ্যুৎ পাঠানোসহ বিভিন্ন চুক্তির পর সেই সম্পর্ক উত্তরোত্তর ভালো হচ্ছে। কিন্তু রামকৃষ্ণ মিশনকে হুমকি ও হিন্দুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা চরম কষ্টদায়ক ও দুর্ভাগ্যজনক। সুষমা বলেন, এসব ঘটনা নিয়ে সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সর্বোচ্চ স্তরে কথা বলছে।

এই মন্তব্যের পাশাপাশিই সুষমা স্বরাজ বলেন, বাংলাদেশ সরকার বসে নেই। তারা ইতিমধ্যে তিন হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করেছে। সুষমা বলেন, এর চেয়েও আনন্দের কথা, বাংলাদেশের এক লাখেরও বেশি ধর্মগুরু (মুফতি, আলেম, ওলামা) সই করে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছেন। প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা বলেছেন, ইসলামে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই। সুষমা বলেন, কোনো দেশের লক্ষাধিক ধর্মগুরুর এমন আচরণ নজিরবিহীন। এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশের সরকার যেমন এর বিরুদ্ধে, ইসলাম ধর্মগুরুরাও এই জঘন্য আচরণ সমর্থন করছেন না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাঁর সরকার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অত্যাচারিত ও দেশব্যাপী হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার যে নীতি নিয়েছে, তা বাংলাদেশের দুষ্কৃতিকারীদের হিন্দু নিপড়নে উৎসাহিত করছে কি না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর দেননি। তবে তিনি বলেন, যেসব হিন্দু অত্যাচারিত হয়ে ভারতে চলে এসেছেন, শুধু তাঁদেরই নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিস্তা প্রসঙ্গে সুষমা বলেন, ভারত, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তিনজনকেই এই বিষয়ে একমত হতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত দিন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। নির্বাচনে জিতে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য মূখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। আশা করা যায়, ভোট চুকে যাওয়া তিস্তা নিয়ে এখন পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ভারত সরকারের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা হতে দেরি হবে না।
নিরাপত্তা বাড়ানোয় ভারত কৃতজ্ঞ

ঢাকায় কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানোর পর রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশনের নিরাপত্তা জোরদার করায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে ভারত। সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশ চাইলে যেকোনো ধরনের সহযোগিতায় প্রস্তুত আছে বলেও জানিয়েছে দেশটি। গতকাল্য দুপুরে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা রামকৃষ্ণ মিশন পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন।

রামকৃষ্ণ মিশনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, বাংলাদেশের জনগনের নিরাপত্তা দিতে এখানকার কর্তৃপক্ষের সামর্থ্যের ব্যাপারে আমাদের পুরোপুরি আস্থা আছে। শুধু এখানেই নয়, বাংলাদেশ জুড়ে পরিচালিত ৪০ কেন্দ্রের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে স্বামীজি ও রামকৃষ্ণ মিশন কাজ করছে, সে ব্যাপারে আমাদের কোনো সংশয় নেই। মিশনের আশপাশে নিরাপত্তা এর চেয়ে ভালো হতে পারে না। পুরো ব্যবস্থা নিয়ে আমরা যথেষ্ট সন্তুষ্টি। একজন দর্শনার্থী হওয়ার পরও বলতে পারি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলে মনে হচ্ছে।

রামকৃষ্ণ মঠের অধ্যক্ষ ও মিশনের সম্পাদক স্বামী ধ্রুবেশানন্দ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা যখনই চিঠিটা পেয়েছি, তা এখানকার এএসপিকে জানানোর পরপরই তিনি তাঁর লোকজন পাঠালেন। তিনি এসে কথাবার্তা বলে থানায় জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করতে বললেন। জিডি করার পর থেকেই পুলিশ ফোর্স পাঠিয়েছেন, যাতে আননোন (অচেনা) লোক ভেতরে আসতে না পারেন। তখন থেকেই নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এই পদক্ষেপে আমরা সন্তুষ্ট।’

গত বুধবার সন্ধ্যায় হত্যার হুমকি দিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনে একটি চিঠি আসে। ওই চিঠির ওপরের অংশে কম্পিউটার টাইপে লেখা ‘ইসলামিক ষ্টেট অব বাংলাদেশ, চান্দনা চৌরাস্তা ঈদগাঁও মার্কেট, গাজীপুর মহানগর’।

সংখ্যালঘুদের জন্য ভারতের দরজা সব সময়ই খোলা থাকবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারের পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছে ভারত। এছাড়া হামলা মোকাবেলায় সরকার যে পরিকল্পনা নিয়েছে তাতে ভারতের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। রোববার দিল্লিতে বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। সুষমা স্বরাজ বলেন, এটা স্বীকার করতেই হবে, শেখ হাসিনা সরকার এ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ জুড়ে তিন হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশে নির্যাতিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনের অনেক অংশজুড়েই ছিল বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর সাম্প্রতিক নানা হামলার ঘটনায় ভারত সরকার বিচলিত। কিন্তু সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এ হামলাগুলোকে তিনি বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে রাজি নন। সুষমা স্বরাজ বলেন, এ হামলাগুলো যেমন দূর্ভাগ্যজনক, তেমনি ভারতের জন্য পীড়াদায়কও বটে। দুদেশের সর্বোচ্চ স্তরে এ বিষয়ে নিয়মিত আমাদের কথাবার্তা হচ্ছে। তবে একটা কথা আমাকে অবশ্যই বলতে হবে, বাংলাদেশ সরকার এ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে কোনো চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না। সন্ত্রাস দমনে শেখ হাসিনা সত্যিই খুব কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তার জন্য অত্যন্ত খুশির খবর যে, বাংলাদেশের ধর্মীয় নেতারা রীতিমতো ফতোয়া দিয়ে এ ধরনের হামলাকে ইসলামবিরোধী বলে বর্ণনা করেছেন এবং লক্ষাধিক ধর্মীয় নেতা তাতে স্বাক্ষরও করেছেন। ফলে ভারত মনে করছে প্রকাশ্যে যখন হাজার হাজার ধর্মীয় নেতা হিন্দুদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে সরব হতে পারেন, তখন বা