বাংলাদেশসহ ৫ দেশের রাষ্ট্রদূত রাখাইন যাবেন

0
75
ঢাকা: রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বল এখন মিয়ানমারের কোর্টে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ নতুন পদ্ধতির প্রস্তাব করেছে। কারণ ১৯৯২ সালের নীতি এখন প্রযোজ্য নয়। শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট নিরসন করা হবে। যুদ্ধ আত্মহত্যার শামিল। আমরা যুদ্ধ করব না। এই সংকট নিরসনে সরকার সবই করছে, সঠিক পথেই আছে। এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সোমবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফ করার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন। এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশি ক‚টনীতিকদের রোহিঙ্গা সংকট শান্তিপূর্ণ সমাধানে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান।মন্ত্রী এ সময় তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
ব্রিফিংয়ে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, চীন, ইতালি, জাপান, রাশিয়া, সুইডেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা, ভারত, নেদারল্যান্ডস, ভ্যাটিকান, ডেনমার্ক, স্পেন, ইইউ, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রæনাই দারুসসালাম, সুইজারল্যান্ড এবং নরওয়ের ঢাকায় অবস্থানরত ক‚টনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। মিয়ানমার  খুব শিগগিরই তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের রাখাইন রাজ্যে নিয়ে যাবে। এই দেশগুলো হলো- চীন, ভারত, বাংলাদেশ, লাওস, থাইল্যান্ড। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও সেখানে যাবেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক‚টনীতিকদের বলেন , মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন এখনও বন্ধ হয়নি। ফলে তাদের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা অব্যাহত আছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন। গত ১০ দিনে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা এ দেশে আসেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত ২ অক্টোবর মিয়ানমারের মন্ত্রী খিও টিন্ট সোয়ের বাংলাদেশ সফরের বিষয় উল্লেখ করে বলেছেন, মিয়ানমারের মন্ত্রী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। এক্ষেত্রে, তারা ১৯৯২ সালের যৌথ বিবৃতির নীতি অনুসরণের কথা বলেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেন, মিয়ানমারের মন্ত্রীর সফরকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী কূটনীতিকদের বলেছেন, ১৯৯২ সালের পরিস্থিতি আর এখনকার অবস্থার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। রাখাইনের মুসলিমঅধ্যুষিত অর্ধেক গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এখনও গ্রাম পোড়ানো হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আবাসনের ওপর ভিত্তি করে তাদের চিহ্নিত করা বাস্তবসম্মত হবে না। বাংলাদেশ তাই নতুন একটি পদ্ধতির প্রস্তাব করে মিয়ানমারের মন্ত্রীর হাতে দিয়েছে। মিয়ানমারের কাছ থেকে এ ব্যাপারে সাড়ার অপেক্ষায় আছি।  পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সময় বলেন, উভয়পক্ষ একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে একমত হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মিয়ানমার সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তারা মিয়ানমারের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন বলেও জানান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ২০ থেকে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল মিয়ানমার সফরে যাওয়ার প্রস্তাব করেছেন। মিয়ানমার দিনক্ষণ জানালে এই সময়ে তিনি যাবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে গিয়ে মিয়ানমারের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ নিরসনে বর্ডার লিয়াঁজো অফিস স্থান এবং নিরাপত্তা সংলাপ সংক্রান্ত ছুটি সমঝোতা স্মারক সই করবেন। এতে করে রোহিঙ্গা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার গুণগত পরিবেশের উন্নতি হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আমি মিয়ানমারের মন্ত্রীকে বলেছি, তার দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত মাত্র ২৭১ কিলোমিটার। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত চার হাজার কিলোমিটারের বেশি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গি সমস্যা ছিল। কিন্তু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমস্যা আমরা সমাধান করতে সক্ষম হয়েছি। ফলে সেই তুলনায় মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা অনেক ছোট। সেটা কেন সমাধান করতে পারব না। আমরা ইতিমধ্যে মিয়ানমারের কাছে দু’জন জঙ্গিকে হস্তান্তর করেছি।
মাহমুদ আলী এ সময় রোহিঙ্গা সংকটকে একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয়ভাবে সবার মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তা সমাধানের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কক্সবাজার বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কাজ করতে হবে। আমাদের পক্ষে যা সম্ভব আমরা সবকিছু করছি। বিশ্ব সম্প্রদায় আমাদের সমর্থন করেছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কেউ কেউ আমাদের বলছে, আমাদের নাকি নতজানু পররাষ্ট্রনীতি। তবে আমরা কী করব, যুদ্ধ করব? যুদ্ধ করলে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।
যেসব দেশ যুদ্ধ করেছে তাদের সমাজ-সংস্কৃতি সব ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা শান্তি চাই। যুদ্ধ হলো আত্মহননের শামিল। আমরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেব কেন? কেউ বললেও আমরা যুদ্ধ করব না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা সিরিয়াস ক্রিটিসিজম গ্রহণ করব। ঠাণ্ডা মাথায় ভালো পরামর্শ গ্রহণ করব। এখন টিভির টকশোতে যেসব কথা বলা হচ্ছে তার অনেক কিছুই বালখিল্যপনা। এটা ঠিক না। যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। যুদ্ধের পরামর্শ আমরা গ্রহণ করব না। তবে একতাবদ্ধ হয়ে সংকট নিরসনে সুচিন্তিত মতামত অবশ্যই গ্রহণ করব।
এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগামী ১৬ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়নে মন্ত্রীদের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছি। নিরাপত্তা পরিষদে শক্তিধর কেউ ভেটো দেয়নি। আগে এই ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করা যেত না। এখন মুক্ত আলোচনা হয়েছে গোটা পৃথিবী দেখেছে। বিদেশি ক‚টনীতিকদের আমি নিজে সীমান্তে শূন্য রেখায় নিয়ে গেছি। একজন সাদা ও নীল পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল যাতে মিয়ানমারের থেকে গুলি না করে।
তিনি বলেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রশংসাই এসেছে। এটা যে আমরা সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করেছি তার জন্য শুধু নয়; বরং আমাদের ধৈর্যেরেও প্রশংসা করেছেন তারা । আমি মনে করি, রোহিঙ্গা সংকটে শেখ হাসিনার সরকার যা করেছে, এর চেয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গাদের সাহায্য, চিকিৎসা সবই দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা এক বেলা খাব, আরেক বেলা রোহিঙ্গাদের খাওয়াব। আমরা ভাগ করে খাব।
রাশিয়ার সমর্থন পেতে সরকার কী করছে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, রাশিয়া রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কোনো ভেটো দেয়নি। এক সময় এই ইস্যুতে আলোচনাই করা যেত না। আমরা ধাপে ধাপে সবকিছু করব। আমি মিয়ানমারের মন্ত্রীকে বলেছি, আপনি কী বার্তা নিয়ে এসেছেন? জবাবে তিনি বলেন, গত বছরের অক্টোবরের পরে যারা এসেছেন তাদের ফিরিয়ে নেবেন। এভাবে আন্তরিক পরিবেশে আলোচনা করেছি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে রেড ক্রিসেন্টকে এখন ঢুকতে দিয়েছে। তারা সেখানে খাদ্য সরবরাহ করছে। কিছু কিছু রোহিঙ্গাকে তাদের ক্যাম্পে নিয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বলেন, ভারত সফরকালে তিনি