ফাঁসির রশিতে মুফতি হান্নান

0
101

untitled-6_284926আনোয়ার চৌধুরী হত্যা চেষ্টা মামলা, সহযোগী বিপুল-রিপনের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর 

নিউজ ডেস্ক:  হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজিবি) শীর্ষ জঙ্গিনেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং তার দুই সহযোগী শরীফ শাহেদুল ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার হোসেন রিপনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। গতকাল বুধবার রাত ১০টায় হান্নান ও বিপুলকে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে ফাঁসির রশিতে ঝোলানো হয়। একই সময়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর হয় অপর জঙ্গি রিপনের দণ্ড। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সমকালকে বলেন, রাত ১০টায় তিন জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

সিলেটে ২০০৪ সালের ২১ মে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা ও তিনজন নিহত হওয়ার মামলায় মুফতি হান্নান এবং তার দুই সহযোগী বিপুল ও দেলোয়ারকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগেও তা বহাল থাকে। রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে (রিভিউ) তিনজনের করা আবেদন খারিজ হয়। গত ২৭ মার্চ তিনজনই প্রাণভিক্ষা চেয়ে কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। তাদের প্রাণভিক্ষার আবেদন রাষ্ট্রপতি নাকচ করেছেন। তিনজনের প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হওয়ার পর কারাবিধি অনুযায়ী ভয়ঙ্কর জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নানসহ তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হলো। ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ একই সময়ে ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আবদুর রহমান, জেএমবির প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইসহ ছয় শীর্ষ জঙ্গির। দীর্ঘদিন পর নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের শীর্ষ নেতাসহ তিন জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে হামলার মধ্য দিয়ে দেশে নাশকতা শুরু করে হুজিবি। এরপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, রমনা বটমূলে হামলাসহ অন্তত ১৩টি বড় ধরনের নাশকতা চালায় হুজিবি। এতে ১০৯ জন নিহত ও সাতশ’র বেশি লোক আহত হন।

সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন এমন এক কর্মকর্তা জানান, বুধবার রাত ১০টায় প্রথমে মুফতি হান্নান ও পরে তার সহযোগী বিপুলকে ফাঁসির মঞ্চে আনা হয়। একই মঞ্চের দুই পাশে একই সঙ্গে তাদের ঝোলানো হয়েছে। আগে থেকেই কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে প্রস্তুত ছিলেন চার জল্লাদ। কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান একটি রুমাল ফেলার সঙ্গে সঙ্গে জল্লাদ রাজু ফাঁসির মঞ্চের লিভার ধরে টান দেন। তাকে সহায়তা করেন অপর তিন জল্লাদ রোমান, শরিফুল ইসলাম ও ইকবাল হোসেন। প্রত্যেককে প্রায় ২০ মিনিট ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ফাঁসির রায় কার্যকরের আগে একাধিক দফায় চিকিৎসক তাদের শারীরিক পরীক্ষা করেন। মুফতি হান্নান ও বিপুলকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে নামানোর পর ময়নাতদন্তসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এরপর হান্নানের মরদেহ কড়া নিরাপত্তায় তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় হিরণ গ্রামে দাফন করা হয়। বিপুলের মৃতদেহ পাঠানো হয় চাঁদপুর সদরের মৈশাদী ইউনিয়নের মৈশাদী গ্রামে। এর আগে রাতের খাবারের পর মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী বিপুলকে গোসল করানো হয়। তারা নামাজ আদায় করেন। এর পর তাদের তওবা পড়ান কাশিমপুর কারাগারের ইমাম মাওলানা নোমানুর রহমান।

গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে একে একে কাশিমপুর কারাগারে প্রবেশ করতে থাকেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বিকেল ৪টার দিকে ডিআইজি প্রিজন তৌহিদুল ইসলাম কারাগারে ঢোকেন। এরপরই কারাগারে নেওয়া হয় লাশ বহনকারী দুটি অ্যাম্বুলেন্স। এর কিছুক্ষণ আগে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিটও কারাগারে প্রবেশ করে। রাত ৮টার দিকে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন ও অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল ইকবাল হাসানও কারাগারে প্রবেশ করেন। গাজীপুর জেলা প্রশাসক এস এম আলম, জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ, জেলা সিভিল সার্জন সৈয়দ মঞ্জুরুল হকও কারাগারে প্রবেশ করেন। অন্যান্য সময় বিভিন্ন জনের ফাঁসি কার্যকরের খবর বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন কারাগারের সামনে থেকে ‘লাইভ’ সম্প্রচার করলেও মুফতি হান্নানের ক্ষেত্রে সেটা দেখা যায়নি।

স্বজনদের শেষ সাক্ষাৎ :গতকাল বুধবার মুফতি হান্নানের স্বজনরা কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে তার সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ করেছেন। একই কারাগারে বন্দি অপর জঙ্গি শরীফ শাহেদুল বিপুলের স্বজনদের দেখা করতে খবর দেওয়া হলেও কেউ যাননি। জঙ্গি দেলোয়ার হোসেন রিপনের সঙ্গে সিলেট কারাগারে দেখা করেন স্বজনরা। কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান জানান, হান্নানের পরিবারের চার সদস্য সকাল ৭টা ১০ মিনিটে সাক্ষাতের জন্য কারাগারে ঢোকেন। তারা প্রায় ৪০ মিনিট কথা বলেন।

কারা সূত্র জানায়, হান্নানের বড় ভাই আলি উজ্জামান মুন্সী, হান্নানের স্ত্রী জাকিয়া পারভীন রুমা এবং দুই মেয়ে নাজনীন খানম ও নিশি খানম মুফতি হান্নানের সঙ্গে দেখা করেন। স্বজনদের কাছে পেয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার স্ত্রী, সন্তান ও ভাই কাঁদতে থাকেন। তবে কারও মধ্যেই অস্বাভাবিক কিছু ছিল না।

কারাগার থেকে বেরিয়ে হান্নানের বড় ভাই আলি উজ্জামান জানান, হান্নান মায়ের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছার কথা জানালেও মা অসুস্থ থাকায় আসতে পারেননি।

স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুফতি হান্নানের স্ত্রী বলেন, ‘হান্নান বলেছেন যে ক’দিন হায়াত আছে ওই ক’দিনই বেঁচে থাকব। তার যেন ইমানের সঙ্গে মৃত্যু হয় সে জন্য দোয়া করতে বলেছেন।’ কারাগারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, দুপুরের দিকে মুফতি হান্নানের সঙ্গে তার কারাবন্দি দুই ভাইকেও সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে একই মামলায় বন্দি যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া মহিবুল্লাহ ও কাশিমপুর কারাগারে বন্দি আনিছুর রহমান দুপুর ২টার দিকে হান্নানের সঙ্গে দেখা করেন। দুই ভাইকে কাছে পেয়ে মুফতি হান্নান কাঁদতে থাকেন। জঙ্গি মুহিবুল্লাহ ও আনিছও কাঁদেন।

সিলেটে রিপনের ফাঁসি কার্যকর :বুধবার রাতে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে রশিতে ঝুলিয়ে রিপনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর আগে কারাগারে পরিবারের স্বজনরা তার সঙ্গে শেষ দেখা করেন। ফাঁসির মঞ্চে নেওয়ার আগে তাকে তওবা পড়ান শাহ আবু তোরাব (রহ.) মসজিদের ইমাম মাওলানা মুফতি বেলাল উদ্দিন। এর আগে সন্ধ্যায় জঙ্গি রিপনের পরিবারের ২৫ সদস্যের একটি দল কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সেখানে তারা ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট অবস্থান করে রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে বেরিয়ে যান। এরপর একে একে ডিআইজি অব প্রিজন্স একেএম ফজলুল হকসহ কর্মকর্তারা কারাগারে প্রবেশ করেন। রাত ১০টায় ফাঁসির মঞ্চের লিভার ধরে টান দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন ৩১ বছরের পুরনো জল্লাদ ফারুক মিয়া। কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই জঙ্গি রিপনের মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি কুলাউড়ায় পাঠানো হয়। সেখানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

ফিরে দেখা :২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে ঘটনাস্থলেই পুলিশের এএসআই কামাল উদ্দিন নিহত হন। এ ছাড়া পুলিশ কনস্টেবল রুবেল আহমেদ ও হাবিল মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি মারা যান হাসপাতালে। আনোয়ার চৌধুরী ও সিলেটের জেলা প্রশাসকসহ কমপক্ষে ৪০ জন ওই ঘটনায় আহত হন। পুলিশ ওই দিনই সিলেট কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করে। তদন্ত শেষে ২০০৭ সালের ৭ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, তার ভাই মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার ওরফে রিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামীম মোহাম্মদ আফজাল জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদ এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদ কার্ট বেঞ্চ মুফতি হান্নানসহ তিন আসামির মৃত্যুদ এবং দুইজনের যাবজ্জীবন দ বহাল রাখেন। গত ১৯ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মুফতি হান্নানের রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে যায়। গত ২২ মার্চ তাকে কারাগারে মৃত্যুদ বহাল রাখার রায় পড়ে শোনানো হয়। ২৩ মার্চ কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে তার মৃত্যু পরোয়ানা পাঠানো হয়। কারাবিধি অনুযায়ী রিভিউ রায় পড়ে শোনানোর সর্বনিম্ন ২১ দিনের মাথায় মুফতি হান্নানের দণ্ড কার্যকর হলো।

কে এই মুফতি হান্নান :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাসহ হরকাতুল জিহাদের ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী কুখ্যাত জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান। তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় হিরণ গ্রামে। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর ঢাকার বাড্ডা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়াতে শেখ হাসিনার সভামঞ্চের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। মুফতি হান্নান ওই মামলারও আসামি। রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার দায়ে মুফতি হান্নানকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত। ওই হত্যা মামলায় মুফতি হান্নানসহ আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের হাইকোর্টে করা আপিলের শুনানি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। গত ৬ মার্চ একটি মামলার শুনানি শেষে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীদের আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার পথে টঙ্গীতে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে তাদের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

নিরাপত্তা জোরদার :গাজীপুরের কাশিমপুরে কেন্দ্রীয় কারাগারের পার্ট-১ ও পার্ট-২ ঘিরে কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যম কর্মীরা সরব ছিলেন। গতকাল সকাল থেকে ওই এলাকায় ভিড় বেড়ে যায়। রাজধানী ছাড়াও গাজীপুর, সিলেট ও দেশের অন্যান্য জায়গায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কারাগার ঘিরে ছিল বাড়তি নিরাপত্তা। পুলিশের পাশাপাশি কারাগারের ফটকে সারি বেঁধে অবস্থান নেন র‌্যাব সদস্যরাও। সাদা পোশাকে কারা এলাকা ছাড়াও গাজীপুরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। প্রস্তুত রাখা হয় ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও। গতকাল দুপুরের পর থেকে কারা কমপ্লেক্স এলাকার রাস্তা ও ফুটপাতের দোকানও বন্ধ করে দেওয়া হয়।