প্রধানমন্ত্রী ভারত যাচ্ছেন আজ, বৃহত্তর বন্ধুত্বের ‘অগ্নিপরীক্ষা’

0
96

hasina_44100_1491511177নিউজ ডেস্ক:প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত নয়াদিল্লি। ভারতের রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোয় বাংলাদেশ ও ভারতের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে।

আজ দুপুরে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে দিল্লি পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। এই সফরকে নানা দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের জানুয়ারিতে সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় সফর করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। তারপর থেকে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে জঙ্গি তৎপরতা দমন করতে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার।

ভারতের ওই অঞ্চলের সাত রাজ্যের সঙ্গে দেশটির অবশিষ্ট অংশের সংযোগ স্থাপনে ট্রানজিট সুবিধাও উদারভাবে দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে শেখ হাসিনা যখন ভারত সফরে যাচ্ছেন, তখন তিস্তা চুক্তির জন্য গোটা জাতি দিল্লির দিকে তাকিয়ে আছে।

নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই তিস্তা চুক্তির ওপর নির্ভর করছে। মোদির সরকার কি বৃহত্তর বন্ধুত্বের প্রতিদান হিসেবে শেখ হাসিনাকে নিরাশ করবে, নাকি তার পাশে এসে দাঁড়াবে?

শেখ হাসিনার এই সফরকে তাই বৃহত্তর বন্ধুত্বের ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এছাড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মূল এজেন্ডা হওয়া উচিত, দুই দেশের ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতির বৈষম্য কমিয়ে আনা।

এছাড়া তিস্তা চুক্তির বিষয়টি তো অগ্রাধিকার পাবেই। এক্ষেত্রে চুক্তি যাই  হোক, পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে সীমান্তে মানুষ হত্যা।

এর স্থায়ী সমাধান হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এছাড়া যদি বাংলাদেশের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ভারতে এবং ভারতের সন্ত্রাসী বাংলাদেশে অবস্থান করে, সেক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বৈধ উপায়ে সন্ত্রাসী বিনিময় হওয়া উচিত। তাহলে সন্ত্রাস দমনে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সদৃঢ় হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে দিল্লির সূত্রগুলো নিশ্চিত করছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের সফরে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হচ্ছে না। তবে তিস্তা নিয়ে এই সফরে বাংলাদেশ কী করতে চাইছে জানতে চাইলে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘তিস্তা চুক্তি করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা চাইবে বাংলাদেশ।

কেননা ২০১১ সাল থেকে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে আশ্বাস দেয়া হচ্ছে। এখন তাই আমরা সময়সীমা চাইব।’ তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের সফরকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী ভারতের সৈন্যদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এসে যে সম্মাননা দিচ্ছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। তিনি বলেন, বিগত সাত বছরে কানেকটিভিটির ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন নতুন বাস ও ট্রেন সার্ভিস চালু হয়েছে। প্রস্তাবিত সামরিক চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেন, সামরিক খাতে কোনো চুক্তি হচ্ছে না। তবে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত তৃতীয় ‘লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি)’ হিসেবে নতুন করে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ দেবে।

বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী আরও জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফরের তৃতীয় দিনে একটি চমক থাকবে।’ তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছুই বলেননি তিনি।

তবে দিল্লির একাধিক সূত্র যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছে, দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পার্ক স্ট্রিটের নাম পরিবর্তন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণ করা হবে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর ঐকান্তিক চেষ্টায় ভারত সরকার বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে এই নতুন নামকরণ করতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একসঙ্গে বোতাম টিপে এই নতুন নামকরণের উদ্বোধন করবেন।

এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ডেস্কের যুগ্ম সচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথন বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ভারতে অভ্যন্তরীণ আলাপ-আলোচনা এখনও শেষ হয়নি। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে এটি হচ্ছে না। প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের সহযোগিতার রূপরেখা এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়ে ৫০ কোটি ডলারের ঋণ দেয়া সংক্রান্ত দুটি এমওইউ সই হবে।’

তিস্তা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দিল্লিতে আসছেন। এখানে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় তিনি থাকবেন। নৈশভোজে যোগ দেবেন। প্রণব মুখার্জি, নরেন্দ্র মোদি, শেখ হাসিনা সবার সঙ্গে দেখা করবেন। এসবের মাধ্যমে তিস্তার ব্যাপারে অগ্রগতি হওয়া স্বাভাবিক।’

প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিরক্ষা খাতেও সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম প্রধান বিষয় হল নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সন্ত্রাস দমন। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সন্ত্রাস দমনের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। এ কারণে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা খুবই ইতিবাচক দিক।’

দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার আহমেদ তারেক করিম যুগান্তরকে বলেছেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে, ভারত যা চেয়েছে তার সবই পেয়েছে; আর বাংলাদেশ আশ্বাসের মধ্যেই বাস করছে। তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সফরে তার একটা প্রতিদান দেয়া খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।’

নয়াদিল্লিতে ভারতীয় সাংবাদিক অরুনাভ দাশগুপ্ত বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ভারতের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ভারতকে নিরাপত্তা ও ট্রানজিট ইস্যুতে সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশে তিস্তা ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ। এই ইস্যুর নিষ্পত্তির লক্ষ্যে নরেন্দ্র মোদির সরকার আন্তরিক হলেও মমতা ব্যানার্জির কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে মোদি এটা জানেন যে, শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো অগ্রগতি নিয়ে যেতে না পারলে তার দেশে রাজনীতিতে সমালোচনার মুখে পড়বেন। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, শেখ হাসিনার এ সফরকে বিফল হতে দেবেন না মোদি।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এরই মধ্যে ঘোষণা করেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের সফরকালে দু’দেশের মধ্যে ৩৩টি চুক্তি, এমওইউ ও দলিল সই হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের দুই দিন আগে বুধবার ভারতের মন্ত্রিসভায় বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি ও চারটি সমঝোতা স্মারকের অনুমোদন দিয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত নৌপথ প্রটোকল বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক রয়েছে।

প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো অব ইন্ডিয়ার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুধবার মন্ত্রিসভায় সভাপতিত্ব করেন।

এ সভায় বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকলের আওতায় আশুগঞ্জ-জকিগঞ্জ কুশিয়ারা নদীপথ এবং সিরাজগঞ্জ-দইখাওয়া যমুনা নদীপথের উন্নয়ন, দুই দেশের বিচার বিভাগ সহযোগিতা, কোস্টাল রুটে যাত্রীবাহী ক্রুজ সার্ভিস, ম্যাস মিডিয়া সহযোগিতার জন্য সমঝোতা স্মারক এবং অডিও-ভিজুয়াল প্রডাকশনের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরের অনুমোদন দেয়া হয়। এর আগে ১৫ মার্চে বর্ডার হাট স্থাপন ও নদীপথে নেভিগেশন সংক্রান্ত দুটি সমঝোতা স্মারক অনুমোদন দেয় ভারতের মন্ত্রিসভা।

নৌ-প্রটোকল সহযোগিতার আওতায় নৌ-প্রটোকলের আওতায় কুশিয়ারা ও যমুনা নদীর প্রয়াজনীয় ড্রেজিং যৌথভাবে করা হবে। এর ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য পাঠানোর খরচ কমবে। শিলিগুড়ি চিকেন নেক করিডোরের ওপর চাপ কমবে।

কোস্টাল রুটে যাত্রীবাহী ক্রুজ সার্ভিস চালুর আওতায় দুই দেশের মধ্যে কোস্টাল রুটে যাত্রী ও পর্যটকদের চলাচলের জন্য ক্রুজ সার্ভিস চালুর লক্ষ্যে এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হবে। এটি চালু হলে উভয় দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি সাধনের জন্য সহযোগিতা বাড়বে। এছাড়া দুই দেশের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করবে এ সমঝোতা স্মারক।

বিচার বিভাগ সহযোগিতার আওতায় দুই দেশের বিচারকদের মধ্যে আন্তঃসংযোগ, প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক প্রোগ্রাম বিনিময় হবে। এছাড়া আইন ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হলে, সে বিষয়ে তথ্য বিনিময় করা হবে।

অডিও-ভিজুয়াল প্রডাকশনে চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় ছবি, ডকুমেন্টারি ও অ্যানিমেশন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া দুই দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি বিনিময় করার মাধ্যমে আমাদের সফট পাওয়ার সৃষ্টি করা এবং দেখানোর সুযোগ তৈরি করা হবে এ চুক্তির মাধ্যমে।

ম্যাস মিডিয়া সহযোগিতার আওতায় ম্যাস মিডিয়ার যুক্ত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সফরের আয়োজন করতে সহায়তা করা হবে, বিশেষজ্ঞ আদান-প্রদানে উৎসাহিত করা হবে। এছাড়া ম্যাস মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত স্বীকৃত প্রতিনিধিদের রেসিপ্রোসিটির মাধ্যমে দুই দেশে অফিস খোলার অনুমতি দেয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লি পৌঁছলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় তাকে পালাম এয়ারফোর্স স্টেশনে স্বাগত জানাবেন। এ সময় দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী উপস্থিত থাকবেন। সেখান থেকে তিনি সরাসরি রাষ্ট্রপতি ভবনে যাবেন।

এ সফরকালে তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনেই থাকবেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বিশেষ আমন্ত্রণে রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকবেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথমে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। একই দিন বিকালে তিনি দিল্লির চাণক্যপুরীতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন পরিদর্শনে যাবেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানানো হবে।

বাংলাদেশ হাউসে তার সম্মানে নৈশভোজের আয়োজনও থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সফরের দ্বিতীয় দিনে শনিবার রাষ্ট্রপতি ভবনে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও উপস্থিত থাকবেন।

তারপর শেখ হাসিনা রাজঘাটে অবস্থিত গান্ধী স্মৃতি সৌধে যাবেন। সেখানে পরিদর্শন বইয়ে স