প্রধানমন্ত্রীর কাছে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যানের খোলা চিঠি

0
46

বিষয় : যমুনা গ্রুপের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের অন্যায়, বেআইনি ও হয়রানিমূলক পদক্ষেপের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারে তদন্ত কমিটি গঠন প্রসঙ্গে।

যমুনা গ্রুপ দেশের স্বনামধন্য একটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপ। সুদীর্ঘ ৪৩ বছরের পথচলায় অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গ্রুপের বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান সুনামের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে।

দেশের হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান করতে পেরে গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি ও যমুনা পরিবার সত্যিই গর্বিত। আর এসবই অর্জিত হয়েছে মহান রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমত এবং শুরু থেকেই সততা, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে।

কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বর্তমান চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যক্তিগত তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো যমুনা গ্রুপের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাচ্ছেন।

তার বেআইনি ও হয়রানিমূলক পদক্ষেপের কারণে এযাবৎ গ্রুপটিকে সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। অন্যান্য ক্ষতির হিসাব বাদ দিলেও শুধু যদি আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় তা ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড়া কম নয়। অথচ যমুনা গ্রুপের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলায় তাকে পরাজিত হতে হয়েছে এবং হচ্ছে। হয়রানিমূলক প্রতিটি মামলার রায় শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে গেছে।

কিন্তু তিনি নিজেকে এতই ক্ষমতাবান মনে করেন যে, সুপ্রিমকোর্টের রায়ও আমলে নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। সম্প্রতি আদালত অবমাননার এ সংক্রান্ত একটি মামলার রায়ে সুপ্রিমকোর্ট তার বিরুদ্ধে আদেশ দিয়ে অন্যায়ভাবে নেয়া ভ্যাট ও এআইটির পুরো টাকা এখনই ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন। দুর্ভাগ্য সে নির্দেশও তিনি প্রতিপালন করেননি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে আগের কোনো বিরোধ বা বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার কোনো কারণও ছিল না। যা ঘটেছিল তার সারমর্ম হল- এনবিআর বিটে কর্মরত যুগান্তরের সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক (ইকোনমিক এডিটর) হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।

সাংবাদিক হিসেবে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন করাকে কেন্দ্র করে তাকে হেয় করার চেষ্টা করেন। এরপর তিনি আমাকে চা খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে সাংবাদিক হেলাল উদ্দিনকে অপসারণ করার জোরালো প্রস্তাব দেন। কিন্তু কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া আমি যুগান্তরের স্বত্বাধিকারী হিসেবে একজন সাংবাদিককে এভাবে চাকরিচ্যুত করতে পারি না। আমার নৈতিক এ অবস্থানের কথা তুলে ধরে আমি বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে বলি, চাকরিচ্যুত না করে তাকে অন্য কোনো বিটে সরিয়ে দেব। কিন্তু তিনি তা মানতে পারেননি।

এরপর শুধু এ রকম একটি ঘটনার কারণেই এনবিআর চেয়ারম্যান তার রাগ-ক্ষোভ মেটাতে একে একে যমুনা গ্রুপের প্রতিটি ক্ষেত্রে অযাচিত হস্তক্ষেপ ও হয়রানি শুরু করেন। গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে আমিসহ পরিচালনা পর্ষদের প্রত্যেকের আয়কর নথি যাচাই-বাছাই করেন। যমুনা গ্রুপের প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট-ট্যাক্স সংক্রান্ত নথিপত্র তলব করে দফায় দফায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়।

কিন্তু কোনোভাবেই তিনি কোনো ফাঁকফোকর বের করতে না পেরে পরবর্তীকালে ক্ষমতা অপব্যবহারের চরমপন্থা বেছে নেন। গ্রুপের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেখানে প্রাপ্য শুল্ক ছাড় বা শুল্ক অব্যাহতি আছে সেখানে জোরপূর্বক শুল্ক দিতে বাধ্য করেন। এছাড়া শিল্পের জন্য জরুরি আমদানি পণ্যের ছাড়করণ প্রক্রিয়ায় নানাভাবে বেআইনি দেয়াল সৃষ্টি করা হয়।

এক পর্যায়ে তিনি কোনো অসদুপায় বের করতে না পেরে গ্রুপের সব ব্যাংক হিসাব তলব করে জানার চেষ্টা করেন যে, কোথাও যমুনা গ্রুপ অর্জিত অর্থ গোপন করেছে কিনা। তবে সেখানেও তিনি কিছুই পাননি। বরং গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে সৎ সাহসের সঙ্গে আমি বলতে পারি- একটি টাকাও বিদেশে নিয়ে যাইনি। অর্জিত সব অর্থ দেশেই বিনিয়োগ করেছি।

এটাই যমুনা গ্রুপের বড় গৌরব। আর সততার এ রকম বহু গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে বলতে চাই, সত্যিই একদিন ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে- এ প্রত্যাশায় যমুনা গ্রুপ এনবিআর চেয়ারম্যানের এসব অন্যায় জুলুম সহ্য করে আসছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

এনবিআর চেয়ারম্যানের পদটি ব্যাপক ক্ষমতার আধার দ্বারা পরিবেষ্টিত। তাই এ পদে থেকে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার বা কাউকে অহেতুক হয়রানি করতে চাইলে খুব সহজে তা করা যায়। কেননা সাধারণ করদাতা ছাড়াও দেশের সব স্তরের প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর লোকজনের আয়কর নথি থাকে তার নিয়ন্ত্রণে।

এজন্য একান্ত বাধ্য না হলে এনবিআর চেয়ারম্যানকে কেউ ঘাঁটাতে চান না। এ রকম পরিস্থিতি প্রেক্ষাপটের কারণে অনেক সময় উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল পর্যায় থেকেও অনিচ্ছা সত্ত্বেও এনবিআর চেয়ারম্যানের অন্যায় তদবির ও প্রভাব মেনে নিতে কেউ কেউ বাধ্য হন।

মূলত এসব কারণেও ন্যায়বিচার পেতে যমুনা গ্রুপকে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সময়ক্ষেপণ, বিপুল অর্থদণ্ড দেয়াসহ নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও এনবিআরের সঙ্গে প্রতিটি মামলার রায় যমুনা গ্রুপের পক্ষে এসেছে। এ সংক্রান্ত মামলাগুলোর সর্বশেষ অবস্থান পর্যালোচনা করলে এর প্রমাণ মিলবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আপনার জ্ঞাতার্থে সংক্ষিপ্তভাবে জানাতে চাই, এনবিআর বা এনবিআর চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে প্রায় গত তিন বছরে প্রতিটি আইনগত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাগড়া দেয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে যমুনা গ্রুপকে এর বিরুদ্ধে আদালতে যেতে হয়েছে। এ রকম হয়রানিমূলক পদক্ষেপের সংখ্যা দুই ডজনের কম নয়।

এই স্বল্পপরিসরে কয়েকটি মামলার উদাহরণ দিলেই এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের প্রতিহিংসার বিষয়টি আপনার কাছে স্পষ্ট হবে। যেমন- যমুনা শিল্প গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের নাম যমুনা ডেনিমস উইভিং লিমিটেড। প্রাপ্যতা অনুযায়ী সব শর্ত পূরণ করে বন্ড লাইসেন্স চেয়ে বন্ড কমিশনারের কাছে ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর আবেদন করা হয়। আইন অনুযায়ী এ লাইসেন্স প্রদানের ক্ষমতা বন্ড কমিশনারের।

কিন্তু যমুনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে হবে- এমন মানসিকতা থেকে নজিবুর রহমান এখানে বেআইনিভাবে হস্তক্ষেপ করে লাইসেন্স প্রাপ্তি আটকে দেন। বাধ্য হয়ে যমুনা গ্রুপ আদালতে রিট করে। উচ্চ আদালতের রায়ে ৩০ দিনের মধ্যে বন্ড কমিশনারকে লাইসেন্স দেয়ার নির্দেশ দেন।

বন্ড কমিশনার আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করতে গেলে তাকে ওএসডি করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। এরপর রায় বাস্তবায়ন না করায় আদালত অবমাননার মামলা করা হয়।

গত জুলাই মাসে এ মামলার রায়ে ২ মাসের  মধ্যে যমুনা ডেনিমস উইভিং লিমিটেডের অনুকূলে লাইসেন্স ইস্যু করার জন্য এনবিআর ও বন্ড কমিশনারকে নির্দেশ দেন। অথচ অদ্যাবধি বন্ড লাইসেন্স সুবিধা না পাওয়ায় যমুনা গ্রুপের সম্পূর্ণ রফতানিমুখী এ প্রতিষ্ঠানটিকে নানাভাবে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আর প্রাপ্য বন্ড সুবিধা না পেয়ে বাধ্য হয়ে শিল্প সুরক্ষার স্বার্থে শুল্ক দিয়ে পণ্য ছাড়াতে হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

অনেকগুলো কেসস্টাডি দিয়েও বলতে পারব- যমুনা গ্রুপের প্রতিটি মামলার বিভিন্ন ধাপে এনবিআর বা এনবিআর চেয়ারম্যান পরাজিত হয়েছেন। এখানেই শেষ নয়। এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের ক্ষমতা অপব্যবহারের নমুনা হিসেবে শুধু একটি ঘটনার উদাহরণ দিলেই তার প্রতিহিংসা ও হীন মানসিকতার চিত্র ফুটে উঠবে।

যেমন- তিনি একের পর এক বেআইনি সিদ্ধান্ত প্রয়োগ ও পত্রিকায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়া ছাড়াও রীতিমতো সরকারি টাকা খরচ করে যমুনা গ্রুপের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন বিজ্ঞাপন ছেপে অপপ্রচারে নেমে পড়েন।

এক বছর আগে ঢাকা থেকে প্রকাশিত অধিকাংশ জাতীয় দৈনিকে বড় পরিসরে সরকারি টাকায় ভুলে ভরা বিজ্ঞাপন ছেপে বিষোদগার করেন। মূলত ক্ষমতার জোরে তিনি পদে পদে যমুনা গ্রুপকে হেয় করার অপচেষ্টা করেছেন এবং করে যাচ্ছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের এহেন স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের কারণে বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি তিনি যমুনা গ্রুপের অপূরণীয় সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছেন। এজন্য বাধ্য হয়ে যমুনা গ্রুপ তার বিরুদ্ধে গত ৩০ মার্চ ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ৫ হাজার ৫শ’ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছে।

প্রসঙ্গত, এ মামলা এনবিআর কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে নয়, যেহেতু ব্যক্তির আক্রোশমূলক পদক্ষেপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে; তাই ব্যক্তি নজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

সবশেষে আপনার কাছে শুধু একটি আর্জিই করব। তা হল পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার। শিল্পপতি হিসেবে না হোক, মুক্তিযোদ্ধা কিংবা দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনার কাছে আমি এ দাবি করতেই পারি। মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ। আর এ দলের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা হিসেবে আপনার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ- ঘটনার সত্য উদঘাটনে আপনি একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দিন।

আপনার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যদি আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাহলে আপনি যে শাস্তি দেবেন তা আমি মাথা পেতে নেব। আর কারও ক্ষমতার অপব্যবহার ও বেআইনি কর্মকাণ্ড প্রমাণিত হলে সেক্ষেত্রে আপনি নিশ্চয় ন্যায়বিচার করবেন। এজন্য সৎ সাহস আছে বলেই উল্লেখিত বিষয়সহ সার্বিকভাবে তদন্ত চেয়ে গত ৬ আগস্ট আপনার বরাবরে আবেদন করি।

আশা করি বিষয়টি আপনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছেন। একই সঙ্গে আরও একটি কথা বলতে চাই, আপনার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যদি আমি নির্দোষ প্রমাণিত হই তাহলে ধরে নেবেন আপনার কাছে আমার বিষয়ে ইতিমধ্যে যারা যেভাবে যেসব অভিযোগ উপস্থাপন করেছেন তার সবই তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল ও প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছু নয়।

মো. নুরুল ইসলাম
চেয়ারম্যান

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here