পর্যাপ্ত ত্রাণ নেই, চরম কষ্টে দিন কাটছে বানভাসির

0
34

2_139669_52144_1500064139নিউজ ডেস্ক: দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এসব জেলায় প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। তলিয়ে গেছে বহু ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে চরম কষ্টে দিন কাটছে বন্যাকবলিত লাখ লাখ মানুষের। অনেকে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারিভাবে যেসব এলাকায় ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

শুক্রবার জামালপুরে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সিরাজগঞ্জে পাউবোর বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ রিং বাঁধের ৩০ মিটার ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। বন্যার কারণে কুড়িগ্রামে ১৯৩টি ও বগুড়ায় ৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে।

রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এতে নদী-তীরবর্তী মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

কুড়িগ্রাম ও চিলমারী

টানা ৯ দিনের বন্যায় জলবন্দি মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকরই খাবার নেই। কারও কারও খাবার থাকলেও শুকনো স্থান ও জ্বালানির অভাবে রান্না করতে পারছেন না। বিশেষ করে দিনমজুর পরিবারগুলো এক প্রকার না খেয়েই দিন কাটাচ্ছেন।

বন্যাকবলিত সাড়ে ৫০০ গ্রামের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের কাছে রাজনৈতিক দল ও এনজিওদের কোনো ত্রাণ তৎপরতা নেই। ত্রাণ বিতরণে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কারচুপির অভিযোগ তুলছেন ভুক্তভোগীরা।

বন্যার কারণে জেলার ১৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। চিলমারীতে ছয় ইউনিয়নে প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি। সরকারি ত্রাণ অপ্রতুল হওয়ায় সবার ভাগ্যে এখনও ত্রাণ জোটেনি।

এদিকে রাজিবপুর উপজেলার বটতলা-উপজেলা সড়কের ২৫ ফুট জায়গা ভেঙে উপজেলা শহর, মূল বাজার ও নৌঘাটের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

রাজশাহী

রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমার মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ নিয়ে পদ্মার মধ্যচর ও নদীর তীরবর্তী মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এ ছাড়া পানি বাড়তে থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে রাজশাহী শহররক্ষা বাঁধও। তবে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান জানান, এখনই আশঙ্কার কিছু নেই। শহররক্ষা বাঁধের ঝুঁকি কমাতে সম্ভব সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

জামালপুর, দেওয়ানগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর ও বকশীগঞ্জ

শুক্রবার বিকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিশেষ সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট দূর না হওয়া পর্যন্ত বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে কেউ টালবাহনা বা দুর্নীতির আশ্রয় নিলে তাকে ক্ষমা করা হবে না।

তিনি বলেন, বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা হবে। এদিকে জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বকশীগঞ্জে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। দুই শিশু হল সাধুরপাড়া ইউনিয়নের আর্চ্চাকান্দি গ্রামের ধলু মিয়ার ছেলে আলিফ (৫) ও দাসপাড়া গ্রামের মঞ্জু মিয়ার মেয়ে মোহসিনা (৩)।

এদিকে শুক্রবার দেওয়ানগঞ্জে ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করার কথা ছিল। বানভাসি মানুষ তীব্র রোদ উপেক্ষা করে পরিষদ চত্বরে দিনভর দাঁড়িয়ে ছিলেন। সন্ধ্যা ৬টায় মাইকে ঘোষণা করা হয় ত্রাণমন্ত্রী আসছেন না। পরে ইউএনও মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন চেয়ারম্যান সেলিম খানসহ সরকারি কর্মকর্তারা বানভাসিদের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন।

সিরাজগঞ্জ

নির্মাণকাজ শেষ না হতেই সদর উপজেলার বাহুকায় পাউবোর বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ রিং বাঁধের ৩০ মিটার ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা এলাকায় এ ভাঙন দেখা দেয়।

এদিকে যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ের জালালপুর ইউনিয়নে পানিবন্দি মানুষদের মধ্যে ত্রাণের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাঐখোলা, কুঠিপাড়া ও ঘাটাবাড়ি এলাকায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও বেশির ভাগ বন্যার্ত মানুষ ত্রাণ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে গেছেন।

গাইবান্ধা

জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার পানিবন্দি মানুষ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বন্যায় চারটি উপজেলায় প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সরকারিভাবে যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে তা চাহিদার তুলনায় একেবারেই কম।

বন্যার পাশাপাশি নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা অব্যাহত ভাঙনে এখন বিপন্ন। বৃহস্পতিবার বিকালে বন্যার পানির স্রোতে কামারজানি ইউনিয়নের কলমু এসএমসি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দেবে গেছে। এদিকে বন্যার পানির কারণে এরই মধ্যে ১৪১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বগুড়া

সারিয়াকান্দিতে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। শুক্রবার সকালে যমুনার পানি বিপদসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে চরাঞ্চলে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গত তিন দিনে ভাঙনে তিন ইউনিয়নে অন্তত ৫১৩ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বন্যার কারণে ৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতি দেখতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া আজ বগুড়ায় আসছেন। তিনি সারিয়াকান্দিতে ত্রাণ বিতরণ ও জেলায় সমন্বয় কমিটির সভায় উপস্থিত থাকবেন।

ফরিদপুর ও চরভদ্রাসন

পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার পদ্মার পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি বৃদ্ধির ফলে ফরিদপুর জেলার পদ্মা-তীরবর্তী নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল, ডিক্রিরচর এবং চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক, চরহরিরামপুর, ঝাউকান্দা ইউনিয়নের বেশির ভাগ নিন্মাঞ্চল তলিয়ে গেছে। চরভদ্রাসন উপজেলার নিন্মাঞ্চল ও পদ্মা পাড় এলাকার প্রায় এক হাজার বসতবাড়ি ও ৫০০ একর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে।

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার)

হাকালুকি হাওরপাড়ের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখায় বন্যা পরিস্থিতির ফের অবনতি হয়েছে। ফলে আবারও বাড়িঘর রাস্তাঘাট ডুবতে শুরু করেছে। এতে জনজীবনে ফের বিপর্যয় নেমে আসে।

জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক গ্রামের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, উপাসনালয় এখনও পানির নিচে। মিলছে না পর্যাপ্ত ত্রাণ। প্রায় দুই লাখ ৬৫ হাজার মানুষ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে চরম দুর্ভোগে জীবনযাপন করছেন।

দেলদুয়ার (টাঙ্গাইল)

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ধলেশ্বরী ও স্থানীয় নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। প্রবল সেসংলগ্ন এলেংজানি নদীর ওপর ব্রিজের এপ্রোচ ভেঙে দেলদুয়ার-লাউহাটি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here