নৌমন্ত্রীর সংগঠনের আন্দোলনে ক্ষমতাসীনদের সম্পৃক্ত না হওয়ার নির্দেশনা

0
97

অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে নৌমন্ত্রীর শ্রমিক ফেডারেশন * সড়ক আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদ সভায় অনুমোদনের পর ২২ জেলায় আন্দোলন করেছে এ সংগঠন

পরিবহন সেক্টরে দেশব্যাপী ফের অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে নৌপরিবহনমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনভুক্ত বিভিন্ন সংগঠন। সড়ক পরিবহন আইন পাসের আগেই এমনটি হতে পারে।

এ সুযোগে সরকারবিরোধী বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীও দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় মহাসড়ক বিভাগ থেকে এমন সব আশঙ্কার কথা জানিয়ে বিআরটিএ’র (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ওই চিঠির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পরিবহন শ্রমিকদের অসন্তোষ সংক্রান্ত ৩৫ পৃষ্ঠার একটি বিশেষ প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ সভায় সড়ক পরিবহন আইন ২০১৭-এর খসড়া অনুমোদনের পর এর বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ২২টি জেলায় কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনভুক্ত বিভিন্ন সংগঠন। তাই এ সংগঠনের সড়ক আইন বিরোধী আন্দোলনে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত না হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তার নেতৃত্বেই চলে এ সংগঠন। সংগঠনটির কমিটিতে বিএনপির প্রভাবশালী নেতারাও রয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে দেশের পরিবহন সেক্টরে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর স্বার্থে তিনটি সুপারিশ করা হয়েছে। এতে শ্রমিক ফেডারেশনের চলমান আন্দোলন কর্মসূচির সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মহলকে সম্পৃক্ত না হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ আইনটি পাস ও বাস্তবায়নে সরকারের কঠোর মনোভাবের বিষয়টি জানিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ৩৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে কোন জেলায় কারা আন্দোলন করতে পারে, তাদের নাম-ঠিকানা ও পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং বিআরটিএ’র একাধিক কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, চালকদের ৮ম শ্রেণী পাসের যোগ্যতা শিথিল, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুতে চালক ও হেলপারের সাজা কমানোসহ বিভিন্ন দাবিতে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। এছাড়া মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও পৃথক প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এসব সংগঠন বরাবরই আইনে কঠোর সাজার বিরোধিতা করে আসছে। তারা আরও বলেন, আইনের খসড়া তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করেছে শ্রমিক ফেডারেশন। এর আগে চালকের সাজাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘট ডেকে দেশবাসীকে জিম্মিও করেছিল সংগঠনটি।

এ বিষয়ে সংগঠনের অবস্থান জানতে কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, আমাদের সংগঠনটি ট্রেড ইউনিয়ন। শ্রমিকদের দাবি আদায়ে কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যখন পদন্নোতি না হওয়ায় বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা আন্দোলন করেন, ৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে সাংবাদিকরা আন্দোলন করেন, তাদের কী বিশৃঙ্খলাকারী বলা হয়? তাহলে আমাদের কেন বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতাকারী বলা হবে? আমরা পরিবহন শ্রমিকেরা সারা দেশে গাড়ি চলাচলের মাধ্যমে জনগণের সেবা দিয়ে থাকি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খসড়া আইনের বিষয়ে আমাদের প্রস্তাব জানিয়ে দিয়েছি। আমরা বলেছি, একজন চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ৮ম শ্রেণী পাস নির্ধারণ করা সঠিক হচ্ছে না। বিদ্যমান পদ্ধতিতে এটি মানা অসম্ভব। দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় চালক দোষী প্রমাণিত হলে সাজা হবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০৪(খ) ধারায়। এটি জামিনযোগ্য ধারা এবং এ ধারায় সাজা সর্বোচ্চ তিন বছর।

এদিকে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭ (খসড়া) নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। এ খসড়া আইনে উল্লিখিত বিষয়গুলো হল- দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ও নিহতের ঘটনা ঘটলে দণ্ডবিধির আওতায় বিচার ও এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণী পাস হতে হবে। সাধারণ চালকদের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং পেশাদার চালকদের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হবে। প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালালে এবং সেক্ষেত্রে দুর্ঘটনা না হলেও চালকের ২ বছরের জেল বা ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। গতিসীমা লঙ্ঘন করলেও একই সাজার বিধান রয়েছে। হেলপারের লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক, না থাকলে এক মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। নেশাজাতীয় দ্রব্য বা মদ পান করে কেউ গাড়ি চালালে তিন মাসের কারাদণ্ড এবং ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা। গাড়ি চালানোর সময়ে মোবাইল ফোন বা এরূপ কোনো ডিভাইস ব্যবহার করলে এক মাসের জেল বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন চালক।

প্রতিবেদনে এ আইন বাতিলের দাবিতে শ্রমিক ফেডারেশনের কর্মসূচি মোতাবেক ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের যেসব জেলায় বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে, তাদের নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে পরিবহন সেক্টরের অরাজকতার বিষয়ে বলা হয়েছে, সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭’ পাসের প্রাক্কালে অতীতের মতো এবারও সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক/প্রভাবশালী/কায়েমি স্বার্থবাদীরা তৎপর হয়ে উঠেছে। এ আইন বাস্তবায়নের বিপক্ষে বরাবরের মতো বর্তমানেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে দেশব্যাপী আন্দোলন, সংগ্রাম, ধর্মঘটের মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে বলে প্রতীয়মান হয়। এতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সংগঠনটি বেশ শক্তিশালী। পরিবহন সেক্টরে এ সংগঠনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তাদের মতামত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নতুন আইনটি পাস করা হলে পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার যৌক্তিকতা নিরূপণ করে পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। এছাড়া খসড়া আইন সম্পর্কে শ্রমিকরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সে বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করা প্রয়োজন।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সড়ক পরিবহন আইনটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে ভেটিং হয়ে এসেছে। এতে বেশকিছু বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে পর্যালোচনায় আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

শ্রমিক ফেডারেশনের কর্মসূচির বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা : পরিবহন সেক্টরের স্বার্থে শ্রমিক ফেডারেশনের কর্মসূচিতে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত না হওয়ার কঠোর নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনের ৩৪তম পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, দেশের পরিবহন সেক্টরে স্থায়ী শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর স্বার্থে এ সেক্টরের সঙ্গে জড়িত বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল, সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মহলকে সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত না হতে এবং কোনো রকম সমর্থন বা ইন্ধন না জোগাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। এতে আরও বলা হয়েছে, ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আন্দোলন জোরদার করার আগেই এ আইন পাস ও বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অবস্থান/মনোভাবের কথা সংশ্লিষ্ট মহলকে জনিয়ে দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোকে নিবৃত্ত করার পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।

শ্রমিক ফেডারেশনের আন্দোলনের সুযোগ বিএনপি-জামায়াত নিতে পারে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৭-এর বিভিন্ন বিষয়ে পরিবহন মালিক শ্রমিকদের কর্মসূচি পালনের সুযোগে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল সরকারবিরোধী গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here