নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে কফি আনান, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ দিন

0
66

ক্যাম্পে নয়, তাদের বাড়িতে ফেরা নিশ্চিত করতে হবে * সোয়া পাঁচ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন : ফ্রান্স * বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট : জাতিসংঘ * রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়াসহ তিন বিষয়ে ঐকমত্য

নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। চাপ বাড়াতে হবে সেনাবাহিনীর ওপরও। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া না হলে সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। যার ভয়াবহ প্রভাব পড়বে এ অঞ্চলের ওপর।

বাংলাদেশ সময় শুক্রবার মধ্যরাতে নিউইয়র্কে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন কফি আনান। নোবেলজয়ী এই কূটনীতিক মিয়ানমার সরকার গঠিত রাখাইন উপদেষ্টা কমিশনের প্রধান ছিলেন। বৈঠকের আয়োজন করে ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার। বৈঠকে চীন ও রাশিয়ার বাধার কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সর্বসম্মত কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করা যায়নি।

তবে এতে তিনটি বিষয় নিয়ে ঐকমত্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন কফি আনান। এগুলো হল- রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশাধিকার এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া। অদূর ভবিষ্যতে এসব বিষয় নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাসের চেষ্টা চলছে।

কফি আনান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কোনো আশ্রয় শিবিরে নয়; বরং নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে মর্যাদার সঙ্গে। তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে, রাখাইনে ফিরে গেলেও তারা নিরাপদ থাকবেন।

বৈঠক শেষে কফি আনান বলেন, মিয়ানমারে চলছে দ্বৈত শাসন। পাঁচ দশকের বেশি সেনাশাসন চলেছে দেশটিতে। এটা একটা জটিল পরিস্থিতি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী উভয়ের সঙ্গেই কাজ করতে হবে।

বৈঠকের পর জাতিসংঘে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত ফ্রাঁসোয়া দেলাত্রে বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনেই জাতিগত নিধন ঘটছে। মিয়ানমারের পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ। সোয়া পাঁচ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শত শত গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কৌশলে মানবাধিকার লংঘন করা হচ্ছে।’ তবে মিয়ানমারের প্রতিনিধি তার বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সহকারী মহাসচিব এন্ড্র– গিলমোর বলেন, বর্তমান সংকট ‘খুব সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট।’ তিনি বলেন, দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে এবং সহিংসতার কারণগুলো মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে সত্যিকারের কোনো অগ্রগিত নেই।

বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের সুপারিশ পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতি নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমর্থন জানিয়েছে।

কফি আনান তার বক্তব্যে সম্প্রতি মিয়ানমার সরকারের কাছে পেশ করা ‘অ্যাডভাইজরি কমিটি অন রাখাইন স্টেট’র রিপোর্টের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেন। রাখাইনের জনগণের স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও চলমান সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার তার কমিশন প্রণীত রিপোর্টের সুপারিশমালার আশু বাস্তবায়ন করবে বলে তিনি আশা করেন।

কফি আনান রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার যে নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করেছে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন, মানবিক সহায়তা ও মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে কফি আনান তার রিপোর্টে উল্লেখ করেন।

তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও দ্বিপক্ষীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, এ সুসম্পর্ক ও সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় দেশই লাভবান হবে। কফি আনান রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের আন্তঃসম্প্রদায়ের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, রাখাইনের জনগণের কল্যাণে মিয়ানমার সরকার, রাখাইন জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐকমত্য হয়ে কাজ না করলে এ ভয়াবহ রোহিঙ্গা সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

বৈঠকে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দাবি করেন, রাখাইনে সেনাবাহিনীর তৎপরতা বন্ধ রয়েছে। সেখানে কোনো সহিংসতা নেই। তার বক্তব্য নাকচ করে আনান বলেন, সহিংসতা বন্ধ হয়ে থাকলে এখনও কেন দলে দলে রোহিঙ্গা দেশ ছাড়ছে। এটা কী ক্ষুধা, সন্ত্রাসী হামলার ভয় নাকি সামাজিকভাবে একঘরে রাখার কারণে। তবে কারণ যাই হোক রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে।
নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যই এ সংকট সমাধানের পক্ষে বক্তব্য রাখেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি এটিকে মানবিক বিপর্যয় আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এনাফ ইজ এনাফ। আমরা এটি আর গ্রহণ করতে পারছি না। আমরা মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর এই হীন কাজের নিন্দা জানাই।’

নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের বাইরে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। এছাড়া অফিস অব দ্য হাইকমিশন অব হিউম্যান রাইটস, অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স, ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি, ওআইসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক এই যে, মিয়ানমার সরকারের দেয়া বিবৃতি আর রাখাইন প্রদেশের প্রকৃত পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের অফিসের র‌্যাপিড রেসপন্স মিশনের সাম্প্রতিক রিপোর্টে এমনটিই তুলে ধরা হয়েছে।

২৫ আগস্টের পর থেকে আজ সকাল পর্যন্ত ৫ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সব মিলিয়ে উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ লাখে।’

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে গত দেড় মাসে চারবার বৈঠক হল। চীন ও রাশিয়ার কারণে নিরাপত্তা পরিষদের বারবার বৈঠক করেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করা যাচ্ছে না।

গত মাসে এক বৈঠকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র জাতিগত নিধন বন্ধের আহ্বান জানালেও চীনের রাষ্ট্রদূত ধৈর্য ধারণের কথা বলেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, মাত্রাতিরিক্ত চাপ পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। জাতিসংঘে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, শুক্রবারের বৈঠক খুবই উপকারী ও সহায়ক ছিল। আনান কমিশন রিপোর্টের প্রতি সবার পূর্ণ সমর্থন পাওয়া গেছে।

বৈঠকে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কো-চেয়ার ছিলেন ব্রিটিশ দূত ম্যাথিউ রেক্রফট। নিষেধাজ্ঞা কিংবা অন্য কোনো প্রস্তাব নিশ্চিত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রেক্রফট বলেন, সবাইকে একসঙ্গে আনার জন্য কাজ করা হচ্ছে। আমরা অনেক কিছু করার চেষ্টা করছি।