নিরাপত্তা আইনের ধারা নিয়ে চাপে সরকার

0
40

ঢাকা: প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা নিয়ে ঘোর আপত্তি জানিয়ে আসছিল সাংবাদিকরা। এবার এ আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিদেশী কূটনীতিকরা। আর এসব ধারা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হওয়ায় চাপে পড়েছে সরকারও।

গত ২৯ জানুয়ারি জেল জরিমানার বিধান রেখে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এ আইনে তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল করা হয়। তবে জুড়ে দেয়া হয় ৩২ ধারা। যা ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

৩২ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বে-আইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। কেউ যদি এই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে।

ফলে এ ধারা বাতিল করার দাবি জানিয়ে আসছে সাংবাদিকরা। সাংবাদিকদের দাবির পক্ষে একমত বিশ্লেষকরাও। তারা বলছেন, ৩২ ধারা কার্যকর হলে সাংবাদিকরা যেসব বাধার মুখে পড়তে পারেন তা হলো- ১. সরকারি, আধা সরকারি, ,স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনও সংস্থায় গিয়ে সাংবাদিকরা ঘুষ-দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে পারবেন না৷ ২. ঘুস-দুর্নীতির কোনও দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবেন না৷ ৩. এসব অবৈধ কাজের কোনও ভিডিও বা অডিও করতে পারবেন না। ৪. কোনও ডকুমেন্ট, ভিডিও, অডিও সংগ্রহ বা ধারণ করলেও তা প্রকাশ করতে পারবেন না৷

যদিও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দাবি করেছেন, সাংবাদিকদের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৩২ ধারায় ‘গুপ্তচরবৃত্তি’র মামলা হলে তার পক্ষে তিনি লড়াই করবেন। তার এ বক্তব্যেও আশ্বস্ত হতে পারছেন না সাংবাদিকরা। কারণ, বিতর্কিত ৫৭ ধারায় অনেক সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন।

এদিকে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকরা। রোববার সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে বৈঠককালে তারা ধারাগুলো সংশোধনের বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ঢাকায় নিযুক্ত ১০টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও তাদের প্রতিনিধিরা তাকে এ উদ্বেগের কথা জানান।

বৈঠকে জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. থমাস প্রিন্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেন্সজে টিরিংক ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডা, সুইডেন, ডেনমার্ক, স্পেন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. থমাস প্রিন্স।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ড. থমাস প্রিন্স বলেন, আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তারা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২১, ২৫, ২৮ ও ৩৫ ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই ধারাগুলো জনগণের মুক্ত বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে। এই আইনে শাস্তি, জামিন অযোগ্য ধারা এবং এই আইনের অপব্যবহার নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। তাই আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৫, ২৮ ও ৩৫ ধারা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদের বক্তব্য শুনেছি। আমাদের পক্ষ থেকেও বক্তব্য দেয়া হয়েছে। এগুলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তিনি আরও বলেন, আলোচনার পর যদি আইনের পরিবর্তন কিংবা কোনো বিষয় আরও পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয় আমরা তা করব। তবে যুক্তিযুক্ত সময়ের মধ্যে আমরা আবারও আলোচনায় বসব।

খসড়া আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে প্রচার-প্রপাগান্ডা বা তাতে মদদ দিলে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

২৫ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক ভয়ভীতি দেখায়, তাহলে তাকে তিন বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানাসহ উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

২৮ ধারায় বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করলে সেটা যদি ধর্মীয় মূল্যবাধে বা অনুভূতিকে আঘাত করে তাহলে ১০ বছরের জেল বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড পেতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ আইনে সরকার নতুন বোতলে পুরাতন সেই একই জিনিস আনলো। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের কতগুলো অধিকার রয়েছে। বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। প্রয়োজনীয় অধিকার যখন সংকুচিত হয় তখন সরকার আর গণতান্ত্রিক চরিত্রে থাকেনা। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।