নিউইয়র্কে নিহত বাংলাদেশি জাকির খানের জানাজায় প্রবাসীদের ঢল, মরদেহ দেশে প্রেরণ

0
124

02252017_06_LATE_ZAKIR_KHANনিউইয়র্ক: নিউইয়র্কে বাড়ীর মালিকের ছুরিকাঘাতে নিহত বাংলাদেশি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী কমিউনিটির পরিচিত মুখ জাকির খানের মরদেহ জানাজা শেষে দেশে পাঠান হয়েছে। স্থানীয় সময় ২৪ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার বাদ জুমা দুপুর দু’টায় ব্রঙ্কসের ভার্জিনিয়া এভিনিউর পার্কচেস্টার জামে মসজিদে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ব্রঙ্কসে স্মরণকালের বৃহৎ এ জানাজায় হাজারেরও অধিক লোক অংশ নেন। নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটির রাজনৈতিক. সামাজিক. সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী নের্তৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের প্রবাসীরা জাকির খানের জানাজায় উপস্থিত হয়ে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। জানাজা শেষে বিকেল প্রায় পাঁচটার দিকে জেএফকে বিমান বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় জাকির খানের মরদেহ। বিমানবন্দরে তার পরিবারের সদস্য ছাড়াও বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। কফিনে মোড়ানো মরদেহ বিমানে করে দেশে পাঠানোর আগে জাকির খানকে শেষবিদায় জানাতে গিয়ে অনেকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। নেমে আসে শোকের ছায়া।

বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে এদিন রাত ১১ টায় এ্যামিরাটসের একটি ফ্লাইটে জাকির খানের মরদেহ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক ত্যাগ করে। জাকির খানের ছোট ভাই নিয়াজ খান তার মরদেহের সাথে রয়েছেন। ৭ ভাই ৫ বোনের মধ্যে তার তিন ভাই আগে থেকেই দেশে অবস্থান করছেন।সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পাঠানটিলা গ্রামে বাংলাদেশ সময় রোববার দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে পারিবারিক সূত্র জানায়।এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে জাকির খানের মরদেহ পার্কচেস্টার জামে মসজিদের হিমাঘারে রাখা হয়। শুক্রবার সকাল থেকেই প্রবাসীরা মসজিদ প্রঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করেন। জানাজায় ঢল নামে প্রবাসী বাংলাদেশিদের। জুমার নামাজ শেষে অনুষ্ঠিত জানাজায় ইমামতি ও দোয়া-মুনাজাত পরিচালনা করেন পার্কচেস্টার জামে মসজিদের খতীব মাওলানা মাঈনুল ইসলাম। তাকে সহযোগিতা করেন বাংলাবাজার জামে মসজিদের খতীব মাওলানা আবুল কাশেম এয়াহইয়া।জানাজার আগে নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর রুবিন দিয়াজ এবং অ্যাসেম্বলিম্যান লুইস সেপুলভেদা সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জাকির খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল শামীম আহসান বলেন, জাকির খানের মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো নয়।

জানাজায় কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন, জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস এসোসিয়েশন অব এনওয়াই ইনক (জেবিবিএ) এর সভাপতি জাকারিয়া মাসুদ জিকো, সাবেক এমপি এমএম শাহিন, বিশিষ্ট আইনজীবী বাংলাদেশী-আমেরিকান কমিউনিটি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও ব্রঙ্কস কমিউনিটি বোর্ডের ফাস্ট ভাইস চেয়ারম্যান মূলধারার রাজনীতিক মোহাম্মদ এন মজুমদার মাস্টার অব ল, বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিক, সহ সভাপতি আবদুর রহিম হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ মো. আলী, মামুন’স টিউটোরিয়ালের কর্ণধার প্রফেসার শেখ আল মামুন, অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ বশারত আলী, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ আজাদ. সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহামেদ ও আব্দুর রহিম বাদশা. প্রবাসী কল্যাণ সম্পাদক সোলায়মান আলী. বিএনপি নেতা গিয়াস আহমেদ, বদরুল খান, জুয়েল চৌধুরী, মূলধারার রাজনীতিক দেওয়ান বজলু, ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার, বিলাল চৌধুরী, সালেহ আহমে, আনোয়ার হোসেন, বখতিয়ার খোকন, এমরান শাহ রন, মামুন রহমান, আবদুল চৌধুরী শাহীন, আওয়ামী লীগ নেতা শাহীন আজমল, বাংলাবাজার বাংলাদেশী ব্যবসায়ী এসোসিয়েশন ও বাংলাবাজার জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ গিয়াস উদ্দিন, পার্কচেষ্টার জামে মসজিদের সভাপতি সৈয়দ আল ওয়াহিদ নাজিম, এনওয়াইসি কমিউনিটি মেডিকেল কেয়ারের কর্ণধার ডা. আতাউল চৌধুরী তুষার, কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট আতাউর রহমান সেলিম, আহবাব হোসেন খোকন, মোঃ শামীম মিয়া, মাহবুব আলম, সিরাজ উদ্দিন আহমেদ সোহাগ, আব্দুল বাছির খান, নজরুল হক, এ. ইসলাম মামুন, শাহেদ আহমেদ, নুর উদ্দিন, মঞ্জুর চৌধুরী জগলুল, বুরহান উদ্দিন, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী খসরু, সেবুল খান মাহবুব, মোঃ শামীম আহমদ, মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমদ চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসার সৈয়দ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা আবু লেইছ চৌধুরী, তৌফিকুর রহমান ফারুক, মোঃ রফিকুল ইসলাম, মির্জা মামুনুর রশিদ, মুক্তিযোদ্ধা আবু কাওসার চিশতি, সামাদ মিয়া জাকের, জামাল হোসাইন, আম্বিয়া মিয়া প্রমুখ। এসময় জাকির খানের স্ত্রী ন্যান্সী খান, একমাত্র মেয়ে এবং দুই ছেলেও উপস্থিত ছিলেন।

জাকির খানের জানাজার জমায়েতকে স্মরণকালের বৃহত্তম হিসেবে মনে করছেন কমিউনিটি নের্তৃবৃন্দ।উল্লেখ্য, নিউইয়র্কে বাংলাদেশি অধ্যুষিত ব্র্রঙ্কসের থ্রগসনেক এলাকায় গত ২২ ফেব্রুয়ারী বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় বাড়ীর মালিকের ছুরিকাঘাতে মর্মান্তিকভাবে খুন হন বাংলাদেশি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী কমিউনিটির অতি পরিচিত মুখ জাকির খান (৪৪)। জাকির খানের পারিবারিক সূত্র জানায়, জাকির খান অন্যান্য দিনের মত কাজ শেষে ব্র্রঙ্কসের লোগান এবং বারকলি এভিনিউর ভাড়া বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। ওই সময় বাড়ির মালিক জাকির খানকে ছুরিকাঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বাড়ীর মালিক নিজেই চিৎকার করে পুলিশে খবর দিতে বলেন। পুলিশ এবং এম্বুলেন্স দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে আহত জাকির খানকে উদ্ধার করে নিকটস্থ জ্যাকবি হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে যান। চিকিৎসাবস্থায় জাকির খানের মৃত্যু হয়। জাকির খানের মরদেহ পোস্টমর্টেম শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে পার্কচেস্টার জামে মসজিদের হিমাঘারে রাখা হয়।

জাকির খানের বাড়ির মালিক মিসরীয় বংশোদ্ভূত তাহার মাহরানকে (৫১) পুলিশ বুধবার রাতেই গ্রেপ্তার করে। তিনি এখন কারাগারে রয়েছেন। বাড়িওয়ালার তাহার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সেকেন্ড ডিগ্রি মার্ডারের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।এলাকাবাসীর মতে, বাড়ী ভাড়া নিয়ে বছর খানেক ধরে বাড়ির মালিকের সঙ্গে জাকির খানের বিরোধ চলে আসছিল। বিষয়টি পুলিশ এবং আদালত পর্যন্ত গড়ায়। জাকির খানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ শ প্রবাসী বাংলাদেশি জ্যাকবি হাসপাতালে ভীড় জমান। কমিউনিটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া। বাংলাদেশি কমিউনিটির নের্তৃবৃন্দ এ হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

জাকির খান ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়ে আসেন। নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বসবাস শুরু করেন। জাকির খান নিউইয়র্কে এসে পড়াশুনা শেষ করে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হন। তিনি ব্র্রঙ্কসে শীর্ষ স্থানীয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হিসেবে কমিউনিটিতে পরিচিত লাভ করেন। তিনি নানা সামাজিক কর্মকান্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। জাকির খানের স্ত্রী ন্যান্সী খান একজন সঙ্গীত শিল্পী। জাকির খানের ১৩ বছর বয়সী এক মেয়ে এবং দশ ও সাত বছর বয়সী দুই ছেলে রয়েছে। তারা স্কুলে যাচ্ছে। পিতাকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল এ তিন শিশু। জাকির খানের পিতা মরহুম এজামত খান। তার মাও বেঁচে নেই।