নিউইয়র্কে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত ইমামসহ দুই বাংলাদেশীর জানাযা

0
261

08152016_18_NYC_MAYOR-1নিউইয়র্ক: ২০ সহস্রাধিক ক্ষুব্ধ জনতার স্লোগানে বাংলাদেশী ইমামসহ দু’জনকে হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি উচ্চারিত হলো। ১৫ আগস্ট সোমবার দুপুরে নিউইয়র্ক সিটির ওজোনপার্ক এলাকায় দুদিন আগে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত ইমাম মাওলানা আলাউদ্দিন আকঞ্জি (৫৫) এবং তার সহকারি তারা মিয়া (৬৪)’র জানাযার প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত এক শোক-সমাবেশে নিউইয়র্ক সিটি মেয়র বিল ডি ব্লাসিয়োও বক্তব্য রাখেন।

নিহতদের স্বজন বেষ্ঠিত মেয়র মুসলিম সম্প্রদায়কে নিউইয়র্ক সিটি তথা যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন-অগ্রগতির অংশ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘ইসলাম ধর্মে একজন মানুষের মৃত্যু হবার ঘটনাকে শুধুমাত্র সেই পরিবারের ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, পুরো একটি কম্যুনিটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা বহু জাতি ও বহু ধর্মের সম্মিলনে বিশ্বাসী, এরইমধ্যে ইমামসহ এই দুজনকে হারিয়ে গভীরভাবে ব্যথিত। এই হারানোর যন্ত্রনা সকলকেই পীড়া দিচ্ছে।’ মেয়র বলেন, ‘আমাদের এই সিটিতে মুসলিম কম্যুনিটি রয়েছেন, তাদের পাশে রয়েছে এনওয়াইপিডি। আজ যা দেখছেন, কাল থেকে আরো বেশী পুলিশ থাকবে মসজিদভিত্তিক কম্যুনিটির নিরাপত্তায়।’

১৩ আগস্ট শনিবার যোহরের নামাজ পড়িয়ে ওজোনপার্ক এলাকার আল ফোরকান মসজিদ থেকে সহকারি তারা মিয়াকে সাথে নিয়ে পায়ে হেঁটে বাসায় ফেরার সময় ৩৫ বছর বয়েসী এক হিসপ্যানিক ইমাম আকঞ্জি এবং তারা মিয়াকে গুলি করে হত্যা করে। আশপাশের ভিডিও থেকে ঘাতকের ছবি দেখার পর ১৪ আগস্ট রোববার দিবাগত রাত ১২টার পর ঐ ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করেছে। তবে তাকে এখনও এই দুই বাংলাদেশীকে হত্যার জন্যে অভিযুক্ত করা হয়নি। ইমামসহ এই দু’জনকে গুলি করে দ্রুত পলায়নের সময় এক সাইকেল আরোহীকে ধাক্কা দেয় দুর্বৃত্তের গাড়ি। এরপর সে দ্রুত পালিয়ে যাবার সময় ঐ সাইকেল চালক তার গাড়ির নম্বর প্লেট লিখে পুলিশকে ফোন করেন। একই নম্বরের গাড়ি আরো তিন মাইল দূর কর্তব্যরত পুুলিশের গাড়িতেও ধাক্কা দেয় এবং দ্রুত পলায়ন করে। এরপর পুলিশ তল্লাশী চালিয়ে ঐ গাড়ি জব্দ করার সময় ড্রাইভারকেও আটক করতে সক্ষম হয়। সে সময় পুলিশের নজর কাড়ে ইমামসহ দুই বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যার জন্যে প্রকাশিত দুর্বৃত্তের স্কেচ। পুলিশ ঐ ড্রাইভারের ঘরে গিয়ে বন্দুক উদ্ধার করে এবং গুলিবর্ষণকারির পরনে যে টি শার্ট ছিল, সেটিও পাওয়া যায়। আর এভাবেই ইমাম আকঞ্জি এবং তার সহকারি তারা মিয়ার ঘাতক গ্রেফতারের খুব কাছাকাছি পৌঁছা সম্ভব হয়েছে বলে সিটি মেয়র তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন। মেয়র বলেন, ‘শীঘ্রই সবকিছু খোলাসা হবে।’ এদিকে, নিউইয়র্ক পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা রোববার সন্ধ্যায় বলেছেন, ‘সন্দেহভাজন লোকটিকে এখনও হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করার সময় হয়নি। আরো তদন্ত চালানো হচ্ছে।’

এদিকে, জানাযার প্রাক্কালে ইমাম ও তার সহকারির কফিন সামনে রেখে অনুষ্ঠিত ঐ শোক সমাবেশের কয়েকজন বক্তা উল্লেখ করেন যে, ঘাতক গ্রেফতার হয়েছে এবং সে দোষ স্বীকার করেছে বলে পুলিশ তাদের জানিয়েছেন। এ সময় সিটি মেয়রসহ পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা সেখানে ছিলেন। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই সিটি মেয়র তার বক্তব্যে ঘাতক গ্রেফতারের স্পষ্ট কোন তথ্য দেননি। শুধু বলেছেন, ‘আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি যে, শীঘ্রই ঘাতক গ্রেফতার হবে এবং তাকে বিচারে সোপর্দ করা হবে।’

মেয়র বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য-বিবৃতি সারা আমেরিকায় ঘৃণার বিস্তার ঘটিয়েছে, আমাদের মধ্যে বিভক্তির চেষ্টা করা হচ্ছে, একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি এখানে দেখছি আমার সকল ভাই ও বোনেরা জড়ো হয়েছেন। আমি দেখছি গর্বিত আমেরিকানদের। এবং আমি কখনোই আমাদের মধ্যে বিভক্তির ষড়যন্ত্রকে সফল হতে দেব না। আমাদেরকে বিভক্ত করে, এমন কোন কথা আমি শুনতে চাই না। এবং আমরা এমন কিছুকে অব্যাহত রাখতে চাই না, যা ঘৃণার উদ্রেক ঘটায়। আমরা সম্প্রীতির বন্ধনকে সুসংহত করার জন্যে সবসময় সোচ্চার রয়েছি। যে যা যারাই এহেন হিংসাত্মক অপকর্ম করুক না কেন, তাকে বিচারে সোপর্দ করবোই। এ ব্যাপারে আমি আপনাদের নিশ্চিত করছি।’ ‘এমন নৃশংস হত্যাকান্ডের পর থেকেই নিউইয়র্কের পুলিশ সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে দুর্বৃত্ত শনাক্ত ও পাকড়াওয়ের জন্যে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। আমি আপনাদের জানাতে চাই যে, শুধুমাত্র ঘাতককে সন্ধানই নয়, কেন সে এহেন হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হয়েছে, তার কারণও উদঘাটন করবো এবং সর্বসাধারণের সামনে তা উপস্থাপন করবো’-বলেন মেয়র।

অর্থাৎ গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিই যে ইমামসহ দুই বাংলাদেশীর ঘাতক-সে ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ না করায় জানাযা শেষ হবার সাথে সাথে কম্যুনিটি এ্যাক্টিভিস্ট আকতার হোসেন বাদলের নেতৃত্বে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে ফেটে পড়েন সকলে। হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু। সমলেই সমস্বরে একই স্লোগান ধরেন। আওয়াজ উঠে ‘উই আর মুসলিম-নট টেররিস্ট’, ‘উই ওয়ান্ট পীচ’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘মসলিম লাইভস ম্যাটার’ ইত্যাদি। সকলের মধ্যেই প্রচন্ড ক্ষোভ পরিলক্ষিত হয়। ঘাতকের গ্রেফতার নিয়ে লোকোচুরি খেলার কঠোর সমালোচনা করেন অনেকে। এক পর্যায়ে পুরো ওজনপার্ক মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। তবে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

শোক-সমাবেশে সিটি মেয়রের বক্তব্যের পর সিটি কম্পট্রোলাল স্কট স্ট্রিঙ্গার, সিটি পাবলিক এডভোকেট লেটিসা জেমস প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। তারাও ইমামসহ দু’জনের হত্যাকান্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভ’তি প্রকাশ করেন। জানাযা শেষে তারা মিয়ার লাশ নেয়া হয় লং আইল্যান্ডে ওয়াশিংটন মেমরিয়্যাল গোরস্থানে। ইমাম আকঞ্জির লাশ নেয়া হয় জেএফকে এয়ার এয়ারপোর্টে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার জন্যে। জানাযায় সর্বস্তরের প্রবাসী অংশ নেন। রাজনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা, সমাজকর্মী, মানবাধিকার কর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, সম্পাদক, ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবসায়ী তথা মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কর্মরত প্রায় প্রতিটি সংগঠনের প্রতিনিধি ছিলেন।