নারী কেলেংকারি যাদের ছায়াসঙ্গী : মনোয়ারুল ইসলাম

0
405

trump-accus-2016ঢাকা ডেস্ক: আমরা বাংলাদেশি আমেরিকান। হোম সিকনেসটা অন্যান্য ইমিগ্র্যান্ট জাতির চেয়ে আমাদের অনেক বেশি। আবেগের মাত্রাটা প্রচণ্ড শক্তিশালী। এতই শক্তিশালী যে বিদেশের মাটিতে দেশের রাজনীতিতে নোংরা হই-হুল্লুড় নিয়ে তর্ক-বিতর্কে এমনকি মারামারিতে মত্ত হই।

সাংবাদিকতার নেশা মজ্জাগত হওয়ায় দেশ ও প্রবাসের রাজনীতির ওপর তীক্ষ্ম নজর রাখি সব সময়। যদিও পেশায় সক্রিয় নই- তাও এক দশক। তবুও দেশ-বিদেশের খবর রাখতে দিন-রাতের বেশ কয়েকটি ঘণ্টা চলে যায়। ২০১৬ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা তুঙ্গে। এখন অক্টোবর মাস। মাত্র ক’দিন পর নির্বাচন। ৮ নভেম্বর। এ দিনটি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমক্র্যাটিক দলের হিলারি রডহ্যাম ক্লিন্টন। মুখোমুখি প্রতিযোগিতায় তারা দু’জনই।

আরও দু’জন প্রার্থী হলেন লিবারটেরিয়ান দলের গ্যারি জনসন ও গ্রীন পার্টির জিল স্টাইল। চারজন প্রার্থীর দুইজন মহিলা। এ দুইজন হলেন হিলারি ও জিল স্টাইল। আমেরিকার নির্বাচনের ইতিহাসে এটি অতিমাত্রায় বিতর্কের ও সমালোচনার স্থান করে নিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মেজাজ, অসংলগ্ন কথাবার্তা ও নারী কেলেঙ্কারিতে বিতর্কিত। হিলারি ক্লিন্টন তার সততা ও ই-মেইল কেলেঙ্করি নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও জনমত জরিপে হিলারি (৪৫%) রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের (৩৮%) চেয়ে জনপ্রিয়তায় ৭% এগিয়ে। পাশাপাশি গ্যারি জনসন ও জলি স্টাইনের জনপ্রিয়তা মাত্র ৭% এবং ৩%। (ফক্সনিউজ জরিপ, অক্টোবর ১৫, ২০১৬)। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারী কেলেঙ্কারির সাথে উঠে এসেছে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারী ক্লিন্টনের স্বামী বিল ক্লিন্টনের যৌন কেলেঙ্কারী তো আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী বিতর্ক পর্যন্ত গড়িয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের কেলেঙ্কারি ঢাকতে গিয়ে তুলে এনেছেন হিলারির স্বামী বিল ক্লিন্টনের বিষয়টি। নির্বাচনে জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনার চেয়ে নারী কেলেঙ্কারি মোকাবেলা করতে ট্রাম্প সিংহভাগ সময় ব্যয় করছেন। প্রতিদিনই কোনো না কোনো নারী অভিযোগ আনছেন তার বিরুদ্ধে (১৬ অক্টোবর, ২০১৬ পর্যন্ত)। এ যাবৎ ১৫ জন নারী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। তার মধ্যে একজন ব্রিটিশ মহিলাও রয়েছেন। আর এ সবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন হিলারি ক্লিন্টন ও তার নির্বাচনী দল।

ট্রাম্প প্রতিশোধে মরিয়া বিল ক্লিন্টনের বিষয়গুলো সামনে আনতে। আশির দশকে বিল কিন্টনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উত্থাপনকারী চার মহিলাকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন তিনি। আমেরিকানরা হতাশ ও ও ভীতশ্রদ্ধ এসব দেখে। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের পাদপীঠ হিসেবে পরিচিত আমেরিকার নির্বাচন এ ধরনের অশ্লীল প্রচারণা আর কখনো দেখেনি। মনে হচ্ছিল, তা আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতিহিংসা ও নোংরা রাজনীতিকেও হার মানিয়েছে। যেমন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা প্রতিপক্ষকে যখন খুশি জেলে ঢুকিয়ে দেন। তেমনি নির্বাচনে জেতার আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে হিলারিকে জেলে প্রেরণের হুমকি দিয়েছেন।

এ ধরনের হুমকি আমেরিকার ইতিহাসে বিরল। ৯০ সালে বাংলাদেশে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া সংসদ নির্বাচন চলাকালেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে তাকে জেলে ঢুকিয়েছিলেন। বলছিলাম হোম সিকনেসের কথা। আমেরিকার কোনো বিষয় লিখতে গেলেই কেন জানি বাংলাদেশের বিষয়টি মাথায় ঘুরপাক খায়। বিল ক্লিন্টন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারী কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট (১৯৮৩-২০০০) হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের যৌন ব্যাভিচারকে স্মরণ করিয়ে দিলো। বিল ক্লিন্টন দু’বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার শীর্ষ ধনীদের একজন। বিলিয়নিয়ার। রিয়েল স্টেট মুগল নামে খ্যাত। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ‘রিয়েলটি শো’র প্রবর্তক।

২০১৬ সালে তিনিই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। এ দুইজনের নারী কেলেংকারি আমেরিকার আকাশে-বাতাসে ও নির্বাচনের মাঠে ঝড় তুলছে। অসম্ভব এক মিল ধরা পড়েছে আমাদের বাংলাদেশের এরশাদের সাথে। তিনজনেরই বয়স ৭০-এর ওপরে। দু’জন ছিলেন প্রেসিডেন্ট। একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। তিনজনই নিজ নিজ দেশে বিখ্যাত কুখ্যাত ও সমধিক পরিচিত। এরশাদ ও ট্রাম্প দু’জনই তিনবার বিয়ে করেছেন। তবে বিবাহবহির্ভূত কমাকাণ্ডের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে অনেক। রাজনীতিবিদদের যৌন কেলেংকারির ইতিহাস নতুন নয়। এসব নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছে রইল। আজকে শুধু এরশাদ, বিল ক্লিন্টন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু খতিয়ান তুলে ধরা হলো। এ তিনজনের বিরুদ্ধে অন্য নারীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগের পাহাড় জমেছে। তবে ভাগ্যবান তারা। কেউই মেজর শাস্তি পাননি।

তাদের স্ত্রীরা যথাক্রমে রওশন এরশাদ, হিলারি ক্লিন্টন ও মিলানিয়া ট্রাম্প- কেউই স্বামীকে ছেড়ে চলে যাননি। বরং নারী ব্যাভিচারের অভিযোগ বিতর্ক ও মামলার মতো দুর্দিনগুলোতে তারা স্বামীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারির অভিযোগ অনেকেই জানেন। আশির দশকে বাংলাদেশে তা নিয়ে তোলপাড় ছিল। জাতীয় পার্টির অধিকাংশ সুন্দরী নারীদের সাথে তার সম্পর্কের কথা ছিল সবার মুখে মুখে। নীলা চৌধুরী, শাকিলা জাফর ও জিনাত মোশাররফকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল ছিল তখন আলোচিত। অবশ্য কণ্ঠশিল্পী শাকিলা জাফর এসব স্ক্যান্ডাল ও গুজবকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বলেছিলেন, সবই ডাহা মিথ্যে। এরশাদ ও জিনাত অবশ্য দু’জনই তাদের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিলেন। উপঢৌকন হিসেবে এরশাদ জাতীয় পার্টির কোঠায় জিনাত মোশাররফকে জাতীয় সংসদের সদস্যা বানিয়েছিলেন। এরশাদ বিয়ে করেছিলেন রওশন এরশাদ, মেরি মমতাজ (এখন যুক্তরাজ্য প্রবাসী) ও বিদিশাকে।

প্রথম স্ত্রী রওশনকে নিয়ে তিনি এখন সংসার করছেন। বিল ক্লিনটনের বিবাহিত স্ত্রী একজনই। হিলারি রডহ্যাম ক্লিন্টন। তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি ও যৌন হয়রানির অভিযোগ অনেক। তার বিরুদ্ধে এ নিয়ে মামলাও হয়েছে কয়েকটি। মনিকা লিউনিস্কির সাথে অবৈধ (যদিও কনসেনসাস/সম্মতিসূচক) যৌন কেলেংকারির ঘটনায় প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন ১৯৯৮ সালে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ইমপিসমেন্ট (অনাস্থা) প্রস্তাবের মুখোমুখি হয়েছিলেন। আরকানসা অঙ্গরাজ্য তার আইনি পেশার লাইসেন্স ৫ বছরের জন্য বাতিল করেছিল। ক্যাবিনিন উইলি তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছিলেন। তখন (১৯৯৩) উইলি প্রেসিডেন্ট ভবনে (হোয়াইট হাউজ) ওভাল অফিসে কাজ করতেন। পরে প্রমাণিত হয়, তাদের কর্মকাণ্ড হয়েছিল উভয়ের সম্মতিতে। অভিযোগের পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় তা খারিজ হয়ে যায়। (সূত্র ক্লিনটন ওয়ার অন উইমেন্স) কুনিটা ব্রুডড্রিফ ছিলেন আরকানসা গভর্নর নির্বাচনে ক্লিন্টনের ভলেনটিয়ার (১৯৭৮) তার অভিযোগ যৌন হয়রানির। পলা জোন্স কিন্টনের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন।

পলা তখন আরকানসা গভর্নর অফিসের স্টাফ (১৯৯১)। বিল ক্লিন্টন আরকানসা অঙ্গরাজ্যে গভর্নর। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত কোনো অভিযোগ তোলেননি পলা। এর মধ্যেই বিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৮ সালের ১৩ নভেম্বর ৮৫০,০০০ ডলারের বিনিময়ে পলা জোন্সের মামলার নিষ্পত্তি হয়। ক্লিন্টনের অ্যাটর্নি বলেন, তার অভিযোগ ভিত্তিহীন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এটির নিষ্পত্তি চেয়েছেন জীবন ও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেয়ার জন্য। আরও যারা বিল ক্লিন্টনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির দাবি তুলেছিলেন তারা হলেন- জেনিয়ার ফ্লাওয়ারস (মডেল অভিনেত্রী), আইলিন ওয়েলস্টোন (ব্রিটিশ নাগরিক), ইলিজাবেথ ওয়ার্ড গ্রাসেন (মিস আরকানসা ১৯৮১), ববি অ্যান ও ক্যারোলিন মফেট (১৯৭৯, যখন বিল ক্লিন্টন আরকানসা’র অ্যাটর্নি জেনারেল)। আমেরিকায় ‘লেডিস ম্যান’ হিসেবে খ্যাত প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প।

৭ অক্টোবর ২০১৬ ওয়াশিংটন পোস্ট নারীদের সম্পর্কে তার মন্তব্য সম্পর্কিত ভিডিও টেপ প্রকাশ করে। সারা যুক্তরাষ্ট্রে তা ছড়িয়ে পড়ে। ধস নামে তার জনপ্রিয়তায়। রিপাবলিকান দলের অন্যতম নেতা ও যুক্তরাষ্ট্র হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ স্পিকার রায়ান ও প্রবীণ সিনেটর, ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন ম্যাককেইন তার ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেন। পত্রিকায় ও টেভিশনে একের পর এক ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগ প্রকাশিত হতে থাকে। নিজ দলের প্রায় এক ডজন সিনেটর ও হাউজ রিপ্রেজেন্টেটিভ তার প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। নৈতিকতার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। অভিযোগকারী নারীরা জোর করে চুম্বন, মেয়েদের প্রাইভেট স্থানে স্পর্শ, মেয়েদের ডেসিংরুমে বিনা অনুমতিতে প্রবেশের অভিযোগ তোলেন। আমেরিকার মিডিয়া দিনরাত এসব মেয়েদের সাক্ষাতকার প্রচার করছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগকারী মহিলারা হলেন- জেসিকা লিডস, ক্রিস্টিন এন্ডারসন, লিসা বয়েনি, টেম্পল টার্গাট, মারিয়া বিলাডো, ব্রিডেট সালিভ্যান, টাসা ডিকসন, র‌্যাসেল ক্রুক, মিন্ডি ম্যাক গিলিভারি, জেনিফার মারফি, সামার জারভস, কাসান্ড্রা সিয়ারলস ও সাবেক স্ত্রী ইভানা ট্রাম্প।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here