দণ্ডে বিচারপতিদের ঐক্য, ইতিহাসে নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ

0
54

ঢাকা: চাঞ্চল্যকর পিলখানা হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় পড়া প্রথম দিনের মতো শেষ হয়েছে। সোমবার পূর্ণাঙ্গ রায় পড়া শেষ হতে পারে। আসামি সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে ভিন্ন মত থাকলেও আদেশের অংশের বিষয়ে তিন বিচারপতিই একমত হয়েছেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন,  পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশে একটা ভয়াবহ ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল। ওই দিন ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। এমনকি বিডিআর (বিজিবি) মহাপরিচালকের স্ত্রীকেও হত্যা করা হয় নৃশংসভাবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও এত সংখ্যক সেনা কর্মকর্তা নিহত হননি। এটা ছিল নির্বিচারে হত্যা (মাস কিলিং)।

রোববার সকালে আদালত বসার আগেই আসামিদের স্বজনরা আদালতের বাইরে উপস্থিত হতে শুরু করেন। রায়ের খবর সংগ্রহে বিপুলসংখ্যক সংবাদকর্মী ও আইনজীবীও উপস্থিত ছিলেন আদালতে। সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিশেষ বেঞ্চে মামলাটির রায় পড়া শুরু হয়। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার।

বেঞ্চের নেতৃত্বদানকারী বিচারপতি মো. শওকত হোসেন জনাকীর্ণ আদালতে প্রথমে রায় ঘোষণা শুরু করেন। তার অল্প কিছু পর্যবেক্ষণ দেয়ার পরই বেঞ্চের অপর সদস্য বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তার পর্যবেক্ষণ দেয়া শুরু করেন। তিনি এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলেন।

দুপুর ১টায় মধ্যাহ্ন বিরতিতে যাওয়ার সময় তিনি রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের আইনজীবীদের বলেন, এ রায়ের পর্যবেক্ষণই এক হাজার পৃষ্ঠার ওপরে। যে ভিত্তিতে রায় দেয়া হচ্ছে, তাও মৌখিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। কত সময় লাগতে পারে- আইনজীবীদের এমন প্রশ্নে বিচারপতি শওকত হোসেন তখন বলেন, কখন শেষ হবে, তা বলা যাচ্ছে না। একটা কথা বলতে পারি, সর্বসম্মত রায় হচ্ছে।

সোমবার সকালে বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার তার পর্যবেক্ষণ ঘোষণা করবেন। এর পরই মূল রায় (আদেশের অংশ) দেয়া শুরু হবে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, সোমবার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, রায়ে কতজনের মৃত্যুদণ্ড, কতজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে, কার সাজা বহাল হবে, কাকে খালাস দেয়া হবে-সে বিষয়ে তিন বিচারপতিই একমত হয়েছেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডকে নৃশংস ও বর্বরোচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদালত বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন ইপিআর পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সীমান্তরক্ষায় নিয়োজিত এই বাহিনী দেশে-বিদেশে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছে।কিন্তু ২০০৯ সালে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরের কিছু সদস্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এই কলঙ্কচিহ্ন তাদের অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে।একসঙ্গে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার নজির ইতিহাসে নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় মনোবল নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌক্তিক পদক্ষেপ নিয়েছেন।

বিচারপতি মো. শওকত হোসেন তার পর্যবেক্ষণে বলেন, পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশে একটা ভয়াবহ ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। ওই দিন ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। এমনকি বিডিআর (বিজিবি) মহাপরিচালকের স্ত্রীকেও হত্যা করা হয় নৃশংসভাবে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও এত সংখ্যক সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়নি। এটা ছিল নির্বিচারে হত্যা (মাস কিলিং)। ওই দিন দেশের সূর্য সন্তানদের হত্যা করা হয়। তাদের বিদেহি আত্মার প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতিও সমবেদনা জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের বিচার বিভাগের জন্য এটা একটি ঐতিহাসিক মামলা। এ মামলার বিচারকালে বেশ কিছু আইনগত প্রশ্ন ওঠে। আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপতি রেফারেন্স পাঠান। আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের পর বিচার শুরু হয়। তিনি বলেন, এ মামলাটি আমাদের আদালতে আসার পর ৩৭০ কার্যদিবস শুনানি গ্রহণ করেছি। শুধুই মামলার ৮৫০ জন আসামি এ রায় শোনার জন্য অপেক্ষা করছেন না, দেশের অনেকেই রায় জানতে চান। কেউ কেউ নির্ঘুম রাত কাটাবে। তাই আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। এটা অনেক বড় রায়। আমরা একটা ভালো রায় দেয়ার চেষ্টা করছি। তাই একটু ধৈর্য ধরতে হবে। আমাদের পর্যবেক্ষণ আলাদা আলাদা থাকতে পারে। তবে গন্তব্য এক। রায়ের আদেশের অংশের বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। এ রায় ঘোষণার জন্য আমাদেরও রক্তচাপ বেড়ে গেছে।

বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী তার পর্যবেক্ষণে বলেন, যুগান্তকারী এই মামলায় সাজা প্রদানে আমরা তিনজন বিচারক একমত হয়ে মামলাটি নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নজিরবিহীন ঐতিহাসিক এই মামলায় পক্ষদের যুক্তিতর্ক, আইনের ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপিত উচ্চ আদালতের নজির, মামলার প্রেক্ষাপট, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, ঘটনার গাম্বীর্যতা, আসামি ও সাক্ষীর সংখ্যা, তদন্ত কার্যক্রম ও তর্কিত রায়ের বিশ্লেষণসহ দণ্ড ও সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অনুভূতি ও সার্বিক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করি।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মামলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সংগত কারণেই আইন বিজ্ঞান, অপরাধ বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, বিভিন্ন দেশে অপরাধের সাজা ও আইনের শাসন সম্পর্কে সংবিধানের নির্দেশনা বিবেচনার দাবি রাখে।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, এই মামলায় অভিযুক্তরা বিদ্রোহের জন্য অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, নৃশংস হত্যাকাণ্ড, অমানবিক নির্যাতন, বাড়ি ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, অস্ত্রাগার ও ম্যাগাজিন ভেঙে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুণ্ঠন করে গ্রেনেড বিস্ফোরণ, সশস্ত্র মহড়ার মাধ্যমে সন্ত্রাস ও জনজীবনে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি, লাশ গুম, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্রান্তসহ নানাবিধ জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে। ঘটনার ভয়াবহতা, নৃশংসতা, পৈশাচিকতা, বিশৃংখলা, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্রান্ত ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ সামগ্রিক বিবেচনায় এটি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি মামলা। এটা ফৌজদারি অপরাধ জগতে বিরল ঘটনা।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে দেশের আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্রান্তে লিপ্ত হন বিডিআর সৈনিকরা। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়াসহ স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর প্রত্যক্ষ হুমকির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে নারকীয় নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে তারা। এই কলঙ্কের চিহ্ন বহুকাল বিডিআর (বিজিবি) জোয়ানদের বহুকাল বহন করতে হবে।

এই বিচারপতি তার পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, পিলখানার হত্যাকাণ্ড একটি নজিরবিহীন ঘটনা। মাত্র ৩০ ঘণ্টার বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার ঘটনা ছিল বর্বরোচিত ও নজিরবিহীন। যেখানে ১৯৭১ সালে ৯ মাসে স্বাধীনতা যুদ্ধে মাত্র ৫৫ জন সেনা কর্মকর্তা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হন। আফ্রিকার রুয়ান্ডা ও কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে ১৭ জন, দক্ষিণ ফিলিপাইনে এক বিদ্রোহে