জেলা প্রশাসক সম্মেলন শুরু, দায়িত্ব পালনে সুরক্ষা চান ডিসিরা

0
72

untitled-10_311409ঢাকা: দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সরকারের কাছে সরকারি কর্মকর্তাদের আইনি সুরক্ষা চেয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। মাঠ পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিসি, এডিসি, ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকৌশলীরা প্রায়ই মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা থেকে আইনি নিরাপত্তার দাবি করেছেন জেলা প্রশাসকেরা (ডিসি)। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জনপ্রতিনিধিদের দিকে ইঙ্গিত করে জেলা প্রশাসকদের সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় জেলা পরিষদ, এলজিইডি, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কাজের গুণগত মান আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে ডিডিএলজিকে এ সকল প্রকল্প পরিদর্শনের ক্ষমতাও চেয়েছেন তারা।

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, গ্রামের মুরবি্ব, নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী, নারী সংগঠক, আনসার-ভিডিপি, গ্রামপুলিশ, এনজিও কর্মীসহ সমাজের সবাইকে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব তুলে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারি দলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিও জানান ডিসিরা।

ডিসি সম্মেলনের প্রথম দিনের কার্য অধিবেশন গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার পরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে শুরু হয়।

প্রথম অধিবেশনে এক ঘণ্টা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জেলা প্রশাসকদের নির্দিষ্ট প্রস্তাবের বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের পর ডিসিদের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা। প্রথম অধিবেশনে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ডিসিদের আলোচনায় অংশ নেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক, অর্থ প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল মান্নানসহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবরা।

একজন জেলা প্রশাসক সমকালকে বলেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিসি, এডিসি, ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকৌশলীরা প্রায়ই মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সম্মেলনে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা না করে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় জেলা পরিষদ, এলজিইডি, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কাজের গুণগত মান আরও বৃদ্ধিকল্পে ডিডিএলজিকে এ সব প্রকল্প পরিদর্শনের ক্ষমতাও চাওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এ ব্যাপারে তাদের আশ্বস্তও করেছেন।

সরকারি মামলা-মোকদ্দমা মোকাবেলায় অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক বলেছেন, সরকারি স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে ডিসি ও ইউএনওদের প্রায়ই বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার মুখোমুখি হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদালত অবমাননার দায়ে আদালতের নির্দেশে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে হাজির হতে হয়। এক্ষেত্রে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হলে কর্মকর্তাদের কাজের স্পৃহা বাড়বে।

এবারের সম্মেলনে মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছেন একাধিক ডিসি। তারা এ কোর্টের বিচারিক ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশও করেছেন। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) অন্তত ৮টি ধারা সংশোধনসহ আইন ও বিচার সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়ে সমস্যা চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণের সুপারিশ করেছেন তারা। ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার বলেছেন, বিভাগীয় কমিশনারের পদটি মাঠ প্রশাসনে প্রশাসন ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ। কমিশনাররা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের যাবতীয় কাজের সমন্বয় করে থাকেন। কর্মপরিধি ও কাজের গুরুত্ব বিবেচনায় এ পদকে প্রথম গ্রেডে উন্নীত করা দরকার।

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক প্রস্তাব করেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা, উন্নয়ন কর্মকা ের সমন্বয়সহ যে কোনো পরিস্থিতিতে সিভিল প্রশাসন সবার আগে আত্মনিয়োগ করে। প্রশাসন ক্যাডারের এসব কর্মকর্তাকে বিদেশে শান্তি মিশনে কাজের সুযোগ দেওয়া হলে দেশের সুনাম রক্ষায় কাজ করতে পারবেন।

নরসিংদীর জেলা প্রশাসক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের গাড়ির জ্বালানি তেলের পরিমাণ মাসে ১৮০ লিটার থেকে বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক প্রস্তাব দেন, হাওর এলাকার পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রণোদনা হিসেবে ‘হাওর ভাতা’ চালু করার।

সোর্সমানি দেওয়ার প্রস্তাব করে দিনাজপুরের ডিসি বলেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নকারী কর্মকা যেমন_ সন্ত্রাস, জঙ্গি তৎপরতা, সহিংসতা, চোরাচালান, মাদকের অপব্যবহার ও আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ দমনে জেলা প্রশাসকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয়। তাই ডিসিদের অনুকূলে সোর্সমানি বরাদ্দ করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক গাড়ি মেরামতের জন্য বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের আর্থিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। পাশাপাশি তিনি পরিবহন পুলের চালক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়ারও প্রস্তাব করেন। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকদের মোবাইল ফোন ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন ডিসি ইন্টারনেট ভাতা চালু করার প্রস্তাব করেছেন।

‘এক বছর পর গ্রামে লোডশেডিং থাকবে না’ :আগামী এক বছর পর গ্রামে বিদ্যুতের কোনো লোডশেডিং থাকবে না বলে ডিসিদের জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। মঙ্গলবার সচিবালয়ে ডিসি সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক কার্য-অধিবেশন শেষে তিনি এ কথা জানান।

জেলা প্রশাসক সম্মেলনের প্রথম দিন বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, গ্রামাঞ্চলে যে লোডশেডিং রয়েছে, তা ঠিক হতে এক বছরের মতো সময় লাগবে। এরপর লোডশেডিং থাকবে না। জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে গ্রামের জনগণকে তারা যেন ধৈর্য ধরতে বলেন।

তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রান্সমিশন ও গ্রিডের উন্নয়ন কাজ চলছে। এতে এক বছর সময় লাগবে। তারপর গ্রামে বিদ্যুৎ সমস্যা থাকবে না।’ এই উপদেষ্টা বলেন, ‘জেলা প্রশাসকদের বলেছি, রোজা ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের বাড়তি চাপ পড়ে। আগামী রোজা ও সেচের সময় কী কী সমস্যা হতে পারে, তা আগে জানাবেন, যাতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’

বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের বিষয়ে তৌফিক-ই-ইলাহী সাংবাদিকদের বলেন, ‘জেলা প্রশাসকদের বলা হয়েছে, আগামী ১৫ বছরের পরিকল্পনা করুন। যেসব জমির ওপর দিয়ে ট্রান্সমিশন লাইন যাবে, সেসব জমি অধিগ্রহণ করার উদ্যোগ নিন। এলপি গ্যাস ব্যবহারের জন্য জনগণকে উৎসাহিত করুন। ভবিষ্যতে আর গ্যাসের লাইন দেওয়া সম্ভব হবে না।’

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের তালিকা তৈরির নির্দেশ :২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে শিশু শ্রমমুক্ত করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সারাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের তালিকা করতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ডিসি সম্মেলনে। ডিসি সম্মেলনে এ নির্দেশনা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নুু। বিকেলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিষয় সম্পর্কিত কার্য অধিবেশন শেষে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

মুজিবুল হক চুন্নু জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে বলেন, ‘শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যেন না জড়াতে পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে।’ যেসব শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে সংসারের খরচ চালায় তাদের বাবা-মাসহ তালিকা তৈরি করতে ডিসিদের নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী।

অধিবেশন শেষে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের আরও জানান, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যেন শিশুদের করতে না হয়, ঝুঁকিমুক্ত কাজ যেন তাদের দেওয়া যায়, সে জন্য এ তালিকা করতে ডিসিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি ওইসব ঝুঁকিমুক্ত কাজ শিশুদের দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে তাদের বাবা-মাকে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চাওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ :দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম ডিসিদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ বছর সংঘটিত প্রতিটি দুর্যোগে জেলা প্রশাসকদের চাহিদার থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে ত্রাণসামগ্রীর বরাদ্দ পাঠানো হয়েছে। অনেক জায়গায় চাহিদাপত্রের আগেই বরাদ্দ পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার বিচারে এ পদক্ষেপ নজিরবিহীন। এ ধারা অব্যাহত থাকবে।

দ্রুত সময়ের মধ্যে ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ত্রাণসামগ্রী বিতরণে তৎপর হতে তিনি জেলা প্রশাসকদের আহ্বান জানান। টিআর-কাবিখার বরাদ্দ মার্চ মাসের মধ্যে ছাড়ের জেলা প্রশাসকদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, কিছু কিছু জেলায় প্রথম কিস্তির কাজ শেষ করতে বিলম্ব করায় দ্বিতীয় কিস্তি ছাড় করতে সময় লাগে। প্রথম কিস্তির প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন হলে দ্বিতীয় কিস্তির বরাদ্দ মার্চের আগেই দেওয়া সম্ভব। হাওর এলাকায় জানুয়ারি মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ বরাদ্দ ছাড়ের অনুরোধে মন্ত্রী বলেন, প্রথম কিস্তির কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করা গেলে জানুয়ারির মধ্যে সম্পূর্ণ বরাদ্দ দেওয়া হবে। সময় মতো প্রকল্প তালিকা পেতে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও নিবিড় করতে মন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ করেন। যেসব বেড়িবাঁধ বন্যায় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি আছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত এসব বেড়িবাঁধ মেরামতের অনুরোধ করেন মন্ত্রী।

সরকারের নীতিনির্ধারক ও ডিসিদের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময় এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য প্রতি বছর ডিসি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ বছর বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে ৩৪৯টি প্রস্তাব এসেছে। এগুলো ৫২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কিত। গতকাল প্রথম দিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে এ অধিবেশন হয়। আজ ২৬ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দিকনির্দেশনা গ্রহণ করবেন ডিসিরা। এটা হবে বঙ্গভবনের দরবার হলে। তিন দিনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা ১৮টি কার্য অধিবেশনে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন। কার্য অধিবেশনগুলোয় সভাপতিত্ব করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

ডিসি সম্মেলনে ২২টি অধিবেশন, ৫২টি মন্ত্রণালয়ের ১৮টি কার্য অধিবেশন থাকছে। এতে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সিনিয়র সচিব ও সচিবরা অংশ নিচ্ছেন। আগামীকাল ২৭ জুলাই বেলা ৩টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে সমাপনী অধিবেশন।

প্রভাবমুক্ত মাঠপ্রশাসন চান ডিসিরা :সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে পড়তে হয়। কোনো কোনো জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় প্রভাবশালীর চাপে অনেক সময় সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার করা যায় না। এ কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নও ব্যাহত হয়। এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারের টার্গেট পূরণও দুরূহ হয়ে পড়ে। তাই মাঠ প্রশাসনকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রভাবমুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন ডিসিরা। এর উত্তরে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ডিসিদের ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে নির্ভয়ে প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার তিন দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলনের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় এসব আলোচনা হয়েছে বলে আভাস দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ডিসি। তারা জানান, মুক্ত আলোচনায় ঢাকা, যশোর, টাঙ্গাইল, কক্সবাজার, ফরিদপুর, চট্টগ্রামের ডিসিসহ নানা বিষয়ে প্রায় ৩০ ডিসি বক্তব্য রাখেন।

রাজস্ব আদায় বাড়াতে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ :রাজস্ব আদায় আরও বাড়াতে ডিসিদের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে তদারকি করতেও বলেছেন। বিকেলের পর্বে জেলা প্রশাসকরা সহজ শর্তে গৃহনির্মাণ ঋণ, ঘরবাড়ি মেরামত ও গাড়ি কেনায় দেওয়া ঋণের সীমা যৌক্তিকহারে বাড়ানো, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে ঋণ সুবিধা, ব্যবসায়ী ও গৃহসম্পত্তি মালিকদের ডাটাবেজ তৈরিসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেন। অর্থমন্ত্রী এসব সুপারিশ পর্যালোচনা করে তা বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ডিসিরা কোনো সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন কি-না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘না, না, এ ধরনের কোনো কথা বলেননি।’ তিনি বলেন, ‘সম্মেলনে ছোট ছোট অনেক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল একটি বড়_ যা নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। তা হচ্ছে জেলা শহরের ট্রেজারি ভবনগুলো বড় করা প্রসঙ্গে।’

অর্থমন্ত্রী জানান, ট্রেজারি ভবনগুলো অনেক পুরনো এবং ছোট। এসব ভবন বড় করার প্রস্তাব এসেছে। অবশ্য প্রত্যেক ট্রেজারি ভবন একতলা বিশিষ্ট এবং এগুলো অনেক পুরনো বিল্ডিং। আমি এগুলো দোতলা করার কর্মসূচি নিতে বলেছি। তবে পূর্ত মন্ত্রণালয় বলেছে এ ব্যাপারে তাদের কাজ চলছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন ডিসিরা, এক্ষেত্রে তারা কোনো ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন কি-না প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, না, ‘এ ধরনের কিছু হয়নি।’

স্কুল ম্যানেজিং কমিটি আধুনিক করার সুপারিশ :দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যানেজিং কমিটি আধুনিক করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করেছেন ডিসিরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কার্য-অধিবেশন শেষে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ তথ্য জানান।

শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, যোগ্য ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের কমিটিতে থাকা প্রয়োজন। কমিটিতে থাকার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করাও খুব জরুরি। শিক্ষার মানোন্নয়নে জেলা প্রশাসকরা এ প্রস্তাব করেছেন। দক্ষ লোক ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বেঁধে দেওয়া হবে, কী হবে না তা জানতে চেয়েছেন তারা।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন কাজে জেলা প্রশাসকদের কাছে পাই। তাদের সহায়তা নিই। আমরা তাদের বলেছি, জঙ্গি মোকাবেলা আমাদের চ্যালেঞ্জ।’

শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। মানসম্মত শিক্ষক নন, এমন শিক্ষকদের চিহ্নিত করছি। কোচিং-বাণিজ্য বন্ধের ব্যবস্থা নিচ্ছি। নোট বইসহ সহায়ক বই জব্দ করার জন্য জেলা প্রশাসকদের সহযোগিতা চেয়েছি।’

ভর্তি ফি বেশি আদায় করার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘ভর্তি ফি বাবদ বর্ধিত হারে অর্থ নেওয়া হয়। শিক্ষা আইনে সেই অর্থ খাতওয়ারি খরচ করার কথা বলা হয়েছে। সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাহলে আর শিক্ষকরা ওই টাকা ইচ্ছামতো ব্যয় করতে পারবেন না।’

নিজ দপ্তরকেই তথ্যের অবাধ প্রবাহের উৎস বানাতে বললেন তথ্যমন্ত্রী :তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তার মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে আলোচনার সময় ডিসিদের তাদের নিজ নিজ কার্যালয়কেই অবাধ তথ্য-প্রবাহের উৎস বানানোর নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব জনগণকে তাদের সবচেয়ে কাছে থেকে সেবাদানের অন্যতম সর্বোত্তম সুযোগ। সংবিধান ও সুশাসনের প্রকৃষ্ট ধারক হিসেবে সংবিধানের মর্মবাণী জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, বৈষম্যহীন উন্নয়ন পরিকল্পনা, সব উন্নয়ন কাজে জনগণের অংশগ্রহণকে স্বতঃস্ফূর্ত করা, সহকর্মীদের জনকল্যাণে উৎসাহ দেওয়া ও সর্বোপরি নিজ দপ্তরকেই অবাধ তথ্যপ্রবাহের উদাহরণ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালনে জেলা প্রশাসকদের একনিষ্ঠ হওয়া একান্ত জরুরি। কারণ তথ্যের অবাধ প্রবাহ এখন সময়ের দাবি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here