গজনফর আলী চৌধুরী: একজন অসাধারন মানুষের জীবন থেকে নেয়া (৬)

0
533

রতন তালুকদার: ছাত্র রাজনীতির মঞ্চ দিয়ে রাজনৈতিক গজনফর আলী চৌধুরীর জীবনধারা শুরু হলেও রাজনীতির ফাঁকেই নিজের মেধা ও মননশীলতায় শিক্ষা জীবনের অঙ্গনকে আলোকিত করে রাখেন। একজন আইনের ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রীর পর সেই আইন পেশাই জীবন জীবিকার মাধ্যম হয়ে দাড়ায়। জাতীয় রাজনীতিতে আইনজীবীদের দখল নতুন কথা নয়। কিন্তু একজন রাজনৈতিক আইনজীবী হিসেবে গজনফর আলী চৌধুরীর ছিলো এক বাড়তি সুযোগ। একদিকে বর্ণময় ছাত্র রাজনীতির উত্তাল ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব গাথাঁ স্মৃতি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও গৌরবের দাবীদার তিনি।

gaznafof_8538

তারপ আবার ছাত্র রাজনীতি শেষ করে জাতীয় রাজনীতিতে পা রাখতে গিয়েও ছাত্র রাজনীতির ধারাবাহিকতাকেই অবলম্বন করেছেন তিনি। বাংলাদেশে বাম রাজনীতির স্বর্ণযুগ বলা যায় সত্তর দশকে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রগতিশীল বাম রাজনীতির রশ্মি ছড়িয়ে পড়ে শহর গ্রাম বা দূর থেকে দূরান্তে। সেই বাম রাজনীতির একজন আলোচিত মানুষ হিসেবে গজনফর আলী চৌধুরী নিজ জেলা মৌলবীবাজারে আইন ব্যবসার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অধ্যাপক মোজাফর আহমেদের নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সরকারি দল আওয়ামী লীগের পরই বৃহত্তর বিরোধী রাজনৈতিক দল। পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীন কোন্দল ও তখন হটকারী জাসদ আত্মপ্রকাশ করে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মুখরোচক শ্লোগান দিয়ে আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারা তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকারকে চ্যালেঞ্জ-এর মুখে ফেলে দেয়। জাসদের হটকারী আন্দোলন তখন সারা দেশেই তুঙ্গে। বাম রাজনীতির ন্যাগ ও কমিউনিষ্ট পার্টি এবং তাদের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশে ছাত্র ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক ও অসম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ দেশ গড়ার ব্রতী হয়।

সেকালে ঢাকা সহ সারা দেশে জাসদের হটকারী ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা ও সাময়িক অভ্যুত্থানের রাস্তা তরান্বিত করে। গজনফর আলী চৌধুরী স্বাধীনতা উত্তর মৌলবীবাজার জেলা ন্যাপের সভাপতি একজন দক্ষ সংগঠক ও বিজ্ঞ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি মৌলবীবাজারে প্রগতিশীল আন্দোলনের দূর্গ গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ত্রিদলীয় ঐক্যেজোটের ছায়ায় যখন বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয় তখন মৌলবীবাজার জেলা বাকশালের একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে গজনফর আলী চৌধুরী নিজকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন সমাজতন্ত্রের সৈনিক হিসেবে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট এক দু:খজনক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও সেনা অভ্যুত্থানের পর দেশের ছবি পুরাপুরি বদলে যায়। তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সৈনিক জাসদের সন্ত্রাসীরা তখন গণবাহিনী নামে সামরিক সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে দেশের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ধারাকে ভিন্ন ঘাতে প্রবাহিত করে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক সরকারের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা, বিদ্রোহ ও বঙ্গবন্ধু হত্যার ভয়াবহ বেদনায় কাতর হন গজনফর আলী চৌধুরী। মৌলবীবাজারে সামরিক সরকারের হাতে গ্রেফতার হন, তারপর দীর্ঘদিন ছিলেন চার দেয়ালের মাঝে বন্ধি। (চলবে)