খালেদার দুর্নীতির মামলার রায় ৮ ফেব্রুয়ারি

0
53

ঢাকা: বহুল আলোচিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত। প্রসিকিউশন ও আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান বৃহস্পতিবার মামলার প্রধান আসামি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে এ দিন ধার্য করেন। একই সঙ্গে বিচারাধীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী ৩০ ও ৩১ জানুয়ারি এবং ১ ফেব্রুয়ারি দিন নির্ধারণ করেন বিচারক। এ মামলার বিচারও শেষ পর্যায়ে।

জিয়া অরফানেজ মামলার রায়ের দিন ঘোষণার মধ্য দিয়ে নয় বছর আগে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার বিচার কাজ শেষ হলো। এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে জনতা টাওয়ার মামলায় ৪ বছর এবং অবৈধ অস্ত্র আইনে করা মামলায় দশ বছর সাজা হয়েছিল। তিনি প্রায় ছয় বছর কারাভোগ করেন।

এ মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারবেন না বলে সমকালকে জানিয়েছেন দুদকের বিশেষ পিপি মোশারফ হোসেন কাজল। তিনি বলেন, নৈতিক স্খলনজনিত কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তির তিন বছর সাজা হলে, তিনি কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। তবে বিচারের সর্বশেষ ধাপ শেষ না হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে ভিন্নমতও রয়েছে।

প্রসিকিউশন পক্ষ জানায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটি ২৩৬ কার্য দিবসে শেষ হয়েছে। এরমধ্যে ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, ২৮ কার্য দিবস আসামি পক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন ও ১৬ কার্য দিবস যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয়।

বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা ১৯ মিনিটে বিচারক রায়ের দিন ঘোষণার সময় এ মামলার অপর দুই আসামি সাবেক এমপি কাজী সলিমুল হক কামাল এবং ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদও আদালতে উপস্থিত ছিলেন। মামলার অপর তিন আসামি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামালউদ্দিন সিদ্দিকী, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মোমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

আদালত থেকে বেরিয়ে এ মামলার প্রধান কৌঁসুলি দুদকের বিশেষ পিপি মোশারফ হোসেন কাজল সাংবাদিকদের জানান, জিয়া অরফানেজ মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত। তিনি বলেন, এ মামলায় পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ দিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেছি বলে মনে করি। তাতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সব আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি (যাবজ্জীবন) হবে বলে প্রত্যাশা করেন এই আইনজীবী।

খালেদা জিয়ার পক্ষের আইনজীবী আবদুর রেজাক খান বলেন, এ মামলায় কোনো সারবত্তা নেই। খালেদা জিয়াসহ সব আসামি খালাস পাবেন। অপর আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, এ মামলার বাদীপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মামলায় খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিরা খালাস পাবেন বলে আশা করেন তিনি। অপর আসামি কাজী সলিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী মো. আহসান উল্লাহ দাবি করেন, প্রসিকিউশন এ মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তাই কোনো আসামির সাজা হতে পারে না। তিনি বলেন, তারেক রহমান তার বাবার নামে ট্রাস্ট গঠন করেছেন। ট্রাস্টের নামে জমি কিনেছেন, আবার টাকা ফেরত নিয়েছেন, তাতে দোষের কি হয়েছে? এ ঘটনায় কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হননি, আবার কেউ লাভবানও হননি।

এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়। এদিন প্রসিকিউশন পক্ষ যুক্তিতর্কে এ মামলার প্রধান আসামি খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক সচিব পলাতক ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড প্রার্থনা করেন। অপর আসামিদেরও সাত বছরের সাজা প্রার্থনা করে প্রসিকিউশন।

রাজধানীর বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির দুই মামলার বিচার চলছে।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৭ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে অপর দুই আসামি কাজী সলিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন মো. আহসান উল্লাহ। ১১টা ৩৮ মিনিটে আদালতে আসেন মামলার প্রধান আসামি খালেদা জিয়া। দুপুর ১টার দিকে তার যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়। মধ্যাহ্ন বিরতির পর সলিমুল হকের পক্ষে এক ঘণ্টা বক্তব্য রাখেন আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান। এরপর দুদকের বিশেষ পিপি মোশারফ হোসেন কাজল সমাপনী বক্তব্য রাখেন।

এর আগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত ২২ ডিসেম্বর থেকে খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার আইনজীবীরা। ১৬ জানুয়ারি পাঁচ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুর রেজাক খান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী ও ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন। ১৭ জানুয়ারি থেকে এ মামলার অপর আসামি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট মো. আহসান উল্লাহ ও সৈয়দ মিজানুর রহমান।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা :সৌদি আরব থেকে এতিমদের জন্য আসা দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রাজধানীর রমনা থানায় মামলা করে দুদক। একই বছরের ৪ জুলাই মামলাটি গ্রহণ করেন আদালত। তদন্ত শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক হারুন-অর রশিদ ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগপত্র দেন। প্রসিকিউশন পক্ষের অভিযোগ দাখিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আসামি পক্ষ একাধিকবার উচ্চ আদালতে আসেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার তিন নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে চার্জ গঠন করেন। এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। মামলার অপর আসামিরা হলেন মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সলিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। একই বছরের ৭ মে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে এ দুটি মামলা বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে স্থানান্তর করা হয়।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতে মোট ৩৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় দুর্নীতির অভিযোগে করা। দুর্নীতির এ মামলাগুলো করা হয়েছে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। এ ছাড়া বাকি মামলাগুলো পুলিশের কাজে বাধা, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, হত্যা, মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গত ৯ বছরে করা হয়েছে।

আরও ১৪ মামলা স্থানান্তর :গত ৪ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা আরও ১৪টি মামলা ঢাকার আদালত থেকে বকশীবাজার অস্থায়ী আদালতে স্থানান্ত