ক্ষুধার্ত ধানের নামতা : জীবনের অনিবার্য ঘোষণা

0
145

আজ পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো গিরিশ গৈরিকের বই ‘ক্ষুধার্ত ধানের নামতা’র পাঠ প্রতিক্রিয়া। লিখেছেন কবি স্বরলিপি।

‘ক্ষুধার্ত ধানের নামতা’ নামটি প্রথমেই অস্থির করে তুলল কারণ এটি গণিতের মতো বিষয়। সুতরাং অস্থিরতাকে আর স্থির না করে থাকা গেল না। এই সময়ের মধ্যে এক-এক করে মুঠো মুঠো ধান গজিয়ে উঠতে শুরু করল মানুষের মতো। কখনো সেগুলো হয়ে উঠলো প্রেমের রূপ আর প্রতিরূপ। এক নজরে দেখলাম দৃশ্যগুলো ক্রমাগত পরিবর্তন হতে হতে সবুজ বাতাসের সাথে উড়তে চাইছে। ঠিক তখন দুইবার পড়ে নিলাম এই লাইন তিনটি:
‘গল্পটি হল পাখির মতো খুঁটে খাওয়া মানুষের
যাদের প্রেমের ভগ্নাংশ জমা থাকে মৌচাকে
আর সেখানে তোমরা দাবানল লাগিয়ে মধু শিকার করো।’
                                (বানিয়াশান্তা, পৃষ্ঠা: ৩১)

বইয়ের পূর্বপর পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে থাকলেও এই পৃষ্ঠাকে মনে হল বিশ্রামঘর। কিছু সময় বাদে ধীর দৃষ্টিতে আবারো পাতা উল্টাতে থাকি। কবিতার পাতা থেকে কবি গিরীশ গৈরিক আরো দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠেন:

‘কোনো এক গণতন্ত্রের গাড়িয়াল
গরুর গাড়িতে করে গরুর মাংস নিয়ে যাচ্ছে
পায়ে পায়ে পথের হৃদয় ঘোসে
গরুগুলো গুলিস্তানের ঘোড়া হয়ে হেঁটে যাচ্ছে’
আমি তখন নিবিষ্ট পাঠক। দেখার চেষ্টা করলাম, পায়ে পায়ে পথের হৃদয় আরো কারা ঘোসে চলে। আর চলতে চলতে বদলে যায়। আবার মনে হলো ৩১ নম্বর পৃষ্ঠার সেই কথামালা। যেখানে বলে দেয়া আছে, ‘গল্পটি হল পাখির মতো খুঁটে খাওয়া মানুষের’।

তাই যদি হয় তবে এবার আসুন আর একটু সামনে এগিয়ে যাওয়া যাক। এবার এই খানে আর একটু দাঁড়ান। যেখানে কবি মধুসূদন রচনাবলি কবিতায় অনেকটা আশ্রয় প্রত্যাশি হয়ে উঠেছেন। তিনি বলছেন, ‘অবশ্য ধানের ছাল ছাড়লে চাল পাওয়া যাবে ভেবে / আমি শিশু হয়ে সমর্পণ করি তোমার চাবুকের কাছে’।

এই সমর্পিত হবার চেষ্টা শেষ হলে কবির কবিতায় আবার যোগ হয়েছে ভিন্নমাত্রা। বিশ্বাস আর আত্মচেতনায় আমি কবিকে বলে উঠতে শুনলাম:
‘বটের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলা যায় না-তাই বটের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বলছি-
আমি সেই- যার শরীরের চামড়ায় চাবুকের আঘাতে লেখা হয় পৃথিবীর ইতিহাস
কিম্বা তোমরা আমায় ক্রুশবিদ্ধ করে যতই যবুথুবু করে বাঁধো না কেন
আমি বাংলার জাতীয় সঙ্গীত শুনতে পেলে দাঁড়াবই দাঁড়াব
                                              আমি সেই যযাতি’।
                               (এই কবিতার নাম হতে পারতো বাজপাখি, পৃষ্ঠা: ৬৪)

এরপর আমার আর কি বলার থাকতে পারে বলুন। ভাষার ছলচাতুরি বাদ দিয়ে অনুভূতির সলতে পাকিয়ে উঠেছে যেখানে ঠিকঠিক আগুন ধরিয়ে দিতে দ্বিধা করেন-নি কবি। তবে যে ধানের নামতা! সেটা কি?
এই বার সেই সত্য গজাতে দেখলাম ‘সাদামঞ্চ’ কবিতায়: যে শিশু মাতৃগর্ভ থেকে আঁতুড়চোখে দেখেছিল / পেরেক ঠোকা রক্তাত্ব মায়ের হৃৎপিণ্ড / কিম্বা ফুঁকেছিল ফুসফুস ঝলসানো বারুদ বাতাস / সে-তো গাইবে গণজাগরণের গান।

ফিরে দেখি ‘ইরেজা’ কবিতায়: একজন মাঝি দাঁড় টেনে যাচ্ছে / আর-তাঁর নৌকার গলুইয়ে গুণ বেঁধে বিপরীতে টানছে / বুনো শূকরের হাড় / অদূরে সূর্যের সাথে প্রসারিত হচ্ছে লাল শাপলা / আর হারিক্যানের কালো চিমনি মুছে যাচ্ছে ক্রমাগত।
এই যে ক্রমাগত চলতে থাকা ক্ষুধার্ত ধানের নামতা পড়তে পড়তে শেষ হল ‘শ্লোক’সহ আরো ৫১টি কবিতা। শুরুটা হয়েছিল ‘আমি অভিজিত রায় বলছি’ দিয়ে। চতুর্থ লাইন থেকে টেনে বলছি ‘এখানে যাদের চোখে শ্লোগানের পঙতি দাউদাউ করে জ্বলে / আমরা নিমফুল হাতে তাদের অপেক্ষায় আছি’।
এভাবে গিরীশ গৈরিক তার প্রথম কাব্যগ্রন্থেই নিরন্তর ভেঙে আর গড়ে তুলেছেন কবিতার মানুষ-গ্রাম আর দেশকে।

আপনাকে ‘ক্ষুধার্ত ধানের নামতা’ পাঠের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। এই নামতা ছন্দ-আর স্বর মনে হবে আপনারই আপনজনের কথা। যে জীবন স্পর্শ করে রোজ নিশ্চিত হই বেঁচে আছি তার গল্পতো এমন দৃঢ়ই হবে। আর দৃঢ়তা আমাদের বেঁচে থাকারই কৌশল। পাঠক একজন হয় কিন্তু লেখক হয় অনেক জন। সে ভেঙে যায়, সে একাংশ হয়ে লেখে; সে পূর্ণতা ছোঁয়ার জন্য অবয়বকে পেছনে রেখে দেয়। তাকে আবিষ্কার করার সাধ্য একজন পাঠকের কেন থাকবে বলুন? এ শুধু পাঠকের গাণিতিক গুণ অথবা ভাগ করার চেষ্টা মাত্র।

ক্ষুধার্ত ধানের নামতা
প্রকাশন : বেহুলাবাংলা
প্রকাশকাল : বইমেলা ২০১৬
প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৬৪
মূল্য : ১৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here