কেমন আছেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, লোকচক্ষুর অন্তরালে আপন ভুবনে

0
80

ঢাকা: কখনও রাজনীতি করেননি তিনি। রাজনীতিক না হয়েও বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে যার নাম, তিনি সাহাবুদ্দীন আহমদ। ছিলেন বিচারপতি, পরে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর জাতির এক সন্ধিক্ষণে নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও। শুধু একবার নয়, দু’বারের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বহুদিন ধরে এমনভাবে নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে গেছেন, মনে হয় এ যেন অভিমানী এক রাষ্ট্রনায়কের স্বেচ্ছানির্বাসন। সময় কাটান আপন ভুবনে, নিমগ্ন থাকেন নিজস্ব ভাবনায়।

কারও সঙ্গে কথা বলতে অনাগ্রহী এই মানুষটি একদা যেমন বিচক্ষণতার সঙ্গে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তেমনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনটিও উপহার দিয়েছিলেন জাতিকে। সংবিধানের যে একাদশ সংশোধনী নিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মাঝেমধ্যেই বিষোদ্গার করেন, সেই সংশোধনী করা হয়েছিল সাহাবুদ্দীন আহমদকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়ার জন্য তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী।

সাহাবুদ্দীন আহমদ কোনোবারই নিজের ইচ্ছায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেননি। ১৯৯০ সালের ৫ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন হয়। প্রশ্ন দেখা দেয়, কে দেশের দায়িত্ব নেবেন? তিন জোট মিলে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি বিচারিক পদ ছাড়তে চাননি বলেই তিন জোট সর্বসম্মতিক্রমে তাকে আবার আগের পদে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করে। একাদশ সংশোধনী ছিল সেই অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন। একজন ব্যক্তির চাওয়ার মূল্য দিতে সংবিধান সংশোধনের নজির বাংলাদেশে তো নেইই, অন্য কোনো দেশে আছে বলে জানা নেই। ওই সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি বেশ আলোচিত ছিল। নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের পর সেদিন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন দায়িত্ব না নিলে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। সাহাবুদ্দীন আহমদের দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রেক্ষাপটও ভুলে যাওয়ার নয়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সর্বজনশ্রদ্ধেয় নির্দলীয় কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করার অঙ্গীকার করেন। সাহাবুদ্দীনের কাছে প্রস্তাবটি গেলে তিনি প্রথমে অপারগতা প্রকাশ করেন। তখন তিনি অবসর জীবনযাপন করছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা যখন বললেন, তিনি রাজি না হলে তার বাড়ির সামনে গিয়ে অনশন করবেন, তখন আর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন তাকে ফিরিয়ে দিতে পারেননি। আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সঙ্গে বড় ধরনের বিরোধ দেখা না দিলেও ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর ওই দলটিই তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছিল।

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নিয়ে অন্তরালে চলে যান সাহাবুদ্দীন আহমদ। আগেও যে খুব একটা প্রকাশ্যে আসতেন এমন নয়। বরাবরই প্রচারবিমুখ মানুষ তিনি। গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ায় তার বিরাগের কথা সুবিদিত। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেয়াদ শেষে একেবারেই নিভৃতে চলে আসেন। বিচারকদের বিচ্ছিন্ন থাকার যে প্রবণতা সেটাই তাকে আলাদা করে রেখেছিল হয়তো। অবশ্য বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের কর্মজীবনের সূচনা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। পরবর্তী সময়ে সহকারী জেলা প্রশাসক হওয়ার পর ১৯৬০ সালে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগে বদলি হন। আসীন হন বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে। তারপরের ইতিহাস তো জানা। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৯১ সালে তার অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। পরে শর্তানুযায়ী তাকে প্রধান বিচারপতির পদে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২৩ জুলাই তাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি করা হয়। ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাহাবুদ্দীন আহমদ থাকেন রাজধানীর গুলশান ২-এর ৫৯ নম্বর সড়কের ১০ নম্বর বাড়িতে। বাড়িটির নাম ‘গ্র্যান্ড প্রেসিডেন্ট কনকর্ড’ হলেও মানুষের কাছে এটি প্রেসিডেন্ট হাউস নামে পরিচিত। বছরখানেক আগেও প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ৫৯ নম্বর রোড থেকে হাঁটা শুরু করে দক্ষিণ পাশের ৫৮ নম্বর হয়ে ৬২ নম্বর সড়ক ঘুরে বাসায় ফিরতেন। গত বুধবার দুপুরের দিকে সেখানে গিয়ে অভ্যর্থনা কক্ষে নিজের পরিচয় দিতেই আবাসন কোম্পানি কনকর্ডের সঙ্গে অংশীদারত্বে বানানো বাড়িটির তত্ত্বাবধায়ক আবদুর রাজ্জাক জানালেন, ‘স্যার একান্ত আপনজন ছাড়া কারও সঙ্গেই দেখা করেন না।’

বাড়িটির দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ছোট ছেলে সোহেল আহমদের সঙ্গে থাকেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। একই তলার অন্য একটি ফ্ল্যাটে থাকেন তার বড় মেয়ের জামাই ও নাতনি। সাহাবুদ্দীনের তিন মেয়ে আর দুই ছেলের মধ্যে বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সিতারা পারভীন। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। বছর তিনেক আগে সাহাবুদ্দীন আহমদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগমও মারা যান। বড় ছেলে পরিবেশ প্রকৌশলী শিবলী আহমদ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। মেজো মেয়ে স্থপতি সামিনা পারভীন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। ছোট মেয়ে চারুশিল্পী সামিয়া পারভীন থাকেন দুবাই।

তত্ত্বাবধায়ক রাজ্জাক বললেন, সাহাবুদ্দীন আহমদকে বহুদিন দেখতে পাননি তিনি। তবে তার সঙ্গে আলাপের সময়ই সেখানে এলেন বাড়িটির ব্যবস্থাপক মতলুব আহমদ। তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুরেও স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। বাসাতেই হাঁটাহাঁটি করছিলেন তিনি। সেদিন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সোহেল নামে একজন ডাক্তার এসেছিলেন স্যারের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য। প্রায় প্রতিদিনই ওই ডাক্তার আসেন।’

পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ূয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের চিকিৎসার দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়েছে। তারা অধ্যাপক ডা. এএইচএম ফিরোজ, সহযোগী অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র রায়, সহযোগী অধ্যাপক ডা. রতন দাশগুপ্ত ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. উদয়শঙ্কর রায়কে নিয়ে একটি টিম গঠন করে দিয়েছেন। মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. সোহেল রানা এ টিমটির সমন্বয়কের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি প্রায় প্রতিদিনই সাহাবুদ্দীন আহমদের বাড়িতে গিয়ে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। ডা. সোহেল রানার কাছে সাহাবুদ্দীন আহমদের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যার তার বয়সের তুলনায় যথেষ্ট সুস্থ-সবল আছেন। খাওয়া-দাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে। কথাবার্তায়ও কোনো সমস্যা নেই। তবে তার হাইপারটেনশন রয়েছে। হাইপারটেনশন হচ্ছে উচ্চরক্তচাপজনিত অসুস্থতা। নার্ভাস সিস্টেমের কারণে পারকিনসনসের প্রবণতাও রয়েছে। পারকিনসনস মস্তিষ্কের একটি ক্ষয়জনিত রোগ। এতে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু এলাকার কার্যক্ষমতা কমে যায়। ৫৫ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তিদের যে কেউ এতে আক্রান্ত হতে পারেন। স্যারের বয়সে এমন কিছু সমস্যা থাকাটাই স্বাভাবিক।’

১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার পেমই গ্রামে জন্ম নেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) প্রত