কেনেডি হত্যা, গোপন নথির প্রকাশ ঘিরেই রহস্য

0
64

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যার গোপন নথির প্রকাশ ঘিরেই রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৬৩ সালের এ হত্যাকাণ্ড ঘিরে সব নথি প্রকাশের কথা থাকলেও একেবারে শেষ মুহূর্তে কিছু নথির প্রকাশ স্থগিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এ বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দিলেও অনেকেই তা মানতে পারছেন না। তাদের ধারণা, কেনেডি হত্যাকাণ্ড ঘিরে দেশটিতে চলমান নানা জল্পনা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের নিরসনে জনগণকে যথাযথভাবে সহযোগিতা করছে না ট্রাম্প প্রশাসন। খবর বিবিসি ও সিএনএনের।

অনেকেই বলছেন, কেনেডি হত্যার ৫৪ বছর পার হলেও নথি প্রকাশের ঢাকঢোল পিটিয়ে কেবল প্রচারই নিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আসলে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রকাশিত নথিতে নতুন করে বড় ধরনের কোনো উদ্ঘাটন ঘটেনি। জল্পনার অবসান ঘটাতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ নথি সরকার গোপনই রেখে দিয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, সিআইএ, এফবিআইসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ওই নথিগুলো আর প্রকাশিত হবে না।

গত বৃহস্পতিবার নতুন করে কেনেডি হত্যা-সংশ্নিষ্ট দুই হাজার ৮৯১টি গোপন নথি প্রকাশ করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসব নথি প্রকাশের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণের অধিকার আছে ঠিক কী ঘটেছিল, তা জানার।

তবে সংশ্নিষ্ট দপ্তর ও বিভিন্ন এজেন্সির অনুরোধে কিছু নথি গোপন রাখতে হচ্ছে। এসব নথি আবারও নিরীক্ষণ করা হবে এবং আগামী বছরের ২৬ এপ্রিল নাগাদ প্রকাশ করা হবে।

তবে যেসব নথি প্রকাশ করা হয়েছে তাতে বড় কোনো উদ্ঘাটন না থাকলেও বেশ তথ্যবহুল। প্রেসিডেন্ট কেনেডিকে কেন হত্যা করা হয়েছিল তা নিয়ে নানা ধরনের ‘ষড়যন্ত্রের’ কথা এসব নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

প্রকাশিত নথির একটিতে দেখা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট কেনেডির হত্যাকারী লি হার্ভি অসওয়াল্ড নিজেই নাকি হত্যার হুমকির মধ্যে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই আগেই বিষয়টির ব্যাপারে পুলিশকে সতর্ক করে দিয়েছিল। নথিতে তখনকার এফবিআইপ্রধান এডগার হুভার এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশপ্রধানকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম এবং পুলিশপ্রধানও তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তা দেননি। কেনেডি হত্যার দুইদিন পরই ডালাস পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বেইজমেন্টে লি হার্ভিকে স্থানীয় এক নাইট ক্লাবের মালিক জ্যাক রুবি গুলি করে হত্যা করেন।

এদিকে আটক অবস্থাতেই লি হার্ভি হত্যাকাে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ষড়যন্ত্র করে তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর যখন কেনেডিকে হত্যা করা হয়, তখন তিনি ছাদখোলা একটি লিমুজিনে চড়ে ডালাসের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই রাস্তার ওপর নজর রাখা যায় এমন একটি ভবনের জানালা দিয়ে লি হার্ভি গুলি করে কেনেডিকে হত্যা করেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ারেন কমিশনের তদন্ত রিপোর্টে দাবি করা হয়।

নতুন করে প্রকাশিত একটি নথিতে দেখা যায়, সে সময় এই হত্যাকা নিয়ে নানা রকম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ায় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই বেশ দুশ্চিন্তায় ছিল। তারা আশঙ্কা করছিল, হত্যাকারী হিসেবে লি হার্ভির নাম জনগণ হয়তো বিশ্বাসই করবে না। কেনেডি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যুক্ত ওয়ারেন কমিশন অবশ্য বলেছিল লি হার্ভি অসওয়াল্ড, বা তাকে হত্যাকারী জ্যাক রুবি আসলে কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল না।

তবে হত্যাকা নিয়ে জল্পনা আজও থামেনি। লি হার্ভি এবং জ্যাক রুবিকে নিয়েও নানা সন্দেহ পোষণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। অনেকে মনে করেন, লি হার্ভির কাছ থেকে এ ঘটনায় অন্য কোনো ব্যক্তির জড়িত থাকার তথ্য যেন জানা না যায় সে লক্ষ্যেই তাকে হত্যা করা হয়।

জ্যাক রুবি অবশ্য দাবি করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট কেনেডির হত্যাকাে তিনি গুরুতর আঘাত পান। তার প্রতিশোধ নিতেই অসওয়াল্ডকে হত্যা করেন। অবশ্য তার এই দাবি অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। কারণ জ্যাক রুবির সঙ্গে অপরাধ জগতের মাফিয়াদের যোগাযোগ ছিল।

তবে বহুল প্রচলিত একটি তত্ত্ব হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর ডানপন্থিদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কেনেডি নিহত হন। এর পেছনে খোদ সিআইএ জড়িত। তবে ১৯৭৫ সালেই রকফেলার কমিশন জানিয়েছিল, এই হত্যাকাণ্ডে সিআইএর জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি।

আরেকটি তত্ত্ব হচ্ছে, একজন নয়, দু’জন বন্দুকধারী কেনেডির ওপর গুলি চালায়। লি হার্ভি আসল হত্যাকারী কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকে। বিশেষ করে যে ভবন থেকে তিনি গুলি করেছিলেন সেখান থেকে প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা।

প্রকাশিত গোপন নথিতে বলা হয়, কেনেডির হত্যাকারী লি হার্ভি অসওয়াল্ড ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মেরিন সেনা। তিনি নিজেকে ‘মার্কসবাদী’ বলে দাবি করতেন।

নতুন করে প্রকাশিত সিআইএ’র একটি নথিতে দেখা গেছে, লি হার্ভি অসওয়াল্ড মেক্সিকো সিটিতে গিয়ে রুশ গুপ্তচর সংস্থা কেজিবির এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এই কেজিবি কর্মকর্তার নাকি কাজই ছিল, অন্তর্ঘাতমূলক ও গোপন হত্যাকাে সাহায্য করা।

আরেকটি নথিতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট কেনেডির হত্যার পর আশঙ্কার মধ্যে ছিল তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন জেনারেল যে কোনো সময় তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে।

আরেকটি নথিতে দাবি করা হয়, ‘ কেমব্রিজ নিউজ’ নামে যুক্তরাজ্যের একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্রে একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ফোন দিয়ে কেনেডি হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়েছিলেন। সেই ফোন কলটি এসেছিল কেনেডি হত্যাকাে র কিছুক্ষণ আগেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here